সরকারি জমি দখল করে ব্যবসা, ভোগান্তিতে নগরবাসী
জমি সরকারি, অথচ বছরের পর বছর দখল করে চলছে ব্যবসা, বাণিজ্যসহ নানা কর্মকাণ্ড। এ দখলদারিত্বের কারণে যানজট, সড়ক দুর্ঘটনাসহ নাগরিকদের বিস্তর সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। যশোর শহরের অন্তত ২০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টসহ শহর ও শহরতলীর অসংখ্য স্থানে এই দখল তৎপরতা চোখে পড়েছে। কোথাও ইট বালি রড সিমেন্ট রেখে ব্যবসা, কোথাও সড়কের অর্ধেকজুড়ে নির্মাণসামগ্রী রেখে বহুতল ভবন নির্মাণ, আবার কোথাও বাস-ট্রাকের পার্কিং বানিয়ে রাখা হয়েছে। কোথাও বা অস্থায়ী স্থাপনাও নির্মাণ করা হয়েছে। মাঝেমধ্যে প্রশাসন এসব অবৈধ দখল উচ্ছেদে পদক্ষেপ নেওয়ারও সিদ্ধান্ত। এমনকি আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় একাধিকবার বিষয়টি নিয়ে আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ খুব একটা চোখে পড়ে না। হলেও ফলে বছরের পর বছর ধরেই ভোগান্তি পোহাতে হয় নাগরিকদের।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, যশোর শহরের মুজিব সড়কের রেলগেট তেঁতুলতলা এলাকায় প্রধান সড়ক জুড়ে ইট ও বালু রেখে নির্মাণকাজ চলছে। চাঁচড়া ডালমিল এলাকায় রাস্তার ওপরে টিনের বাক্স বিক্রির জন্য সাজিয়ে রেখেছেন দোকানিরা। রাস্তার ওপরেই চলছে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ। কিছু দূর এগিয়ে চাঁচড়া সড়কের ওপরে মাটির টানা পুরোনো ট্রলি বিক্রির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে ফেলে রাখা হয়েছে।
চাচড়া বাজার মোড়ে ট্রাক্টর ব্যবসায়ী শাহজাহান মোড়ল বলেন, সরকারি জায়গা দখল করে পুরোনো ট্রাকের মালামাল ফেলে রাখা হয়েছে। এতে মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
চাঁচড়া বাজার ব্যাবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওহেদ সেকেন্দার লুলু বলেন, রাস্তার একাংশ দখলের কারণে সড়কে দুর্ঘটনাও ঘটে থাকে।
ধর্মতলা রেল ক্রসিংয়ের পাশেই চলছে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ। বাজার মোড়ে ফুটপাতের ওপরে মালামাল রেখে বহুতলা ভবন নির্মাণ হচ্ছে। ধর্মতলা বাজার ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক নবীরুজ্জামান জানান, সরকারি জায়গা দখল হয়ে যাওয়ায় গাড়ি পার্কিংয়েরও কোনো জায়গা থাকে না। ধর্মতলা মোড়ে অনেকে বাড়ি করেছেন নিজের জায়গায় কিন্তু বারান্দা করেছেন সরকারি জায়গায়। অনেক স্থানে ড্রেনের জমি দখল হয়ে যাওয়ায় ঠিকমত পানিও নিষ্কাশন হয় না।
আরবপুর মাঠপাড়ায় রাস্তার পাশে মালামাল রেখে দীর্ঘদিন ধরে চলছে বহুতল ভবন নির্মাণ। আরবপুর মৎস্য অফিসের সামনে পুকুরপাড়ে কসাইদের কিলখানা। সেখানে গরু জবাই করে ফেলে রাখা বর্জ্যে চলাচল করা দায়। এরপরেই আরবপুরে মহাসড়কের পাশে রয়েছে বিশাল বাঁশের আড়ত। সেখানে সরকারি জায়গা দখল করে চলছে বাঁশের বাণিজ্য।
আরবপুর এলাকার বাসিন্দা মিজানুর রহমান বলেন, মহাসড়কের পাশে বাঁশ রেখে ব্যবসা করছে। এই বাঁশ ভ্যানে ওঠানো, আনা নেওয়ার সময় মহাসড়কে বাস ট্রাক চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও দেখা দেয়।
আরবপুর দিঘিরপাড় এলাকায় চলছে খোয়াভাঙ্গা মেশিন তৈরির কাজ, নতুন খয়েরতলা ভাস্কর্যের মোড়ে রাস্তার ওপরে রড রেখে চলছে ব্যবসা। পালবাড়ি রাস্তার দুই ধারে চলছে হাঁস, মুরগির বিক্রি ও রাস্তার ওপরে তরমুজ বাজার। রাস্তার ওপরেই ইট বালি রেখে কাজ চলছে। পুরোনো কসবা ঘোষপাড়া রাস্তার পাশে গাছের ছাল-বাকল বিক্রির জন্য শুকানো হচ্ছে। কাঁঠালতলা মোড়ে বহুতলা ভবন তৈরির কাজের মালামাল ইট দিয়ে ঘিরে রেখেছে বালি, পাথর ইট।
নিউমার্কেট ঢাকা রোডে রাস্তার পাশে চলছে ঢালাই পাইপ তৈরির কাজ, বাবলাতলা ব্রিজের পাশে রাস্তার ওপরে গড়ে উঠেছে প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড। পাশে ইট বালি বিক্রির সাইনবোর্ড, চলছে বাঁশ বিক্রিও। দুই রাস্তার মাঝখানে ডিভাইডারের ওপরে তৈরি হচ্ছে বাঁশের চালি। শিক্ষা বোর্ডের সামনে সড়কের একাংশ যেনো গাড়ি পার্কিংয়ের স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।
এ ছাড়া মারকাজ মসজিদের সামনে চলছে বালি বিক্রি, নওয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ছাগল বিক্রির হাট, পাশে চলছে ফার্নিচার তৈরির কাজ, শেখহাটি বাবলাতলায় রাস্তার পাশে ইট, বালু-খোয়া বিক্রি হচ্ছে। ঢাকা রোডের কলকারখানা অফিসের সামনে সরকারি জায়গায় রাস্তার দুই ধারে দোকান তৈরি করে চলছে ব্যবসা। ঢাকা রোডের ব্রিজের পাশে কাঠ প্রসেসিং করে শুকানো হচ্ছে। মনিহার কাঠালতলা রাস্তার দুই ধারে পুরোনো টায়ার ও টিউব বিক্রি চলছে সড়কের ওপরেই।
মনিহার বিজয় স্তম্ভের পাশে সারি সারি টেম্পু, বাস, সিএনজির পার্কিং; পাশে চলছে রাস্তার ওপরে গাড়ি মেরামতের কাজ। বকচরের ছয়লেন দখল হয়ে চার লেনে পরিণত হয়েছে। সিটি কলেজের সামনে থেকে নীলগঞ্জ পর্যন্ত দুই ধারে রাস্তা দখল করেও চলছে নানা ব্যবসা। শহরের বেজপাড়া, শংকরপুর, খড়কি, রেলরোড এলাকায়ও ফুটপাত ও সড়ক জুড়ে নানান কায়দায় চলছে দখলদারিত্ব। যশোর শহরের বড়বাজার, চুড়িপট্টি, হাটখোলা, এইচএমএম রোডসহ বিভিন্ন সড়কে দোকানের সামনে রাস্তার উপরে মালামাল সাজিয়ে রেখে ব্যবসা করছেন দোকানিরা।
উদীচী যশোরের সভাপতি অ্যাডভোকেট আমিনুর রহমান হীরু বলেন, নানাভাবে ফুটপাত ও সড়ক দখল হয়ে যাওয়া যশোর শহরে যানজট সৃষ্টির অন্যতম কারণ। আবার নদী বা সরকারি জায়গা দখল করেও বহু ভবনসহ নানা স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে প্রশাসন তেমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করে না। মাঝেমধ্যে প্রশাসন ফুটপাতে নামমাত্র অভিযান পরিচালনা করলেও পরে তা আবার দখল হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, কিছু হসপিটাল, রেস্টুরেন্ট, অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে, যাদের নিজস্ব পার্কিং নেই, তাদের গাড়ি রাস্তার ওপর রাখতে হচ্ছে। সেই ক্ষেত্রেও যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের দাবি সরকারি সব জায়গাই অবৈধ দখলমুক্ত করা হোক, যাতে মানুষ উন্মুক্তভাবে চলাচল করতে পারে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যশোরের সাবেক সমন্বয়ক রাশেদ খান বলেন, যশোর শহর ও শহরতলির সড়ক ও মহাসড়কের রাস্তার দুই পাশে অনেক অব্যবস্থাপনা রয়েছে। সড়কের পাশের অবৈধ দখল দ্রুত অপসারণ করা দরকার। জেলা প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা মাসিক সভায় বিষয়টি আলোচিতও হয়। তখন শহরে কিছু জায়গায় অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্ত মহাসড়কগুলোতে তেমন অভিযান পরিচালনা করা হয় না।
এ বিষয়ে যশোর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম শাহীন বলেন, শহর বা শহরতলি রাস্তার পাশে যেসব জেলা পরিষদের জায়গা আছে, সেগুলো পরিদর্শন করে তা উদ্ধারে কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। কোনো প্রকার অবৈধ দখলদার তা ব্যবহার করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সরকার বিভাগ যশোরর উপপরিচালক ও পৌর প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, ঈদের কারণে ফুটপাতে আপাতত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে না। তবে ঈদের পর বিষয়টি নিয়ে সম্মিলিত আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। সব ধরণের অবৈধ দখল উচ্ছেদের ব্যাপারে প্রশাসন আন্তরিক।