১৬ মার্চ ২০২৬, ১৪:৫২

বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সুযোগে পাহাড় কেটে বালু লুট

এভাবেই পাহাড় কেটে নেওয়া হয়েছে  © টিডিসি

বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়ন ও চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে পাহাড় কেটে অর্ধশতাধিক ডাম্প ট্রাক বালু লুটের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনায় শুধু পাহাড় ও পরিবেশের ক্ষতি হয়নি, বর্ষা মৌসুমে ছাত্রাবাস-সংলগ্ন ভূমিধসের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী নৈশপ্রহরীও জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কিছুদিন ধরে রাতের আঁধারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস-সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশ থেকে নুরুল আলম প্রকাশ মাটি নুরুর নেতৃত্বে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি এক্সকাভেটর ও ডাম্প ট্রাকের সাহায্যে বালু লুট করে আসছিলেন। পরবর্তী সময়ে তারা বালুগুলো ট্রাকযোগে সাতকানিয়া উপজেলার উদ্দুরিক্যা পাড়াস্থ বন বিভাগের জায়গার ওপর দিয়ে দ্রুত অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি অন্য বালু ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন।

আরও জানা যায়, গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া এ কর্মযজ্ঞ চলে ভোর পর্যন্ত। মো. শহিদ নামের স্থানীয় এক ট্রাকচালক বালু লুটের পুরো কার্যক্রম দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী নৈশপ্রহরী মো. শফি ট্রাকপ্রতি ২০০ টাকা করে আদায় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস-সংলগ্ন পাহাড়ের পাদদেশ থেকে অর্ধশতাধিক ডাম্প ট্রাক বালু লুট করে বিক্রি করা হয়েছে। ফলে সেখানে ১০ থেকে ১৫ ফুট গর্ত তৈরি হয়েছে। বালুগুলো পরিবহনের জন্য প্রায় ৩০০ মিটার পাহাড় কেটে রাস্তা তৈরি এবং একটি ঝিরিতে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া লুট করা বালুগুলোর একটি অংশ হলুদিয়া বাজারের আশপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হলেও বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বালু লুটের মূল হোতা নুরুল আলম প্রকাশ মাটি নুরুর বিরুদ্ধে পরিবেশ ও বন আইনে বেশ কয়েকটি মামলা চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া তিনি ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে হলুদিয়া বড়ুয়াপাড়া-সংলগ্ন বন বিভাগের পাহাড় কেটে মাটি বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাটি ব্যবসার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্তী উদ্দুরিক্যা পাড়ার এক নারী বলেন, ‘দিনের বেলায় পাহাড় কেটে বালু নিয়ে যাওয়ার তেমন কোনো চিহ্ন চোখে না পড়লেও রাত হলেই ডাম্প ট্রাকের শব্দ শোনা যায়। কয়েক দিন ধরে এ অবৈধ কার্যক্রম চলছে। আমরা বিষয়টি দেখলেও নিরাপত্তাহীনতা ও অহেতুক ঝামেলার ভয়ে নিশ্চুপ ছিলাম।’

স্থানীয় একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, বালুর পাশাপাশি গাছ লুটের পরিকল্পনা ফাঁস করে দেওয়ায় মো. লোকমান নামের এক ব্যক্তিকে মারধর করা হয়। সেই সূত্র ধরে লোকমানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘মাটি নুরু আমাকে বৈধ বালুর ব্যবসায় শেয়ার রাখার কথা বলে আমার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়েছিল। তারা বালু উত্তোলনের আগমুহূর্তে আমাকে জানানোর কথা থাকলেও না জানিয়ে বালু বিক্রি করা শুরু করেন। পরে আমি ট্রাকচালক মো. শহিদের কাছ থেকে খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে বালু বিক্রির হিসাবের পাশাপাশি অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের বিষয়ে জানতে চাইতে তারা আমাকে শেয়ার থেকে বাদ দিয়ে ওই ২০ হাজার টাকা ফেরত দেবেন বলে জানান।’

তিনি আরও বলেন, ‘কয়েক দিন পর শহিদ আমাকে জানান, তারা সকলে মিলে একই জায়গা থেকে গাছ লুটের পরিকল্পনা করেছেন। পরে আমি বিষয়টি বাগানের কেয়ারটেকারকে জানিয়ে দিলে মাটি নুরু আমার ওপর ক্ষিপ্ত হন। এরপর আমাকে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে হলুদিয়া বাজারে ডেকে মাটি নুরু ও শহিদসহ আরও বেশ কয়েকজন মিলে বেধড়ক মারধর করেন এবং সেখান থেকে টানাহেঁচড়া করে কাইচতলী এলাকায় নিয়ে যান। পরে তারা আমার কাছ থেকে জোরপূর্বক ৫০০ টাকার খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এরপর আমার এক চাচা সেখানে গিয়ে তাদের হাত থেকে আমাকে উদ্ধার করেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে নুরুল আলম প্রকাশ মাটি নুরুর ফোনে যোগাযোগ করা হলে হলে তিনি পাহাড় কেটে বালু বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘আমরা একটি পক্ষ থেকে বালুগুলো ক্রয় করেছি। ইতোমধ্যে ৩২ ডাম্প ট্রাক বালু বিক্রি করেছি। এতে আমি, আজাদ ও লোকমান অংশীদার হিসেবে আছি।’

পরে অপর অভিযুক্ত মো. আজাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে বালু লুটের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ট্রাকচালক মো. শহিদের ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত নম্বরটি বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরার (ধরা) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য সানজিদা রহমান বলেন, পাহাড় কাটা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন নষ্ট হলে মাটির স্থিতিশীলতা কমে যায়। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পাহাড় ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে মানুষের জীবন ও সম্পদের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন পাহাড় কেটে বালু লুটের ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক।

বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ মুহিবউল্যাহ ছিদ্দিকী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি কুচক্রী মহল বালু লুট করেছে বলে জানতে পেরেছি। ইতোমধ্যে বিষয়টি আমরা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে অবগত করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় কারো একক কিংবা পৈতৃক সম্পত্তি নই। এ ঘটনার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট কেউ জড়িত থাকলে তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. রেজাউল করিম বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কতটুকু পাহাড় কাটা হয়েছে তা পরিমাপ করা হবে। এরপর পুরো বিষয়টি তদন্ত করে এ কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বান্দরবান সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবু সালেহ মো. আরমান ভূঁইয়া বলেন, যে বা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড় কেটে বালু লুট করেছে তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হবে।