'আব্বু আমাদের যে এভাবে ফেলে গেলা, আমাদের এখন কে দেখবে'
বাড়ির উঠান ভরে গেছে মানুষের ভিড়ে। চারদিকে শোক আর কান্নার আবহ। সাদা কাফনে মোড়ানো বাবার মরদেহ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে দুই শিশু। কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছে, কেউ নীরবে চোখ মুছছে। কিন্তু থামছে না বড় ছেলে রহিতুল ইসলাম সামিউল (১২)-এর কান্না।
কাঁদতে কাঁদতে সে বলছিল, 'আমারে কেন এতিম বানাই গেলা বাপ? আব্বারে কত ভালোবাসি,সেটা বলারও সুযোগ দিল না।'
চট্টগ্রাম নগরীর কর্ণফুলী এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কাতারপ্রবাসী সোলায়মানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে এখন অসহায় হয়ে পড়েছে তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান।
নিহতের বড় ছেলে সামিউল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবার মৃত্যু যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না সে। বারবার বলছিল, 'আমাদের এখন কে দেখবে? আব্বু ছাড়া কীভাবে থাকবো? আমি বড় হয়ে আব্বুকে বসিয়ে খাওয়াবো ভাবছিলাম।'
সে জানায়, আসন্ন ঈদে বাবাকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনাও ছিল। 'আমি কক্সবাজার যেতে বলছিলাম। আব্বু বলছিল ফুলতলী সমুদ্র সৈকতে নিয়ে যাবে। এখন আর কিছুই হবে না', বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।
ছোট ছেলে তাছিফুল ইসলাম (৯) জানায়, দুর্ঘটনার দিন সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। 'আব্বু বলছিল শহর থেকে ফিরে আমাদের নিয়ে নানু বাড়ি যাবে। রাতে শুনি আব্বু আর নাই। আব্বু আমাদের এভাবে কেন রেখে গেল?'
নিহতের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা ডলি (৩০)-এর সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। স্বজনরা জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। ফলে তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
সোমবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে স্থানীয় সুলতানিয়া জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে সোলায়মানের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আত্মীয়স্বজন ও শত শত মানুষ অংশ নেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. শরীফ বলেন, সোলায়মান অত্যন্ত ভদ্র ও মানবিক মানুষ ছিলেন। বিদেশে থেকেও এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। তাঁর মৃত্যু পুরো এলাকাকে শোকাহত করেছে।
নিহতের চাচাতো ভাই মো. ফোরকান বলেন, 'দেশে নির্বাচনে ভোট দিতে ও রাজনৈতিক তৎপরতার কারণে এসেছিল। তার পরিবার নিয়েও অনেক পরিকল্পনা করছিল। হঠাৎ সবকিছু শেষ হয়ে গেল।'
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত রোববার (২২ মার্চ) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর নতুন ফিশারিঘাট ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে গুরুতর আহত হন আনোয়ারা উপজেলার পশ্চিম বরুমছড়া এলাকার বাসিন্দা সোলায়মান।
তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতাল পুলিশ বক্সের ইনচার্জ নুরুল আমিন আশিক বলেন, গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে আনার পরই তাঁর মৃত্যু হয়।
প্রবাসে ফেরার চার দিন আগেই মৃত্যু:
নিহত সোলায়মান মৃত মনিরুজ্জামানের ছেলে। তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। প্রায় ১৮ বছর ধরে কাতারে কর্মরত ছিলেন।
পারিবারিক সূত্র জানায়, গত ২৫ জানুয়ারি এক মাসের ছুটিতে দেশে আসেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতির কারণে বিদেশে ফেরা পিছিয়ে যায়। আগামী ২৬ মার্চ আবার কর্মস্থলে ফেরার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু তার আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।
এদিকে ঘটনার পর নিহতের স্ত্রী রাজিয়া সুলতানা ডলি নগরীর বাকলিয়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ জানায়, মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে রফিকুল করিম (৩০) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি আনোয়ারা উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নের তৈলারদ্বীপ এলাকার বাসিন্দা। দুর্ঘটনার সময় মোটরসাইকেলটি তাঁর চালনায় ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।
বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, 'গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে।'