২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২০:১১

শেরপুরের মাসকলাই ডালের ঐতিহ্যবাহী ‘আমৃত্তি’তে জমজমাট ইফতার

শেরপুরের মাসকলাই ডালের ঐতিহ্যবাহী ‘আমৃত্তি’তে জমজমাট ইফতার  © টিডিসি ফটো

ভোজনরসিক বাঙালির ইফতার মানেই বাহারি খাবারের সমাহার। কুরমা খেজুর, লাচ্ছি, বোরহানি, কলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, লাড্ডু, বুন্দিয়া—আরও কত রকম আয়োজন! কিন্তু এসবের ভিড়ে শেরপুরের মানুষের ইফতারের তালিকায় বিশেষ স্থান দখল করে আছে মাসকলাই ডালের তৈরি জিলাপি, যা স্থানীয়ভাবে ‘আমৃত্তি’ নামে পরিচিত। নারী-পুরুষ সব বয়সী মানুষের কাছেই এর কদর সমান।

শেরপুর জেলার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির মধ্যে অন্যতম এই আমৃত্তি। মূলত শরৎকালে তৈরি হলেও বর্তমানে রমজান মাসকে ঘিরেই এর উৎপাদন ও বিক্রি বেড়ে গেছে কয়েক গুণ। ঝাল খাবারের পাশাপাশি রোজাদারদের কাছে এটি বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ইফতার আয়োজনে এ মিষ্টির রয়েছে ভীষণ চাহিদা।

শেরপুর শহরের গোয়ালপট্টি (ঘোষপট্টি) এলাকাকে ঘিরেই মূলত এই আমৃত্তির জমজমাট বেচাকেনা। রমজান শুরু হলেই এলাকার ১০-১২টি মিষ্টির দোকানে শুরু হয় ব্যস্ততা। দুপুরের পর থেকেই কড়াইয়ে তেল গরম করে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ডালের মিশ্রণ ছাড়া হয়। মুহূর্তেই তা সোনালি রঙ ধারণ করে। পরে সেগুলো ডুবিয়ে রাখা হয় চিনির শিরায়।

শহরের মুন্সিবাজার ঘোষপট্টির দুর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভান্ডারের মালিক মঙ্গল চন্দ্র ঘোষ জানান, প্রথমে কাঁচা মাসকলাই ডাল কয়েক ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। এরপর শিল-পাটায় বা মেশিনে বেটে তার সঙ্গে সামান্য আতপ চালের গুঁড়া বা বেসন মেশানো হয়। কাপড়ের পুঁটলির সাহায্যে গরম তেলে পেঁচিয়ে ভাজা হয় আমৃত্তি। সবশেষে চিনির রসে ডুবিয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়।

তিনি বলেন, দ্রব্যমূল্য বাড়লেও আমরা গুণগত মান বজায় রেখে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে কোনো কৃত্রিম রং বা কেমিক্যাল ছাড়াই আমৃত্তি তৈরি করি।

গোয়ালপট্টি এলাকার পুরনো প্রতিষ্ঠান নন্দ গোপাল মিষ্টান্ন ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী ভোলানাথ ঘোষ জানান, জমিদারি আমল থেকেই প্রায় দেড়শ বছর আগে শেরপুরে এই জিলাপি তৈরির প্রচলন শুরু হয়। তখন থেকে প্রতিবছর রমজানে মাসকলাইয়ের আমৃত্তি তৈরি ও বিক্রি হয়ে আসছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, রমজান মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০০ কেজি থেকে মণ দশেক পর্যন্ত আমৃত্তি বিক্রি হয়। জেলার বাইর থেকেও অনেকেই ছুটে আসেন এই ঐতিহ্যবাহী স্বাদ উপভোগ করতে।

বর্তমানে ঘোষপট্টির বিভিন্ন দোকানে প্রতি কেজি আমৃত্তি ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দুই বছর আগে যেখানে দাম ছিল ১৫০ টাকা, এখন তা বেড়েছে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে। ব্যবসায়ীরা জানান, ডাল, তেল ও চিনির দাম বাড়ায় মূল্য বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে পড়েছে।

আজ সোমবার বিকালে দুর্গাচরণ মিষ্টান্ন ভান্ডারে আমৃত্তি কিনতে আসা শহরের গৃদানারায়ণপুর এলাকার গৃহবধূ মারিয়া আক্তার বলেন, এই আমৃত্তি অত্যন্ত সুস্বাদু। রমজান মাসে ইফতারিতে এটি এক বাড়তি আকর্ষণ। প্রায় প্রতিদিনই আমরা ইফতারে অন্যান্য খাবারের সঙ্গে ডালের আমৃত্তি রাখি।

গরম গরম অবস্থায় আমৃত্তির স্বাদই আলাদা—ঠান্ডা হয়ে গেলে স্বাদ অনেকটাই কমে যায় বলে জানান ক্রেতারা। তাই বিকেলের দিকে দোকানগুলোতে ভিড় বাড়তে থাকে।

ঐতিহ্য, স্বাদ ও রমজানের আবেগ—সব মিলিয়ে শেরপুরের মাসকলাই ডালের ‘আমৃত্তি’ এখন জেলার গণ্ডি পেরিয়ে বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছে।