একের পর এক নদী থেকে তোলা হচ্ছে মরদেহ
পদ্মার শান্ত ঢেউগুলো আজ যেন কাঁদছে। রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ৩ নম্বর পন্টুন, প্রতিদিন হাজারো মানুষের ঘরে ফেরার স্বপ্ন বহন করে। বুধবার বিকেলে এই ফেরিঘাট যেন পরিণত হল এক নীরব ঘাতকে। এদিন বিকালে সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস অতল গহ্বরে তলিয়ে গেলে নদীর পাড়ে সৃষ্টি হয় এক ভয়ানক মানবিক বিপর্যয়।
১৯ ঘণ্টা পার হলেও উদ্ধার অভিযান শেষ হয়নি। নদীর বুক চিরে একে একে উদ্ধার হচ্ছে নিথর দেহ। ঘাটে এখন শুধু হাহাকার, আর্তনাদ আর চোখের জল। স্বজনেরা তাদের প্রিয় মানুষ খুঁজছে—কারো কোলে নিখোঁজ সন্তান, কারো কাছে প্রিয় স্ত্রী। উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ যখন বাসটি টেনে তুলল, ভেতর থেকে ১৭টি মরদেহ বেরিয়ে আসলো। এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ২৬ লাশের মধ্যে ১১ জন নারী এবং ৭ জন শিশু। যেই শিশুদের কোলে নিয়ে মায়েরা স্বপ্ন দেখাতেন—আজ তারা সাদা পলিথিনে মোড়ানো নিথর দেহ।
ঘাটে ভিড় করা মানুষদের চোখেও জল। প্রতিটি মরদেহ যখন তোলা হচ্ছে, শত শত মানুষ এগিয়ে যাচ্ছেন, বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে—‘এই বুঝি আমার আপনজন’। পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর প্রিয়জনের দেহ পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সময়, পদ্মার বিশালতাও যেন কাঁপছে। গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের করিডোরে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা, ভেসে আসছে লাশের গন্ধ। একের পর এক মরদেহ শেষবারের মতো স্বজনদের কাঁধে চড়ে বাড়ির পথ ধরছে।
পদ্মা হয়তো আবার তার শান্ত গতিতে বইতে শুরু করবে, ফেরিতে ভিড় জমবে, মানুষ তাদের যান্ত্রিক জীবনে ফিরবে। কিন্তু ২৬টি পরিবারের শূন্যতা, ঘাটে মিশে থাকা কান্নার আওয়াজ, আর অজস্র নিথর প্রদীপ—যে প্রদীপ আর কখনো জ্বলে উঠবে না—এই ঘটনায় সারা জীবনের জন্য মানুষের মনে থাকবে।