উলাসীর খাল থেকে গৌরিঘোনা—অতীতের প্রেরণায় বর্তমানের উদ্যোগ
যশোরের শার্শা উপজেলার উলাসী এলাকায় ইতিহাসের এক নিঃশব্দ সাক্ষী চোখের সামনে ভেসে ওঠে। উলাসী ইউনিয়ন ভূমি অফিস প্রাঙ্গণে ঢুকেই বাঁ পাশে খালের ধারে গাছতলায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি পুরোনো ফলকস্তম্ভ যেন অতীতের গল্প বলতে চায়। তবে অযত্ন-অবহেলায় মলিন হয়ে যাওয়া সেই ফলকের লেখা দূর থেকে আর স্পষ্ট বোঝা যায় না। কাছে গেলে ধীরে ধীরে ভেসে ওঠে ইতিহাস। ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক এক বৃহৎ উদ্যোগের অংশ হিসেবে উলাসী-যদুনাথপুর খাল খনন কাজের উদ্বোধন করেছিলেন।
জিয়াউর রহমানের হাতে যশোরে শুরু হওয়া এই খাল খনন কর্মসূচি ক্রমে সারা দেশে বিস্তৃত হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়া শহীদ হলে পরবর্তী সরকারগুলো এই কর্মসূচি থেকে সরে আসে। প্রায় সাড়ে চার দশক পর জিয়ার সন্তান তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েই বাবার কর্মসূচি ফিরিয়ে আনেন। সরকার গঠনের অল্পদিনের মাথায় তিনি উত্তরবঙ্গে উদ্বোধন করেন খাল খনন কর্মসূচি। সেই কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত শনিবার যশোরে মন্ত্রিসভার সদস্য অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের হাত ধরে শুরু হয়েছে কেশবপুরের গৌরিঘোনায় বুড়লি খাল খনন কার্যক্রম।
শার্শার উলাসী-যদুনাথপুর প্রকল্প ফলকের অপর পাশে আরেকটি বার্তা দেশ গড়ার অঙ্গীকার, মানুষের সম্মিলিত প্রয়াসের কথা। ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল আবার উদ্বোধনের স্মৃতিও সেখানে খোদাই করা আছে। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক নিদর্শন আজ অবহেলায় পড়ে আছে। ফলকের পাশেই একটি পরিত্যক্ত একতলা ভবন ভাঙা দরজা-জানালা, আগাছায় ঢেকে থাকা দেয়াল, পোকামাকড়ের আবাসস্থল। অথচ একসময় এই জায়গাটিই ছিল উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের স্মারক।
প্রাচীরের ওপারেই যে খালটি, সেটিই একসময় উত্তর শার্শার কৃষি বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি ছিল। আজ সেই খাল মৃতপ্রায়। কোথাও কোথাও সামান্য পানি জমে আছে, কিন্তু প্রবাহ নেই, প্রাণ নেই। পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে খালের বড় অংশ। অথচ প্রায় পাঁচ দশক আগে এই খালই বদলে দিয়েছিল হাজার হাজার মানুষের জীবন।
১৯৭৬ সালের সেই দিনটির কথা এখনো স্পষ্টভাবে মনে করতে পারেন উলাসী গ্রামের শতবর্ষী আবদুল বারিক মণ্ডল। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও স্মৃতির ভাণ্ডার এখনো উজ্জ্বল। তিনি জানান, সেদিন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হেলিকপ্টারে করে এলাকায় আসেন। স্কুলমাঠে অবতরণ করার পর তিনি হেঁটে খালের স্থানে যান এবং নিজ হাতে কোদাল তুলে মাটি কাটেন। শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, তিনি সত্যিই শ্রমে অংশ নেন। মাটি তুলে ঝুড়িতে দেন, আর সেই ঝুড়ি তুলে দেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি করিম বকস মণ্ডলের মাথায়। এমন দৃশ্য সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে।
সেই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া আবদুল বারিক মণ্ডল বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির সেই উদ্যোগ আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। হাজার হাজার মানুষ কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই খাল কাটার কাজে নেমে পড়েছিল। আমাদের শুধু দুপুরে রুটি আর গুড় খাওয়ানো হতো। কিন্তু তাতেই আমরা খুশি ছিলাম। কারণ আমরা জানতাম, এই খাল আমাদের জীবন বদলে দেবে।’
সত্যিই তাই হয়েছিল। খাল খননের আগে উত্তর শার্শার পাঁচটি বড় বিলের পানিনিষ্কাশনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। বর্ষাকালে বিশাল এলাকা পানিতে ডুবে থাকতো, আর শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে ফসল ফলানো যেত না। প্রায় ২২ হাজার একর জমি বছরের বেশিরভাগ সময় অনাবাদি থাকতো। কৃষকদের জীবনে নেমে আসতো দুর্ভোগ, দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী।
এই প্রেক্ষাপটে উলাসী-যদুনাথপুর খাল খনন ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বেতনা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে খালটি বিলগুলোর পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পথ তৈরি করে। ফলে জমিগুলো আবাদযোগ্য হয়ে ওঠে। সেচের জন্য খালের পানি ব্যবহার শুরু হয়। খালের দুই পাশে স্থাপন করা হয় প্রায় ২০টি সেচ পাম্প। এর ফলে ইরি বা বোরো ধানের আবাদ শুরু হয়, যা এলাকায় খাদ্য উৎপাদনে বিপ্লব ঘটায়।
উলাসী গ্রামের আবু বক্কর সিদ্দিকী, যিনি তখন কিশোর বয়সে এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা ছিলেন ইউপি মেম্বর। রাষ্ট্রপতি জিয়া নিজে মাটি কেটে সেই ঝুড়ি বাবার মাথায় তুলে দেন। সেই দৃশ্য মানুষকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। সবাই বুঝেছিল, এটা শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ।’
‘খাল খননের পরই আমরা এর সুফল দেখতে শুরু করি। আগে যেখানে জমি ডুবে থাকতো, সেখানে ফসল ফলতে শুরু করে। মানুষ স্বাবলম্বী হয়ে ওঠে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা আসে,’ বলছিলেন আবু বক্কর সিদ্দিকী।
উলাসী-যদুনাথপুর খাল প্রকল্পটি শুধু একটি স্থানীয় উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর সফলতার পথ ধরে ১৯৭৭ সালে সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি চালু করা হয়, যা পরে ‘জিয়া মডেল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এটি ছিল একটি টেকসই উন্নয়ন ধারণা, যেখানে জনগণের অংশগ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল স্বেচ্ছাশ্রম। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে কাজ করেছেন। কৃষক, শ্রমিক, সরকারি কর্মচারী এমনকি সাধারণ শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন এই কর্মসূচিতে। এটি একদিকে যেমন পানি ব্যবস্থাপনায় উন্নয়ন ঘটায়, অন্যদিকে সামাজিক সংহতিও বাড়ায়।
এই খালটি শুধু সেচ বা পানিনিষ্কাশনের মাধ্যম ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল সামাজিক সম্পদ। খালে দেশি মাছ পাওয়া যেত, যা স্থানীয় জেলেদের জীবিকার উৎস ছিল। খালের পানি ঘিরে গড়ে উঠেছিল একধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই খালের গুরুত্ব কমতে থাকে। নিয়মিত সংস্কার না হওয়ায় পলি জমে খালটি ভরাট হয়ে যায়। পানিপ্রবাহ কমে যায়, অনেক জায়গায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আগের মতো পানি নিষ্কাশন সম্ভব হয় না। কৃষকরা আবারও সমস্যার মুখে পড়ছেন।
যদুনাথপুর (হারিখালী) এলাকার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই খাল একসময় আমাদের বাঁচিয়েছিল। এখন এটি নিজেই মরে গেছে। যদি আবার খনন করা হয়, তাহলে আগের মতো উপকার পাবো।’
আবদুল আজিজ নামের আরেক কৃষক বলেন, ‘আগে পানি জমে ফসল নষ্ট হতো। খাল কাটার পর সেই সমস্যা দূর হয়েছিল। এখন আবার একই সমস্যা দেখা দিচ্ছে।’
উলাসী গ্রামের মনিরুল ইসলাম মনি জানান, খাল খনন চলাকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খালের পাড়ে একটি সাধারণ ভবনে রাত যাপন করেছিলেন। পরে সেটি কৃষক ও কর্মকর্তাদের মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়। কিন্তু এখন সেই ভবনটি পরিত্যক্ত, ভেঙে পড়ার উপক্রম। রাষ্ট্রনায়কের মূল্যবান স্মৃতিচিহ্নগুলোও হারিয়ে গেছে।
খালের পাড়ে নির্মিত ‘জিয়া মঞ্চ’ এখন বিলুপ্তির পথে। ‘উন্নয়নের শপথ নেওয়ার’ সেই চত্বর দখল ও অবহেলার শিকার।
এ বিষয়ে শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলে ওয়াহিদ বলেন, ‘উলাসী-যদুনাথপুর খালটি শুধু একটি খাল নয়, এটি এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য এবং কৃষির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে খালটি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। খালটি সচল করা গেলে কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) উলাসী-যদুনাথপুর খালটি পুনঃখননের উদ্যোগ নিয়েছে। দপ্তরটির নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি জানান, ইতোমধ্যে সার্ভে সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে প্রকাশ্যে টেন্ডার ডেকে ঠিকারদার নিয়োগ করে খালটি পুনঃখনন করা হবে।
এদিকে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর শদীদ জিয়ার খাল খনন কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী উত্তরবঙ্গে এই কর্মসূচি উদ্বোধন করেছেন। তারই ধারাবাহিকতায় সারা দেশে একের পর এক উদ্বোধন হচ্ছে খাল খনন প্রকল্প। আজ শনিবার (২৮ মার্চ) কেশবপুরের গৌরিঘোনা ইউনিয়নে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। তিন কিলোমিটার দীর্ঘ বুড়লি খাল খননের মাধ্যমে যশোরে সরকারের রাজনৈতিক অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পটি শুরু হতে যাচ্ছে।
পর্যায়ক্রমে এ জেলার সব খাল পুনঃখনন শুরু করা হবে জানিয়ে পাউবো নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, যশোরের ভবদহ অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা সমস্যায় আক্রান্ত। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান দরকার। শুধু নদী খনন করলেই হবে না, প্রয়োজন নদীর সঙ্গে যুক্ত খালগুলোও সংস্কার, পুনরুদ্ধার। জলাবদ্ধতা দূর হলে স্থানীয় মানুষের উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, শনিবার সকাল সাড়ে ৮টায় বুড়লি স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হবে খননকাজ উদ্বোধন অনুষ্ঠান। সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে কাজের সূচনা করবেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এমপি। ওই সময় উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুক্তার আলী, যশোর জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খোকন, যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান, পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম, ভবদহ অঞ্চলের তিনটি নদী খনন প্রকল্পের ইনচার্জ লে. কর্নেল মামুনুর রশীদ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের।