'মা আমাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়, মানুষজনের চাপে মা আর বের হতে পারেনি'
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির ঘটনায় ১০ বছর বয়সী আলিফ মোল্লা বেঁচে গেছেন। ঈদের ছুটি শেষে মায়ের সঙ্গে ঢাকায় ফিরছিল আলিফ। হঠাৎ পদ্মা নদীতে বাসটি তলিয়ে গেলে মা-ছেলে বাসের মধ্যে পাশাপাশি বসে থাকা অবস্থায় আলিফকে তার মা ধাক্কা দিয়ে বের করান। তবে মানুষজনের চাপে মা জ্যোৎস্না বেগম নিজে বের হতে পারেননি। আলিফ পানিতে ভেসে ছিলেন। পরে একজন পথচারী গামছা দিয়ে তাকে টেনে তুলেন। এরপর আর তিনি মাকে দেখেননি।
বেঁচে যাওয়া আলিফ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'আমি আর আমার মা বাসের মধ্যে পাশাপাশি বসে ছিলাম। হঠাৎ বাস নদীতে পড়ে গেলে মা আমাকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। মানুষজনের চাপে মা বের হতে পারেনি। আমি পানিতে ভাসছিলাম। পরে একজন আমাকে গামছা দিয়ে টেনে তোলে। এরপর আর মাকে দেখিনি।'
নিহত জ্যোৎস্না বেগম রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের বড় চর বেনিনগর গ্রামের মান্নান মণ্ডলের স্ত্রী। প্রায় পাঁচ বছর আগে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর একমাত্র ছেলে আলিফকে নিয়ে ঢাকার বাইপাইলে বসবাস করতেন। একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করে সংসার চালাতেন। আলিফও সেখানে একটি মাদরাসায় পড়াশোনা করতেন।
সরেজমিনে জ্যোৎস্না বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ পরিবার। মেয়েকে হারিয়ে তার মা শাহেদা বেগম প্রায় পাগলপ্রায় হয়ে পড়েছেন। বারবার মেয়ের কথা মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, কখনো আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
আলিফের নানি শাহেদা বেগম বলেন, '১৯ মার্চ ঈদের ছুটিতে আমার মেয়ে আর নাতি রাজবাড়ীতে এসেছিল। ২৫ মার্চ ঢাকায় ফেরার জন্য আমি নিজে তাদের বাসে তুলে দেই। দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছে আমার মেয়ে ফোন করে বলে- "মা, আমরা এখন ঘাটে।" কথা বলতে বলতে হঠাৎ চিৎকার শুনি। তখন সে বলে, "আম্মা, বাস পদ্মায় পড়ে যাচ্ছে।" এরপর আর কোনো কথা শুনিনি। আমার মেয়েটা ফোনে কথা বলতে বলতে নদীর মধ্যে চলে গেলো।'
তিনি আরও বলেন, 'বাসের মধ্যে আমার মেয়ের সঙ্গে আমার নাতিও ছিল। আমার মেয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে জানালা দিয়ে বের করে দেয়। কিন্তু নিজে আর বের হতে পারেনি।'
আলিফের মামি মিতা বেগম বলেন, 'আলিফ বেঁচে ফিরেছে, কিন্তু তার মা আর নেই। এখন তার আপন বলতে কেউ নেই। আমরা আছি ঠিকই, কিন্তু মায়ের জায়গা কি আর কেউ নিতে পারে?'