সবুজের মাঝে টিলার চূড়ায় দাঁড়িয়ে তিন শতকের সাক্ষী বিবিচিনি শাহী মসজিদ
বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি গ্রামে টিলার চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এক গম্বুজের ছোট্ট একটি মসজিদ। তবে আকারে ছোট হলেও ইতিহাস, স্থাপত্য আর রহস্যে ভরপুর এই মসজিদটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে। প্রায় সাড়ে তিনশ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাই আজ পরিচিত ‘বিবিচিনি শাহী মসজিদ’ নামে।
বরগুনা শহর থেকে প্রায় ৪৩ কিলোমিটার দূরে বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদ ঘিরে রয়েছে নানা কিংবদন্তি, অলৌকিক কাহিনি ও স্থাপত্যকলার বিস্ময়।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি পারস্য থেকে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে দিল্লিতে আসেন হজরত শাহ নেয়ামত উল্লাহ নামের এক সাধক। সে সময় মোগল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র ও বাংলার সুবাদার শাহ সুজা তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। পরে ১৬৫৯ সালে শাহ সুজার আগ্রহে হজরত শাহ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.) বরগুনার বেতাগীর এই অঞ্চলে আসেন। তাঁর মেয়ে চিনিবিবির নামানুসারে গ্রামের নাম রাখা হয় বিবিচিনি। পরে এখানে একটি এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করা হয়, যা ‘বিবিচিনি শাহী মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়।
স্থানীয়দের মধ্যে মসজিদটি নিয়ে নানা অলৌকিক গল্পও প্রচলিত রয়েছে। অনেকের দাবি, ১৯৯২ সালের আগ পর্যন্ত এটি ছিল ঘন জঙ্গলে ঘেরা একটি পরিত্যক্ত স্থাপনা। বাঘ, সাপসহ হিংস্র বন্যপ্রাণীর বিচরণভূমি হওয়ায় মানুষ সেখানে খুব একটা যেত না। কেউ কেউ মনে করেন, এটি মানুষের তৈরি নয়; বরং জিন বা পরীর মাধ্যমে নির্মিত হয়েছে। এ কারণেই অনেকেই একে ‘গায়েবি মসজিদ’ বলে অভিহিত করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯২ সালে বিবিচিনি এলাকার এক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মসজিদটির বিষয়টি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে জানান। পরে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সংস্কারের পর থেকেই এখানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে এটি দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৪০ ফুট উঁচু টিলার ওপর অবস্থিত এই মসজিদে উঠতে খাড়া সিঁড়ি বেয়ে যেতে হয়। লালচে ইটের তৈরি প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার বর্গাকার এই মসজিদটির দৈর্ঘ্য-প্রস্থ প্রায় ৩৩ থেকে ৪০ ফুট এবং দেয়াল প্রায় ৬ ফুট পুরু। উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে খিলান আকৃতির প্রবেশপথ। মসজিদের ইটের গঠন ও মাপ বর্তমান সময়ের ইটের তুলনায় ভিন্ন, যা মোগল স্থাপত্যরীতির স্পষ্ট নিদর্শন বহন করে।
মসজিদের পেছনে রয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ ফুট দীর্ঘ একটি কবর। স্থানীয়দের মতে, সংস্কারের সময় সেখানে প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা একটি পায়ের হাড় পাওয়া গিয়েছিল। যদিও এর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। অনেকের ধারণা, এটি হজরত শাহ নেয়ামত উল্লাহ (রহ.)-এর মেয়ে চিনিবিবির কবর।
মসজিদের চারপাশে এখন পাকা রাস্তা করা হয়েছে। মুসল্লিদের সুবিধার্থে রয়েছে অজুখানা, বাথরুম এবং নারীদের জন্য আলাদা নামাজের ঘর। দর্শনার্থীদের জন্য একটি বিশ্রামাগারও নির্মাণ করা হয়েছে। তবে সেটি তালাবদ্ধ থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে।
বিবিচিনি এলাকার নিয়মিত মুসল্লি আব্দুল শুক্কুর বলেন, “আমাদের আগের মুরুব্বিদের কাছ থেকে শুনেছি এখানে একসময় শুধু জঙ্গল ছিল। হঠাৎ করে জঙ্গলের মধ্যে এই মসজিদ দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন এটি গায়েবি মসজিদ।”
পাশের উপজেলা থেকে নামাজ পড়তে আসা রফিক মিয়া বলেন, “এই মসজিদে ঢুকলেই এক ধরনের শীতল অনুভূতি হয়। অনেক জায়গায় নামাজ পড়েছি, কিন্তু এখানের মতো প্রশান্তি আর কোথাও পাইনি।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, ঐতিহাসিক এই মসজিদটি সংরক্ষণে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা খুবই সীমিত। মসজিদের বিভিন্ন স্থানে ফাটলও দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন দর্শনার্থীরা।
মসজিদের ইমাম আবদুল মান্নান বলেন, “আমি প্রায় ২০ বছর ধরে এখানে ইমামতি করছি। বর্তমানে মসজিদের কিছু সংস্কার কাজ জরুরি। সামনের মাঠটি পাকা করা প্রয়োজন। আমরা এখনো কোনো নিয়মিত সরকারি বেতনভাতা পাই না।”
স্থানীয়দের দাবি, যথাযথ সংরক্ষণ ও সরকারি উদ্যোগ নিলে বরগুনার এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দেশের অন্যতম দর্শনীয় ধর্মীয় স্থাপনায় পরিণত হতে পারে