গাইবান্ধায় জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট, খোলাবাজারে দ্বিগুণ দামে বিক্রি
টানা তিন দিন বন্ধ থাকার পর অবশেষে গাইবান্ধার দুটি ফিলিং স্টেশনে প্রশাসনের উপস্থিতিতে সীমিত পরিসরে জ্বালানি সরবরাহ শুরু হয়েছে। তবে নতুন শর্তে তেল দেওয়ায় জটিলতায় পড়েছেন মোটরসাইকেলচালকরা। অন্যদিকে জেলার অধিকাংশ পাম্পেই তালা ঝুলছে, আর খোলাবাজারে সরকারি দরের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে পেট্রোল ও অকটেন। সংকট এতটাই প্রকট যে অ্যাম্বুলেন্স সেবা ব্যাহত হয়ে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
সোমবার (২৩ মার্চ) রাত সাড়ে ৮টার দিকে শহরের বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন আর রহমান ফিলিং স্টেশনে পুলিশের উপস্থিতিতে তেল সরবরাহ শুরু হয়। এর আগে বিকেল সাড়ে ৫টায় ডিবি রোডের এসএ কাদির অ্যান্ড সন্স ফিলিং স্টেশনে সদর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জাহাঙ্গীর আলমের উপস্থিতিতে তেল বিক্রি শুরু হয়। তবে প্রশাসনের নির্দেশনায় নতুন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, তেল পেতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে হেলমেট পরতে হবে, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মোটরসাইকেলের বৈধ কাগজপত্র দেখাতে হবে। অন্যথায় তেল দেওয়া হবে না, বরং জরিমানা গুনতে হবে চালকদের। এ ছাড়া প্রতিটি মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার জ্বালানি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। এর মাধ্যমে তেলের অপচয় ও মজুত রোধ এবং কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। তেল দেওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তে শত শত বাইকার পাম্পে ভিড় করেন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকেই তেল পাননি। বিশেষ করে যারা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে আনেননি, তারা পড়েছেন সবচেয়ে বেশি বিপাকে।
এসএ কাদির অ্যান্ড সন্স পাম্পের ম্যানেজার মঞ্জরুল কাদির খোকন জানান, আজ (২৪ মার্চ) ৪ হাজার লিটার পেট্রোল এসেছে। এরপর একটি ডিজেলের গাড়িও এসেছে। তিন দিন বন্ধ থাকার পর প্রশাসনের সহায়তায় তেল দিতে পারছেন তারা।
অপেক্ষমাণ একাধিক বাইকার জানান, হঠাৎ এমন নিয়ম কার্যকর হওয়ায় তারা প্রস্তুত ছিলেন না। কেউ কেউ দুপুর থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত তেল না পেয়ে ফিরে গেছেন।
আরজু নামের এক যুবক বলেন, তিনি বিকেল ২টা পর্যন্ত কাদিরিয়া পাম্পে অপেক্ষা করছেন। কেবল টোকেন দেওয়া শুরু হয়েছে, কখন তেল পাবেন জানেন না।
রুম্মান নামের আরেক যুবক বলেন, হেলমেট থাকলেও কাগজপত্র দেখে তেল দেওয়ার বিষয়টি জানতেন না। হঠাৎ এ সিদ্ধান্তে বেকায়দায় পড়েছেন।
এসিল্যান্ড মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সংকট নিরসনে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতিটি গাড়িতে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা করে জ্বালানি দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে চালকদের হেলমেট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মোটরসাইকেলের বৈধ কাগজপত্র থাকতে হবে। অন্যথায় তেল দেওয়া হবে না এবং জরিমানার আওতায় আনা হবে।
অন্যদিকে পাম্পে তেল না থাকলেও খোলাবাজারে অতিরিক্ত দামে জ্বালানি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। সরকার নির্ধারিত দাম পেট্রোল ১১৬ টাকা ও অকটেন ১২০ টাকা হলেও খুচরা বাজারে তা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লিটার দরে বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতাদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট পাম্প থেকে তেল সরিয়ে খোলাবাজারে চড়া দামে বিক্রি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেকে।
পাম্পমালিকদের দাবি, সংকটের অন্যতম কারণ অতিরিক্ত চাহিদা এবং কিছু অসাধু চক্রের তৎপরতা। তারা বাইকে একাধিক পাম্প থেকে তেল সংগ্রহ করে পরে বেশি দামে বিক্রি করছেন। এ কারণে প্রশাসনের সরাসরি তদারকি ছাড়া তেল বিক্রি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে তেল নেই লেখা নোটিশ ঝুলছে। সম্প্রতি গাইবান্ধা শহরের একটি ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে লাইনে দাঁড়ানো গ্রাহকদের মধ্যে তর্কবিতর্কের এক পর্যায়ে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। অভিযোগ আছে, অনেক পাম্পে মজুত থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকদের তেল না দিয়ে গড়িমসি করা হচ্ছে। সাদুল্লাপুরের শাহানা ফিলিং স্টেশনে মজুত তেল সংকট দেখিয়ে খুচরা বাজারের দোকানিদের কাছে গোপনে বিক্রি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জ্বালানি সংকটে ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতেও। সেচ মৌসুমে ডিজেলের অভাবে জমিতে পানি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষক শহিদুল ইসলাম। লাইনে দাঁড়িয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না, আবার বাজারে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে ফুলছড়ি উপজেলায়। তেল সংকটের কারণে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্স বন্ধ থাকায় উন্নত চিকিৎসার অভাবে খোকা মিয়া (৬০) নামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন।
মোটরসাইকেলচালক জাকিরুল ইসলাম বলেন, পাম্পে তেল সংকট থাকলেও আশপাশে বোতলে করে বেশি দামে সেই তেল বিক্রি হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
আরেক ভুক্তভোগী সানা মিয়া বলেন, সরকার নির্ধারিত দাম কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। পাম্পে তেল না থাকায় সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
ওমর ফারুক নামের এক ব্যক্তি জানান, ফিলিং স্টেশনগুলোয় ঘুরতে ঘুরতে তেল না পেয়ে মোটরসাইকেল বন্ধ হয়ে গেছে। এক দোকান থেকে ৩০০ টাকা দিয়ে এক লিটার তেল কিনেছেন।
গাইবান্ধা পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান উজ্জ্বল জানান, তেল সংকটে জেলার সব পাম্পই বন্ধ ছিল। তবে বিকেলে কাদিরিয়া পাম্প ও রাতে আর রহমান ফিলিং স্টেশন সহ কয়েকটিতে তেল দেওয়া শুরু হয়েছে। তার মতে, তেল পেলে অন্যান্য পাম্পগুলোর সঙ্গেও সরবরাহ শুরু করবে।
গাইবান্ধার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক যাদব সরকার জানান, তেলের সংকট ও কালোবাজারে বিক্রিসহ সামগ্রিক বিষয়ে পাম্পমালিকদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছে জেলা প্রশাসন। সংকট নিরসনে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট ডিপো ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যোগাযোগ জোরদার করা হয়েছে।
গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লাইলাতুল হোসেন জানান, যেখানে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেখানে অভিযান চালানো হচ্ছে। অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে সীমিত আকারে মোটরসাইকেলে ২০০ টাকা, পরে ১০০ টাকার জ্বালানি দেওয়া হলেও পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় গত এক সপ্তাহের মধ্যে জেলার ১৭টি পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে দুই পাম্পে সরবরাহ শুরু হলেও জেলার সার্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি। অন্যান্য পাম্পে সরবরাহ চালু না হওয়া পর্যন্ত ভোগান্তি কমার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।