১৭ মার্চ ২০২৬, ১৩:৩৮

যশোরে ঈদযাত্রায় অস্বস্তি যশোর-খুলনা ও যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক

যশোর-খুলনা মহাসড়কে সংস্কার কাজ চলছে  © টিডিসি

পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে মানুষ ঘরে ফিরছে। তবে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোতে ঝুঁকি ও দুর্ভোগ তৈরি করেছে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা। যশোর-খুলনা ও যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের খোঁড়াখুঁড়ি, ভাঙাচোরা সড়ক ও ধীরগতির সংস্কারকাজ যাত্রী ও চালকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী, ব্যবসায়ী এবং পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করলেও ঈদযাত্রার এই ব্যস্ত সময়ে প্রতিটি ঘণ্টা বিলম্ব শুধু সময় নষ্ট করছে না, বরং জীবনের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে বলে অভিমত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যশোর-খুলনা মহাসড়কের বসুন্দিয়া এলাকায় গেল ডিসেম্বর থেকে ঢালাইয়ের কাজ শুরু হলেও এখনো অসম্পূর্ণ। প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা খোঁড়া থাকায় যানবাহন ঝুঁকি নিয়ে অন্য পাশে চলাচল করছে। এ কারণে এ ব্যস্ত মহাসড়কে প্রতিনিয়ত যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। ঈদযাত্রার চাপ আরো বাড়বে বলে আশংকা করছেন স্থানীয়রা।

শুধু বসুন্দিয়া নয়, যশোর-খুলনা মহাসড়কের আরও কয়েকটি স্থানে অনুরূপ সমস্যার কারণে ঠিকভাবে গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। ফলে সময়মতো মালামাল পৌঁছানো বা যাত্রাপথ শেষ করা কঠিন হয়ে উঠছে।

যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের অবস্থাও ভিন্ন নয়। এই ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি খুলনা অঞ্চলের সঙ্গে রাজশাহী ও উত্তরবঙ্গকে সংযুক্ত করছে। প্রতিদিন হাজার হাজার বাস, ট্রাক, পিকআপ, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন এ পথে চলাচল করে। দীর্ঘদিন ধরে ছয় লেনে উন্নীত করার প্রকল্পের ধীরগতি, খোঁড়াখুঁড়ি ও ইট বসানো ভঙ্গুর সড়কের কারণে যাত্রীরা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে পড়ছেন। অনেক জায়গায় পিচ উঠে গেছে, কোথাও কোথাও রাস্তার ভিত্তিই দুর্বল। বর্ষাকালে জমে থাকা পানির কারণে গর্তগুলো আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালু ও কাদা শ্বাসকষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

স্থানীয়রা জানান, শুধু খোঁড়াখুঁড়ি বা ভাঙাচোরা সড়কই নয়, মহাসড়কের ওপর নানা ধরনের অবৈধ যানবাহন থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক, অটোরিকশা-ভ্যান, আলমসাধু, নসিমন-করিমনও যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। প্রতিদিনই এসব যানবাহন প্রায় অরাজকভাবে চলাচল করছে, ফলে ঈদ যাত্রায় দ্রুতগতিতে চলা ট্রাক, বাস ও অন্যান্য যানবাহনের জন্য বিপদ তৈরি হচ্ছে। চালকরা জানাচ্ছেন, কখন কোন স্থানে থ্রি-হুইলার বা ইজিবাইক হঠাৎ রাস্তায় দাঁড়িয়ে যায়, তা অনুমান করা মুশকিল। এ অবস্থায় যানজট এবং ধাক্কাধাক্কি ঘটতে দেরি হয় না।

ট্রাকচালক সাদ্দাম হোসেন বলেন, এ সড়কে প্রতিদিনই ভোগান্তি। গর্তে পড়ে গাড়ির স্প্রিং, চাকা ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ নষ্ট হচ্ছে। তবু জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়েই চলতে হয়। এতে মালামাল সময়মতো পৌঁছানোও কঠিন। তিনি আরও যোগ করেন, যাত্রীদের জন্যও ঝুঁকি বাড়ছে। কেউ দুর্ঘটনায় পড়লে সময়মতো চিকিৎসা পৌঁছানোও কঠিন। ঈদের সময় এই সমস্যাগুলো আরো প্রকট হবে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম জানান, প্রতিদিনই দুর্ঘটনা ঘটছে। ট্রাক উল্টে যাচ্ছে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। বর্ষার সময় গর্তে পানি জমে সড়ক আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। শুষ্ক মৌসুমে ধুলাবালুর কারণে শ্বাসকষ্ট, সর্দি-কাশি, চোখে জ্বালা হচ্ছে। 

তিনি মনে করেন, শুধু যানজটই নয়, দূষণ ও বেহাল সড়ক মানুষের জীবনমানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

চালকদের দুশ্চিন্তার সঙ্গে ঈদ যাত্রার চাপ আরও বাড়াচ্ছে গাড়ির সংখ্যা। কুষ্টিয়া থেকে যশোর হয়ে খুলনা পর্যন্ত চলাচলকারী রূপসা বাসের চালক মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিনই গর্তে পড়তে হয়। থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক, অটোরিকশা-ভ্যান, আলমসাধু, নসিমন-করিমনসহ অবৈধ তিন চাকার গাড়ির অনিয়মে মহাসড়কে প্রতিনয়তই যানজট সৃষ্টি হয়। এসব যানবহনে ঝুঁকিও অনেক বেশি।

আরেক ট্রাকচালক সাগর হোসেন বলেন, পণ্যবাহী গাড়ির জন্যও ঝুঁকি বাড়ছে। ট্রাকের লোড দিয়েও সময়মতো মালামাল পৌঁছানো যাচ্ছে না। ঈদের আগে সমস্যা কমাতে প্রশাসনকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

ঈদের আগে সড়ক সংস্কারের দাবিতে ২ মার্চ যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের দ্রুত সংস্কারের জন্য মানববন্ধন করেছে ঝিনাইদহ উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি। মানববন্ধনে সংগঠনটির সভাপতি আশরাফুল আলম বলেন, মহাসড়কটি ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন খুব ধীর। তিন বছরে মাত্র ২ শতাংশ কাজ হয়েছে। দ্রুত সংস্কার না হলে ঈদের পর কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু ভাঙাচোরা রাস্তা নয়, মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা অবৈধ বাজার, থ্রি-হুইলার, ইজিবাইক, অটোরিকশা-ভ্যান, আলমসাধু, নসিমন-করিমন, ধীরগতির যানবাহন এবং রাস্তার একাংশে চলমান নির্মাণ কাজও যানজটের অন্যতম কারণ। কোথাও কোথাও সড়ক প্রশস্তকরণ ও মেরামতকাজ চলায় যানবাহন ধীরগতিতে চলতে বাধ্য। ফলে শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ যাত্রী সবাই সময়ের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

যশোর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া জানান, যশোর-খুলনা মহাসড়কের বসুন্দিয়া অংশে ঢালাইয়ের কাজ ঈদের আগে শেষ করা সম্ভব নয়। তাই ওই এলাকায় যানজটের আশঙ্কা রয়েছে। যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের পরিস্থিতি ‘নাজুক’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি প্রকল্পের মাধ্যমে সংস্কার চলছে। ঈদে সেখানে কিছুটা যানজট হতে পারে, তবে এ দুটো বাদে যশোর-নডাইল ও যশোর-মাগুরা মহাসড়ক ও অনান্য আঞ্চলিক সড়কে বড় ধরনের সমস্যা হবে না।

স্থানীয়রা মনে করেন, সড়ক মেরামতের ধীরগতি সরকারের অগ্রাহ্যতার দৃষ্টান্ত। প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও যানজটের কারণে যাত্রীরা আতঙ্কিত। বাস, ট্রাক, পিকআপ ও মোটরসাইকেল চালকরা জানাচ্ছেন, এই সড়কের বেহাল অবস্থা শুধু সময়ের ক্ষতি করছে না, গাড়ির ক্ষতিসহ জীবন-জীবিকার ঝুঁকি তৈরি করছে। প্রতিটি দুর্ঘটনা, গর্তে পড়ে মালামাল ক্ষয়, যাত্রীদের দেরী-সব মিলিয়ে ঈদযাত্রার আনন্দের মধ্যেও অস্বস্তি বাড়াচ্ছে।

সাধারণ যাত্রীরাও বলছেন বিপদ তারা বিপদে রয়েছেন। যশোর থেকে খুলনার উদ্দেশে যাত্রা করা প্রবাসী সুপ্তি আক্তার বলেন, গর্তে পড়ে বাস থেমে যাচ্ছে। অনেক যাত্রী দেরিতে পৌঁছাচ্ছে। ঈদের আনন্দের পরিবর্তে ভয় তৈরি হচ্ছে। 

আরেক যাত্রী উর্মি খানম বলেন, ‘আমরা চাইলেও নিরাপদে চলাচল করতে পারছি না। ধুলাবালি আর যানজট সব মিলিয়ে যাত্রা কষ্টসাধ্য।’

জেলা পুলিশ জানিয়েছে, ঈদযাত্রায় যানজট ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তারা বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে। পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, যশোর-খুলনা ও যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কে বিশেষ টিম মোতায়েন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশে ট্রাফিক পুলিশের নিয়মিত উপস্থিতি থাকবে। ভাঙাচোরা অংশে সতর্কবার্তা স্থাপন করা হয়েছে। যাত্রী ও চালকদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে যাতে দুর্ঘটনা কমানো যায়।

জেলা পুলিশ আরও জানায়, সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। বিশেষ যানজট মোকাবিলায় টিম গঠন করা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে রেসকিউ ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিসের প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। পুলিশ গণমাধ্যম ও স্থানীয় গণসংযোগের মাধ্যমে যাত্রীদের সচেতন করার কাজ চালাচ্ছে।

পুলিশ সুপার বলেন, ‘আমরা আশা করি, প্রশাসনের কার্যক্রম ও সচেতনতার মাধ্যমে ঈদযাত্রা নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ হবে। তবে সড়কের অবস্থা যদি পূর্বাবস্থায় থাকে, তখন জনগণকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।’