০৪ মার্চ ২০২৬, ১৫:৫৫

অনিয়মিত ৫ কনসালট্যান্ট, চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রোগীরা

টুঙ্গিপাড়া ১০০ শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স  © টিডিসি সম্পাদিত

১ লাখ ১৪ হাজার ৪৮২ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া ১০০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। হাসপাতালটি ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত হলেও বাড়েনি চিকিৎসকের সংখ্যা। এর মধ্যে ঠিকমতো হাসপাতালে আসেন না বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। ফলে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে টুঙ্গিপাড়াসহ আশপাশের আরও কয়েক উপজেলার রোগীরা।

রোগীদের অভিযোগ, টুঙ্গিপাড়া হাসপাতালে ৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) থাকলেও নিয়মিত রোগী দেখেন না তারা। আসেন নিজেদের মনমতো। এ ছাড়া রোগীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিকের টেস্ট রিপোর্ট ছাড়া তারা দেখেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, মঙ্গলবার (৩ মার্চ) বেলা ১১টা ১০ মিনিটে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় ২০৭ নম্বর কক্ষে প্রবেশ করছেন অর্থোপেডিক চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) কাজী করিম নেওয়াজ। বেলা ১১টা ২০ মিনিটে ২০৬ নম্বর কক্ষের শিশু চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) আমামা আক্তারের কক্ষটি তালাবদ্ধ। পরে তাকে মোবাইলে কল দিলে ১১টা ৫০ মিনিটে নিজের কক্ষে আসেন। 

গাইনি চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) শিপ্রা নন্দীর কক্ষটিও তালাবদ্ধ। কারণ, সপ্তাহে মাত্র ২ দিন টুঙ্গিপাড়া হাসপাতালে আসেন তিনি। সেই হিসেবে মাসে মাত্র ৮ দিন এসে তুলছেন পুরো মাসের বেতন। চক্ষু চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) আবির মল্লিক হাসপাতালে নেই। আর জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) মো. শাহজাহানের পোস্টিং টুঙ্গিপাড়া হলেও তিনি সব সময় থাকেন মুকসুদপুর। তাই তাকেও হাসপাতালে পাওয়া যায়নি। তবে এসব বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানভীর আহমেদ অনিয়মিত চিকিৎসকদের পক্ষে সাফাই গেয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১০০ শয্যা বিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কনসালট্যান্ট ১০টি ও জুনিয়র কনসালটেন্ট ১১টিসহ মোট ২১টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ৫ জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট।

টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতী গ্রামের রানা শেখ অভিযোগ করে বলেন, ‘গত রোববার সকালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে বসে থেকেও অর্থোপেডিক ডাক্তারের দেখা পাইনি। পরে গোপালগঞ্জ গিয়ে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অন্য অর্থপেডিক ডাক্তার দেখিয়েছি। এতে সময় আর টাকা দুটোই অপচয় হয়েছে।’

এ ছাড়া চিকিৎসা নিতে আসা বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার কলাতলা গ্রামের আরাফাত হোসেন ও পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার সাচিয়া গ্রামের আবু আমের বলেন, ‘টুঙ্গিপাড়া হাসপাতাল আমাদের খুব কাছে। আমরা  এ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করি। এখানে চিকিৎসকের সংখ্যা কম। তারপরও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা নিয়মিত আসেন না। আমাদের সঙ্গে চিকিৎসকরা দুর্ব্যবহার করেন। তাদের  বলে দেওয়া নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিকের রিপোর্ট ছাড়া, তারা  দেখেন না । বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নিয়মিত থাকেন না। তাই আমরা ভালো চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হই। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তারা নিজেদের মনমতো কর্মস্থলে আসেন। আমাদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে এ বিষয়ে জরুরীভাবে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’

বেলা ১১টা ১০ মিনিটে আসার বিষয়ে টুঙ্গিপাড়া হাসপাতালে অর্থোপেডিক চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালট্যান্ট) ডা. কাজী করিম নেওয়াজ বলেন, ‘১ মাস হয়নি এখানে যোগদান করেছি। বেতন-ভাতা নিয়ে দৌড়া-দৌড়ি করতে গিয়ে আসতে একটু দেরি হয়েছে।’

শিশু কনসালট্যান্ট আমামা আক্তার বলেন, ‘একটু শরীর খারাপ থাকায় আসতে দেরি হয়েছে।’ আর গাইনি চিকিৎসক শিপ্রা নন্দী, চক্ষু চিকিৎসক আবির মল্লিক ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট (অ্যানেসথেসিয়া) মো. শাহজাহানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। এ কারণে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে প্রথমে চিকিৎসদের পক্ষে সাফাই গেয়ে পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তানভীর আহমেদ।

তিনি বলেন, অর্থোপেডিক চিকিৎসকের বাসা দূরে হওয়াতে আসতে একটু দেরি হয়। আর শিশু ও চক্ষু চিকিৎসক ছুটির আবেদন করেছেন। তবে আবেদনের কোনো লিখিত কপি দেখাতে পারেনি তিনি। আর জুনিয়র কনসালট্যান্ট মো. শাহজাহানের মূল কর্মস্থল টুঙ্গিপাড়া হলেও আগের সিভিল সার্জনের নির্দেশে তিনি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে থাকেন, টুঙ্গিপাড়া আসেন না। অনিয়মিত চিকিৎসকদের সতর্ক বার্তা দেওয়ার পর ঠিক না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।