২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:২৭

অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রস্তাবে আগ্রহ নেই বিএনপি সরকারের, ফাইলবন্দি কমিশনের সুপারিশ

প্রতীকী ছবি  © এআই নির্মিত

সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। বিশেষ করে নিয়োগের আগে পুলিশ বা গোয়েন্দা ভেরিফিকেশনের নামে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ‘সহমত’ নয় এমন প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার প্রবণতাও চলে আসছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন এক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা আনতে নিয়োগের আগমুহূর্তে ভেরিফিকেশন থেকে এই ধরনের তথ্য যাচাই বাতিলের সুপারিশ করেছিল, যা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি এ নিয়ে দেখা যায়নি কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগও।

এদিকে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ফল প্রকাশের ৮ মাস পর পুলিশ ভেরিফিকেশনে দেড় থেকে দুই হাজার প্রার্থীর (দ্বিতীয় দফায় নিয়োগপত্র ইস্যু হওয়ায় এই সংখ্যা কমেছে) বাদ পড়ার ঘটনায় এ নিয়ে নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় নেওয়া সংস্কারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিএনপি সরকারের অনাগ্রহের বিষয়টি পুনরায় দৃশ্যমান হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়োগের পূর্বেই পুলিশ বা ভেরিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক পরিচয় যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে জনপ্রশাসনে দলীয়করণের সূচনা হয়। রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই শুধু প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নষ্ট করে না, বরং যোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। তাদের মতে, এটি সরকারি প্রশাসনে পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বৈষম্যহীন জনপ্রশাসন গড়তে হলে অবিলম্বে এই পদ্ধতি বাতিল করা প্রয়োজন। কিন্তু অন্তর্বর্তীকাল থেকে নিয়ে বিএনপি সরকারের ৭ মাসেও দলটির আগ্রহ না থাকায় জনপ্রশাসনের এই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারে কোনো অগ্রগতি হয়নি।

যা আছে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে
ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসনব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। প্রথম পর্যায়ে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়, পরে আরও পাঁচটি যুক্ত হয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন।

কমিশন ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। এর চেয়ারম্যান করা হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীকে। প্রথমে কমিশনের সদস্য ছিল আটজন, পরে আরও তিনজন যোগ করা হয়। কমিশনকে প্রাথমিকভাবে ৯০ দিনের সময় দেওয়া হলেও পরে তিন দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি কমিশন তার সুপারিশ প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জমা দেয়।

কমিশনের প্রতিবেদনে মোট ১৭টি অধ্যায় ও ১৪টি শিরোনামে দুই শতাধিক সুপারিশ দেওয়া হয়। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সরকারি চাকরিতে ‘রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই’ প্রথা বাতিলের প্রস্তাব।

প্রতিবেদনের নবম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিসিএস পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত নিয়োগের পূর্বে পুলিশের বিভাগের কাছে গোপনীয় প্রতিবেদন চাওয়া হয়। আবার উচ্চতর পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে গোয়েন্দা বিভাগের কাছে রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়া হয়। কারণ জনপ্রশাসনে রাজনীতিকীকরণ এ স্তর থেকেই শুরু হয়। কমিশন মনে করে, এ নিয়ম বাতিল হওয়া প্রয়োজন।

জনপ্রশাসনে নিরপেক্ষতা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সংস্কার সুপারিশে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে পুলিশ বা কোনো গোয়েন্দা বিভাগের কাছে রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চাওয়ার প্রথা বাতিল করার জন্য সুপারিশ করা হলো। কারণ জনপ্রশাসনে রাজনীতিকীকরণ এ স্তর থেকেই শুরু হয়।

এতে বলা হয়, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল ঘোষিত হওয়ার পূর্বে কোনো প্রার্থীর পুলিশ ভেরিফিকেশন করা যাবে না। বিসিএস পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত নিয়োগের পূর্বে পুলিশের বিভাগের কাছে শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা আছে কিনা সে সম্পর্কে প্রতিবেদন চাইবে। প্রয়োজনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় দুর্নীতি দমন কমিশনে প্রতিবেদন চাইতে পারে।

পুলিশ ভেরিফিকেশন কার্যক্রম পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরিবর্তে প্রার্থীর যোগদানকৃত মন্ত্রণালয় কর্তৃক সম্পাদিত হবে বলেও উল্লেখ রয়েছে সুপারিশে। একই সাথে পাসপোর্ট, দ্বৈত নাগরিকত্ব বা এনজিওর বোর্ড গঠনসহ অন্যান্য নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যাচাই বা পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রথা বাতিল করারও সুপারিশ করা হয় এতে।

কমিশন প্রস্তাব করেছে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এসব সুপারিশ স্বল্পমেয়াদি (ছয় মাস), মধ্যমেয়াদি (এক বছর) ও দীর্ঘমেয়াদি (এক বছরের বেশি) সময়ে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণ কী
গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি কমিশন তার সুপারিশ প্রস্তাব করলেও বাস্তবায়নের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা বিভাগ ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় প্রস্তাবটি ওই সময়ে কার্যত ‘ফাইলবন্দি’ অবস্থায় ছিল। এ ছাড়া এ বিষয়ে আগ্রহ নেই বর্তমান সরকারেরও।

বিষয়টি নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগে যোগাযোগ করা হলে কেউ কথা বলতে রাজি হননি। অস্পষ্ট তথ্য দিয়েছেন কেউ কেউ। মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন অনুবিভাগের যুগ্মসচিব মো. তৌফিক ইমাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘এটি পলিসি লেভেলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়।’ একই বক্তব্য বিধি অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মো. আবু রায়হান মিঞার।

তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী এবং সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তাদের সাড়া পাওয়া যায়নি।

যদিও মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও কিছু প্রশাসনিক ক্যাডার এই প্রস্তাব নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, এই ব্যবস্থা তুলে দিলে ‘রাষ্ট্রবিরোধী বা উগ্রপন্থী চিন্তাধারার’ ব্যক্তিরা সহজে প্রশাসনে প্রবেশ করতে পারে। এ ছাড়া দলীয় সমর্থকদের সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে গুরুতর সমস্যা হিসেবে। ফলে বিষয়টি নিয়ে ঐক্যমত গড়ে ওঠেনি।

তবে সুপারিশ বাস্তবায়নে একটি বড় ধরনের সামাজিক চুক্তি (সোশ্যাল কন্ট্র্যাক্ট) ও সামাজিক অঙ্গীকার প্রয়োজন বলে মনে করেন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. এ কে এ ফিরোজ আহমদ। তবে সে জায়গাটি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি বলে মত তার।

সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে ঢাবির এই সিন্ডিকেট সদস্য দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমরা পুরো বিষয়টাকে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি (হোলিস্টিক পার্সপেক্টিভ) থেকে বিচার করেছি এবং সে মতোই সুপারিশ করেছি। কেননা রাজনৈতিক ভূমিকা আর সামাজিক চাহিদার মতো বিষয়গুলো কিন্তু এর সাথে একই সূত্রে গাঁথা। এখন যেকোনো সংস্কারকে যদি খণ্ড খণ্ড (সেগমেন্টেড) করে দেখা হয়, তবে তা ফলপ্রসূ বা কল্যাণকর হবে না। কমিশনের সুপারিশগুলোকে তাই কোনো একটি বিচ্ছিন্ন অংশ হিসেবে না দেখে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট থেকে বিবেচনা করতে হবে। কেবল খণ্ড খণ্ডভাবে দেখলে উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে—যা আমরা শুরুতেই উপলব্ধি করেছি। আমরা তো পুরো ব্যবস্থা বা সিস্টেমের পরিবর্তনের জন্যই সুপারিশগুলো করেছি।

তিনি আরও বলেন, একটি ব্যবস্থা যদি নৈতিক ও সামাজিকভাবে ভেঙে পড়ে, তবে কেবল কাঠামোগত পরিবর্তন এনে লাভ হবে না; কাঠামোগত পরিবর্তনের সাথে যদি নৈতিক ও সামাজিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না আসে, তবে যেকোনো সুপারিশের আংশিক প্রয়োগ কখনো ইতিবাচক ফল আনবে না।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, সংস্কার কমিশনের এই প্রস্তাব দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়া প্রয়োজন। কেননা এভাবে ভেরিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক মত যাচাই দেশের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় গুরুতর বৈষম্যের সৃষ্টি করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কাউকে যদি বাদ দিতে হয়, তার কোয়ালিফিকেশন না থাকলে সে ভাইভা বা রিটেনে বাদ পড়বে। কিন্তু পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে বাদ দেওয়া—অন্য চিন্তার মানুষ, অন্য ভাবনার মানুষ বা অন্য দল করে দেখে কিংবা পরিবার ভিন্ন দলের সাথে যুক্ত বলে নিয়োগ না দেওয়া মহা অন্যায়। এটা মোটেই গ্রহণযোগ্য না এবং ইনজাস্টিস।

প্রাথমিকের ভেরিফিকেশনে বাদ পড়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শিক্ষা এমন একটা জিনিস, যেখানে রাজনীতি করার কিছু নাই। রাজনৈতিক কর্মী নিয়োগ দিতে হলে বহু জায়গা আছে, কিন্তু শিক্ষকতায় না। শিক্ষকের আবার জাত কী, দল কী? শিক্ষক শিক্ষকই, জাস্ট শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে।