উপকূলের মহিষের দুধের দই, রোজায় চাহিদা বেড়েছে তিন গুণ
রমজান এলেই ইফতারের টেবিলে বাড়ে সাদা (টক) দইয়ের কদর। বাহারি পদের ভিড়ে রোজাদারদের কাছে এক বাটি ঠান্ডা দই যেন আলাদা প্রশান্তি। সেই চাহিদাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের আনোয়ারার উপকূলীয় এলাকায় এখন জমজমাট দইয়ের বাজার। বিশেষ করে মহিষের দুধের তৈরি দইয়ের চাহিদা রোজায় বেড়েছে প্রায় তিন গুণ।
উপজেলার জুঁইদণ্ডী ইউনিয়নের লামার বাজার ও খুরুস্কুল হাজীর স্টেশন এলাকায় ভোর থেকেই শুরু হয় দই তৈরির ব্যস্ততা। সকাল গড়াতে না গড়াতেই পাইকার ও খুচরা বিক্রেতারা ভিড় করেন। সেখান থেকে আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার বিভিন্ন বাজার ছাড়াও চট্টগ্রাম নগরের দোকান ও রেস্টুরেন্টে সরবরাহ করা হয় এই দই।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এখানকার মহিষের দইয়ের স্বাদ কিছুটা ব্যতিক্রম। অন্যান্য এলাকার দই যেখানে বেশি টক, সেখানে আনোয়ারার দই তুলনামূলকভাবে মিষ্টি ও ঘন। গাভীর দুধের টক ও মিষ্টি দইও স্বাদে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে।
দই ব্যবসায়ী নঈমউদ্দিন বলেন, রমজানে প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার দই বিক্রি হচ্ছে। মাস শেষে তা ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকায় গিয়ে দাঁড়াবে। অন্য সময়ের তুলনায় বিক্রি প্রায় তিন গুণ।
আরেক ব্যবসায়ী মহিউদ্দিন বলেন, ‘প্রতিদিন ছোট-বড় মিলিয়ে ৫-৬ হাজার হাঁড়ি দই বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়। খাঁটি দুধ ছাড়া আমরা দই তৈরি করি না। কোনো কৃত্রিম উপাদান ব্যবহার করা হয় না। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় জমিয়ে দই তৈরি করা হয় বলেই স্বাদ ও ঘনত্ব বজায় থাকে।’
খুরুস্কুল হাজীর স্টেশনের দই ব্যবসায়ী মো. রাসেল বলেন, চাহিদা এত বেশি যে অনেক সময় সরবরাহ কম পড়ে যায়। বিশেষ করে ইফতারের আগ মুহূর্তে দোকানে দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না।
দই কিনতে আসা গিয়াস উদ্দিন পারভেজ বলেন, ‘সারা দিন রোজা রাখার পর ইফতারে এক বাটি ঠান্ডা দই খেলে শরীরটা শান্ত হয়ে যায়। ক্লান্তি কমে।’
সরেঙ্গা থেকে দই কিনতে আসা কলেজছাত্রী তাসনিম আক্তার বলেন, ‘আমাদের বাসায় ইফতারে ফল, ছোলা আর দই থাকবেই। মা বলেন, দই না হলে ইফতার অসম্পূর্ণ।’
খুচরা বিক্রেতা ইউনুছ সওদাগর জানান, শীত শেষে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দইয়ের চাহিদাও বেড়েছে। চা-নাশতার দোকানে এখন দই রাখছি। বিক্রিও ভালো হচ্ছে।
স্কুলশিক্ষক সালাউদ্দিন রশিদ বলেন, উপকূলীয় এলাকার দই সাধারণত খাঁটি হয়। এখানে ভেজালের আশঙ্কা কম। তাই নগর থেকেও অনেকে এসে কিনে নিয়ে যান।
স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায়ও দইয়ের গুরুত্ব রয়েছে বলে জানান আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, মহিষের দই হজমে সহায়ক। রোজার সময় এটি শরীরে প্রশান্তি আনে এবং হৃদরোগ প্রতিরোধে উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার বলেন, উপকূলীয় এলাকার ঐতিহ্যবাহী দই উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে মান বজায় রাখা জরুরি। ভোক্তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রশাসনের নজরদারি রয়েছে। প্রয়োজন হলে ব্যবসায়ীদের সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
শতবর্ষের ঐতিহ্য, খাঁটি দুধের ব্যবহার আর প্রজন্মান্তরের অভিজ্ঞতা, সব মিলিয়ে আনোয়ারার উপকূলের মহিষের দুধের দই এখন রমজানের ইফতার বাজারে অন্যতম আকর্ষণ। চাহিদা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এই উপকূলীয় পণ্যের সুনামও।