০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:১৯

অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতায় ছাত্রলীগের গেস্টরুম-গণরুম নির্যাতনের চিত্র ডাকসুর গ্রন্থে

‘গেস্টরুম-গণরুম: নির্যাতনের দাগ ও খতিয়ান’ শীর্ষক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন  © টিডিসি সম্পাদিত

বিগত আওয়ামী লীগ আমলে ‘গেস্টরুম’ ও ‘গণরুম’ এই দুটি শব্দ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কৃতির সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। এখানে একজন শিক্ষার্থীকে শিক্ষার্থী হিসেবে দেখা হতো না; দেখা হতো একটি ভাঙার বস্তু, একটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য শরীর, একটি নীরব আনুগত্যের যন্ত্র হিসেবে। কৃত্রিমভাবে জিইয়ে রাখা আবাসন সংকটের ফাঁদে পড়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন নিয়ে আসা তরুণ-তরুণীরা বাধ্য হয়েছে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নিয়ন্ত্রণাধীন গণরুমে উঠতে। গণরুমের অমানবিক পরিবেশ, গেস্টরুমের গালিগালাজ ও নির্যাতনের আতঙ্ক; এসব শুধু শারীরিক ক্ষত নয়; এগুলো মানসিক স্বাস্থ্যে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। অনেকে আর কখনো পড়ার টেবিলে ফিরতে পারেনি, কেউ ক্লাসে ফিরতে পারেনি, কেউ বা নিদারুণ আতঙ্ক নিয়ে কোনোরকমে পাস করে বেরিয়ে গেছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা এসেছিল স্বপ্ন নিয়ে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই তাদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে কবরস্থ করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অর্ধশতাধিকেরও বেশি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সেই গেস্টরুম-গণরুম নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে একটি গ্রন্থে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) উদ্যোগে প্রকাশিত ও সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ সম্পাদিত ‘গেস্টরুম-গণরুম: নির্যাতনের দাগ ও খতিয়ান’ শীর্ষক সেই গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে জুলাই শহীদ স্মৃতি ভবন অডিটোরিয়ামে এ মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর জিএস এস. এম. ফরহাদ এবং শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ‘গেস্টরুম-গণরুম: নির্যাতনের দাগ ও খতিয়ান’ শীর্ষক গ্রন্থের সম্পাদক ও ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ।

শুভেচ্ছা বক্তব্যে মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ‘গেস্টরুম-গণরুম: নির্যাতনের দাগ ও খতিয়ান’ বইটি শুধু একটি প্রকাশনা নয়, এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, কষ্ট ও নিপীড়নের একটি প্রামাণ্য দলিল। গেস্টরুম ও গণরুমকে কেন্দ্র করে যে নির্যাতনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার বাস্তব চিত্র শিক্ষার্থীদের বক্তব্য ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই বইয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর ভয়, চাপ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তাদের অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে বলতে পারেননি। তাদের সেই না-বলা কথাগুলোকে সামনে আনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের এই অধ্যায়টি সংরক্ষণ করাই বইটি প্রকাশের অন্যতম উদ্দেশ্য। আমরা চাই, এই গ্রন্থ ক্যাম্পাসে এমন একটি পরিবেশ তৈরির প্রত্যয়কে শক্তিশালী করুক, যেখানে কোনো শিক্ষার্থীকে আর রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শের কারণে নির্যাতনের শিকার হতে হবে না।

ডাকসুর জিএস এস. এম. ফরহাদ বলেন, গেস্টরুম-গণরুমের নামে শিক্ষার্থীদের ওপর যে নিপীড়ন চালানো হয়েছে, তা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি শিক্ষার্থীদের অধিকার। অতীতে সংঘটিত এসব ঘটনার সুষ্ঠু নথিবদ্ধকরণ প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করে একই ধরনের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে না পারে। ডাকসু শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় কাজ করবে এবং ক্যাম্পাসে জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে।

ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, গেস্টরুম ও গণরুমে শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত নির্যাতনের ইতিহাস আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কখনোই ভয় দেখানো, আধিপত্য বিস্তার কিংবা রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের জায়গা হতে পারে না; এটি হবে জ্ঞানচর্চা, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও নেতৃত্ব বিকাশের নিরাপদ ক্ষেত্র। ফ্যাসিবাদীদের পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের এমন একটি ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী তার রাজনৈতিক মত, পরিচয় বা অবস্থানের কারণে নিপীড়নের শিকার হবে না। ডাকসু শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে এই পরিবর্তনের ধারাকে এগিয়ে নিতে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করবে।

বইটির সহ সম্পাদনায় রয়েছেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না, আফসানা আক্তার, রিয়াদুল ইসলাম যুবা, হোসাইন আহমেদ জুবায়ের, রিজওয়ান মানসুরী, আশফাক উল্লাহ আসিফ, সাইমুম ফেরদৌস, সুহাইল মাহদীন।

‘গেস্টরুম-গণরুম: নির্যাতনের দাগ ও খতিয়ান’ শীর্ষক বইটি উপস্থিত শিক্ষার্থীদের হাতে সৌজন্য কপি প্রদান করেন আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ। এছাড়া অনুষ্ঠানে গণরুম-গেস্টরুমে ছাত্রলীগ কর্তৃক নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীরা তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।

বইটির সহ সম্পাদক রিয়াদুল ইসলাম যুবার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর ছাত্র পরিবহন সম্পাদক ও সিনেট সদস্য আসিফ আব্দুল্লাহ, সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের, হল সংসদের নেতৃবৃন্দ সহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা।