ছবির মা-ছেলে আর নেই, বেঁচে আছে বাবা ও কানে ফুল গোঁজা ৪ বছরের নওয়ারা
চার সদস্যের পরিবার। বাবা নুরুজ্জামান, মা আয়েশা আক্তার, নওয়ারা আর তার সাত মাসের ছোট ভাই আরশান। ঈদ-উল ফিতরের আনন্দ উদযাপনে গ্রামের বাড়ি গিয়ে স্মৃতি ধরে রাখতে এভাবেই ছবি তুলেছিল পরিবারটি। এই ছবি এখন সারাজীবন পোড়াবে নুরুজ্জামান আর শিশু নওয়ারাকে। ছবির অর্ধেক অংশ জুড়ে থাকা অপর দুজন আর বেঁচে নেই। পদ্মা নদীতে বাসডুবির মর্মান্তিক ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।
বুধবার রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট এলাকায় পদ্মা নদীতে তলিয়ে যাওয়া সৌহার্দ পরিবহনের বাসে ছিলেন নুরুজ্জামানের স্ত্রী ও সন্তান। ঘটনার সময় মেয়েকে নিয়ে চিপস কিনতে ঘাটে গিয়েছিলেন তিনি। ফিরে এসে জানতে পারেন, তার প্রিয়জনদের নিয়ে বাসটি পানিতে পড়ে গেছে। মুহূর্তেই সবকিছু বদলে যায়। ঈদ শেষে ঝিনাইদহের শৈলকুপা থেকে ঢাকায় ফেরার পথে এমন দুর্ঘটনায় যেন তার জীবনের সব আলো নিভে যায়।
নুরুজ্জামানের বাড়ি ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার কাঁচেরকোল ইউনিয়নের খন্দকবাড়িয়া গ্রামে। বৃহস্পতিবার সকালে সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া। তার বাবা কামরুজ্জামান প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাভারের নয়ারহাটে যাওয়ার, যেখানে আয়েশা ও তার শিশুপুত্রকে দাফন করা হবে।
তিনি জানান, নুরুজ্জামান ও আয়েশা দুজনই ঢাকার সাভার ও মিরপুরের সিআরপি হাসপাতালে চাকরি করতেন। ঈদ উপলক্ষে সন্তানদের নিয়ে কয়েকদিন আগে গ্রামের বাড়িতে আসেন। বুধবার দুপুরে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তারা। সেদিন বিকেলে নুরুজ্জামান ফোন করে বাবাকে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আব্বা আমার সব শেষ। আপনার বৌমা, আরশান পদ্মায় তলিয়ে গেছে।’ সেই সময়ই তিনি জানান, মেয়েকে নিয়ে চিপস কিনতে গিয়ে তিনি বেঁচে যান।
ঘাটে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর রাত তিনটার দিকে উদ্ধারকর্মীরা বাসের ভেতর থেকে তার স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ উদ্ধার করে। পরিবারের স্বজনরা জানান, প্রতি বছর ঈদের ছুটিতে নুরুজ্জামানদের বাড়িতে বিনামূল্যে চিকিৎসা ক্যাম্প বসত। তার ভাতিজা মোবাস্বির আহমেদ বলেন, চাচা-চাচি মিলে এই উদ্যোগ নিতেন। তবে এবার অসুস্থতার কারণে সেটি করা হয়নি।
ঢাকায় ফেরার আগের দিন আত্মীয় বুলবুল আহমেদের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল নুরুজ্জামানের। তিনি বলেছিলেন, ‘ভাগনে আগামীকাল চলে যাচ্ছি। দেখা হবে না।’ তখন কেউ ভাবেননি, সেটিই হয়ে থাকবে শেষ বিদায়।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে তলিয়ে যাওয়া বাসটি বৃহস্পতিবার উদ্ধার করা হয়েছে। আয়েশা ও আরশানসহ মোট ২৬ জনের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় একটি পরিবারের মা আর ছোট্ট আরশান হারিয়ে গেলেও বাবার সঙ্গে বেঁচে আছে ছোট্ট নওয়ারা— যার কানে গোঁজা লাল ফুল এখন এক অমোচনীয় স্মৃতির প্রতীক।