শূন্য ১৩ লাখ পদ: ১০০ লিখিত, ৪০ ভাইভা— কোনো গ্রেডে ৫০-এ ২৫, ১৫০-তে ৫০
সরকারি চাকরির তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির (১১-২০ গ্রেড) পদে নিয়োগ বিধিমালায় বড় পরিবর্তন আনছে সরকার। নতুন বিধিমালায় গ্রেডভেদে লিখিত ও মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষার নম্বর পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। এতে লিখিত পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিভিল প্রশাসনে সরকারি কর্মচারীদের পদ আছে প্রায় ২০ লাখ। এর মধ্যে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সোয়া ১৩ লাখ। অর্থাৎ নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে সিভিল প্রশাসনের ৬৫ শতাংশ নিয়োগ প্রভাবিত হবে।
খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী, ১১-১২তম গ্রেডে মোট ১৫০ নম্বরের পরীক্ষায় ৫০ নম্বর থাকবে মৌখিকের জন্য। ১৩-১৬তম গ্রেডের ক্ষেত্রে লিখিত ও মৌখিকের নম্বর হবে ৬০ ও ৪০, আর ১৭-২০ গ্রেডে ২৫ নম্বরের লিখিত পরীক্ষার সঙ্গে ২৫ নম্বরেরই মৌখিক পরীক্ষা রাখা হয়েছে।
রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটি’র বৈঠকে ‘মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও এর আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর এবং সংস্থাগুলোর ১১-২০তম গ্রেডে সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষার মানবণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে কারিগরি পদ ছাড়া প্রশাসনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষায় ৭০ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ৩০ নম্বরের বিধান রয়েছে। নতুন বিধিমালায় ১১-২০ গ্রেডের সরাসরি নিয়োগের জন্য তিনটি পৃথক স্তর নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ১১-১২তম গ্রেডের কোনো পদে সরাসরি নিয়োগ পরীক্ষায় মোট ১৫০ নম্বর থাকবে। এর মধ্যে ১০০ নম্বরের লিখিত এবং ৫০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা হবে। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বিষয় বা সাধারণ জ্ঞানে ২৫ নম্বর করে থাকবে।
১৩-১৬তম গ্রেডের ক্ষেত্রে মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় লিখিত ৬০ এবং মৌখিক ৪০ নম্বর থাকবে। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বিষয় বা সাধারণ জ্ঞানে ১৫ নম্বর করে নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ১৭-২০তম গ্রেডের পদে মোট ৫০ নম্বরের পরীক্ষা হবে। এর মধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ২৫ এবং মৌখিক পরীক্ষায় ২৫ নম্বর থাকবে। লিখিত পরীক্ষায় বাংলায় ১০, ইংরেজিতে ৫, গণিতে ৫ এবং প্রাসঙ্গিক টেকনিক্যাল বিষয় বা সাধারণ জ্ঞানে ৫ নম্বর থাকবে।
নতুন বিধিমালায় কারিগরি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও পৃথক বিধান রাখা হয়েছে। কোনো প্রার্থী লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাকে ব্যবহারিক পরীক্ষায়ও পাস করতে হবে। লিখিত ও ব্যবহারিক—দুই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরই তিনি মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে তাকে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা হবে না।
তবে প্রস্তাবিত বিধিমালা শৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, আনসার ব্যাটালিয়ন, কোস্ট গার্ড, র্যাব বা অন্য কোনো বাহিনী এবং সরকারি কর্ম কমিশনের আওতাভুক্ত কোনো পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
নতুন বিধিমালা প্রণয়নের কারণ হিসেবে সচিব কমিটির কাছে পাঠানো সার-সংক্ষেপে নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সিভিল প্রশাসনে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ১১ থেকে ২০ গ্রেডের কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সোয়া ১৩ লাখ। অর্থাৎ নতুন বিধিমালা কার্যকর হলে সিভিল প্রশাসনের ৬৫ শতাংশ নিয়োগ প্রভাবিত হবে। শৃঙ্খলা বাহিনী, পুলিশ বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড, আনসার বাহিনী ও সরকারি কর্ম কমিশনের আওতাভুক্ত কোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বিধিমালা প্রযোজ্য হবে না বলে প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি (ভুয়া) পরীক্ষার্থী ঠেকাতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন বিধিমালা প্রণয়নের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে সচিব কমিটির জন্য পাঠানো সার-সংক্ষেপে বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, মন্ত্রণালয় বা বিভাগ ও এদের আওতাধীন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, দপ্তর এবং সংস্থাসমূহে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ কার্যক্রমে কিছুসংখ্যক পরীক্ষার্থী নিজে অংশগ্রহণ না করে নানারূপ অসদুপায় (প্রক্সি পরীক্ষার্থী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার ইত্যাদি) অবলম্বন করে চাকরি লাভের চেষ্টা করছেন। ফলে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীর পরিবর্তে অযোগ্য প্রার্থীর চাকরি লাভের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা সুষ্ঠু নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে।’
এদিকে, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিসিএস পরীক্ষার ভাইভা আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত করতে যেখানে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা হয়েছে, সেখানে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে ভাইভার নম্বর বাড়ানো হলে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘পছন্দের লোক নিয়োগ দিতে সাধারণত মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হয়ে থাকে। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানো হলে নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতি চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বেশি মানেই দুর্নীতির সুযোগ দেওয়া। এতে অদক্ষরা সরকারি চাকরিতে ঢুকবে।’