০৮ মার্চ ২০২৬, ১৭:০০

নারীর ঘামে সচল গাইবান্ধা চরাঞ্চলের কৃষি, মজুরি ও মর্যাদায় বৈষম্য

টিডিসি সম্পাদিত  © টিডিসি

ভোরের আলো ফোটার আগেই নদী পাড়ি দিতে ছোটে নারীদের দল। ব্রহ্মপুত্র নদের বুকে নৌকাভর্তি হয়ে তারা ছুটে যায় চরের উদ্দেশ্যে। কারও হাতে দা, কারও মাথায় ঝুড়ি। গন্তব্য—ধানক্ষেত, মরিচের জমি, সবজির বাগান। গাইবান্ধার তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলে কৃষি উৎপাদনের যে নীরব বিপ্লব ঘটছে, তার মূল চালিকাশক্তি এই নারীরাই। কিন্তু এই নীরব বিপ্লবের নায়িকাদের অবদানের স্বীকৃতি মেলে না সমানে। পারিশ্রমিক, সামাজিক মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে পুরুষের সঙ্গে তাদের ব্যবধান আকাশ-জমিন।

জেলার সদর, সাঘাটা, ফুলছড়ি ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ২২টি ইউনিয়নের ১৬৫টি চর গ্রামে প্রায় ৪ লাখ মানুষের বাস। জেলার ৩৫ শতাংশ জুড়ে থাকা এই চরাঞ্চলের অর্থনীতি পুরোপুরি কৃষিনির্ভর। বর্ষা শেষে চরজুড়ে ভুট্টা, মরিচ, পেঁয়াজ, বাদাম, ডালসহ নানা ফসলের চাষ হয়। জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ক্ষেতের পরিচর্যা, ফসল তোলা, মাড়াই-ঝাড়াই ও সংরক্ষণ—প্রতিটি ধাপে পুরুষের পাশাপাশি, অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়েও বেশি কাজ করেন নারীরা। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা মৌসুমি কাজের সন্ধানে শহরে চলে যাওয়ায় সংসার ও কৃষিকাজের পুরো দায়িত্ব এখন নারীদের কাঁধেই।

সরেজমিনে ফুলছড়ি উপজেলার বালাসীঘাট, রসূলপুর, হারোডাঙা ও রতনপুর চরে দেখা যায়, পাকা মরিচ তোলা, শুকনা মরিচ বাছাই, ভুট্টার জমিতে আগাছা পরিষ্কার—সব কাজেই ব্যস্ত নারীরা। কেউ আবার ভোরবেলা গাভীর জন্য ঘাস কেটে বাড়ি ফিরছেন, কারণ দিনের বেলা উঠোনে মরিচ শুকাতে হবে। সফিয়া বেগমের মতো নারীরা গরু-ছাগল নিয়ে মাঠে যাচ্ছেন, স্বামী ঢাকায় থাকায় সংসারের হাল ধরে রেখেছেন একাই। ছাগল বিক্রি করে ভাঙাচোরা ঘর মেরামতের স্বপ্ন দেখেন তিনি।

স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির প্রায় ৯০ শতাংশ কাজ নারীরা সম্পন্ন করেন। ফজলুপুর ইউনিয়নের কৃষক মালেক আফসারী বলেন, ‘গ্রামের নারীরা অত্যন্ত ধৈর্য ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করেন। কৃষিকাজের সূক্ষ্ম ও সময়সাপেক্ষ কাজগুলো তারা নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেন। কিন্তু সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তাদের শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না, অনেকেই নারীদের কম শক্তির অধিকারী মনে করেন।’

এই মূল্যায়নের ঘাটতি সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে মজুরির বৈষম্যে। একই জমিতে, একই সময়ে, সমান পরিশ্রম করেও নারী শ্রমিকরা পুরুষের অর্ধেক মজুরি পান। হারোডাঙা চরের নারী শ্রমিক আলেয়া বেগম জানান, সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে তাদের মজুরি মাত্র ৩০০ টাকা, যেখানে একই কাজ করলে পুরুষরা পান ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। 

আরেক নারী শ্রমিক জামিলা বেগমের কণ্ঠে ক্ষোভ, ‘আমরা ৩০০ টাকায় সারাদিন রোদে পুড়ি, অথচ আমাদের সঙ্গে কাজ করা পুরুষরা পায় ৬০০ টাকা। কী করব, না খেয়ে থাকব?’

চুক্তিভিত্তিক কাজেও বৈষম্য। মরিচ তোলার কাজে বস্তাপ্রতি দুই কেজি মরিচই নারীদের পাওনা।’

শুধু মজুরি নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকেও তারা বঞ্চিত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী বলেন, ‘ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, সবজি তোলা, মরিচ শুকানো সবই করি। কিন্তু বাজারে ফসল বিক্রি করতে যায় পুরুষরা। টাকা খরচও হয় তাদের মতো করে। আমাদের চাহিদা মতো টাকা ব্যবহার করতে পারি না। মনে হয় আমাদের কষ্টের মূল্যটা কেউ দেখে না।’

কৃষি বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহলের মতে, চরাঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়নের জন্য নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি। নারীমুক্তি কেন্দ্রের গাইবান্ধা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নিলুফার ইয়াসমিন শিল্পী বলেন, ‘সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীরা বৈষম্যের শিকার। নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও শ্রমের মর্যাদা নিশ্চিতে সরকার ও প্রশাসনকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। নীতিমালা প্রণয়ন বা কাগজে-কলমে কাজ দেখালেই হবে না, বাস্তবে মাঠপর্যায়ে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম জানান, কৃষিক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ শতভাগে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। মাঠ দিবস ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চরাঞ্চলের নারীদের দক্ষ করে তুলতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।