২০ আগস্ট ২০২৬, ২০:৪২

ফারসি ভাষায় বাংলাদেশকে জানার এক অনন্য আয়োজন—‘রোজনামচা’ দ্বিতীয় সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন 

লিটল ম্যাগাজিন ‘রোজনামচা’র দ্বিতীয় সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন  © টিডিসি ফটো

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের উদ্যোগে ফার্সি ভাষায় প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিন ‘রোজনামচা’র দ্বিতীয় সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রকৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, স্থাপত্য, শিক্ষা, জীবনযাপন ও পর্যটনকে ফার্সি ভাষার পাঠকদের সামনে তুলে ধরাই এই সংখ্যার মূল লক্ষ্য।

বুধবার (১৯ আগস্ট ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী কেন্দ্রের মিলনায়তনে ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের উদ্যোগে নবীন শিক্ষার্থীদের স্বাগত, স্নাতক শিক্ষার্থীদের বিদায় এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান-২০২৬ আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব ছিল ফার্সি ভাষার লিটল ম্যাগাজিন ‘রোজনামচা’র দ্বিতীয় সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. জলিল রাহিমি জাহানাবাদি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও মানবিক অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবুল কালাম সরকার এবং ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর মাহদি মৌলায়ি আরানি।

আয়োজক কমিটির দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. কে. এম. সাইফুল ইসলাম খান অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন। ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ মুমিত আল রশিদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন।

ফার্সিতে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও সৌন্দর্য
‘রোজনামচা’র দ্বিতীয় সংখ্যাটি মূলত বাংলাদেশের ভ্রমণ ও সৌন্দর্যকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পরিচিত ও অপরিচিত পর্যটনস্থল, ঐতিহাসিক নিদর্শন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং মানুষের জীবনযাপনের নানা দিক ফার্সি ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।

সংখ্যাটির প্রথম অংশজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে বিভিন্ন লেখা। নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, দ্বীপ, ঐতিহাসিক স্থাপনা, মসজিদ, জাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয়, বাজার ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে ঘিরে এসব লেখা তৈরি করা হয়েছে।

সুন্দরবন, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, কুয়াকাটা, সাজেক, বান্দরবান, সাদা পাথর, হরিণঘাটা, ভোলা, বাঁশখালি ও নেত্রকোনার মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থানগুলো এ সংখ্যায় পরিচিত করা হয়েছে। পাশাপাশি লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, সোনারগাঁও, তাজহাট জমিদারবাড়ি, বালিয়াটি, রবীন্দ্র কুঠিবাড়ি, কাছারি বাড়ি ও হার্ডিঞ্জ ব্রিজের মতো ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাও স্থান পেয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার পরিচয়
বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রগুলোর কথাও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে রয়েছে দুটি পৃথক লেখা। একটি লেখায় বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় গঠনে ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। অন্যটিতে এর ঐতিহাসিক ও জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌন্দর্য নিয়েও রয়েছে স্বতন্ত্র একটি লেখা।

এছাড়া জাতীয় সংসদ ভবন, জাতীয় জাদুঘর, জাতীয় চিড়িয়াখানা ও ধানমন্ডি লেকসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়েও ফার্সি ভাষায় লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশের রিকশা, নদী, নৌভ্রমণ, বাংলা নববর্ষ, মানুষের দৈনন্দিন জীবন, ফলমূল ও ঐতিহ্যবাহী খাবারও এ সংখ্যায় স্থান পেয়েছে। কুমিল্লার রসমালাই ও নেত্রকোনার বালিশ মিষ্টি নিয়েও রয়েছে বিশেষ লেখা।

বিভিন্ন জেলার বৈচিত্র্য ফার্সি ভাষায়
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলের পরিচয়ও ‘রোজনামচা’র দ্বিতীয় সংখ্যায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রাজশাহী নিয়ে রয়েছে একাধিক লেখা। এর মধ্যে রাজশাহী শহরের সৌন্দর্য, রাজশাহী ও শাহ মখদুমের মাজার ভ্রমণ এবং বাংলাদেশের আমের রাজধানী হিসেবে রাজশাহীর পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে।

এছাড়া দিনাজপুর, নরসিংদী, গাইবান্ধা, টাঙ্গাইল, নেত্রকোনা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাঙামাটির ইতিহাস, প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও পর্যটন সম্ভাবনাও ফার্সি ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে। ফলে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের বৈচিত্র্যময় চিত্র ফার্সি ভাষার পাঠকদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।

নদী ও জলভিত্তিক পর্যটন
বাংলাদেশের নদী ও জলভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনাও এ সংখ্যায় গুরুত্ব পেয়েছে। তিস্তা নদী, মাওয়া ঘাট, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এবং নদীকেন্দ্রিক পর্যটনের সম্ভাবনা নিয়ে রয়েছে পৃথক লেখা। পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা, বাংলার বাঘ, ফলমূল এবং বিভিন্ন স্থানীয় খাবার নিয়েও লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

ইরানিদের চোখে বাংলাদেশ
‘রোজনামচা’র দ্বিতীয় অংশে রয়েছে বিশেষ আয়োজন “ইরানি নাগরিকদের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ”।  এ অংশে ইরানি লেখক ও শিক্ষাবিদদের চোখে বাংলাদেশের প্রকৃতি, সবুজ সৌন্দর্য, মানুষের আতিথেয়তা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশে ফার্সি ভাষার বিস্তারের বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। ফলে সংখ্যাটি শুধু বাংলাদেশিদের চোখে বাংলাদেশকে পরিচিত করছে না, বরং ইরানি ও ফার্সিভাষী মানুষের দৃষ্টিতেও বাংলাদেশকে দেখার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।

শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল লেখার প্ল্যাটফর্ম
‘রোজনামচা’র অধিকাংশ লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের বর্তমান শিক্ষার্থী। পাশাপাশি বাংলাদেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফার্সি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গবেষকদের লেখাও এতে স্থান পেয়েছে।

উদ্যোক্তাদের মূল উদ্দেশ্য দুটি। প্রথমত, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের দেশের সংস্কৃতি, সাহিত্য, পর্যটন, কবি, ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ফার্সি ভাষায় লিখতে উৎসাহিত করা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর সঙ্গে বিশ্বের ফার্সিভাষী শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

উদ্যোক্তাদের দাবি, ‘রোজনামচা’ বাংলাদেশে সম্পূর্ণ ফার্সি ভাষায় প্রকাশিত প্রথম লিটল ম্যাগাজিন। এটি ধারাবাহিক প্রকাশনার দ্বিতীয় সংখ্যা। ‘রোজনামচা’র দায়িত্বপ্রাপ্ত সম্পাদক ড. মোহাম্মদ মুমিত আল রশিদ এবং প্রধান সম্পাদক ড. মাজিদ পুইয়ান। নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন তানজিনা বিনতে নূর, বাদল মিয়া, মোছা. ফাহিমা সুমাইয়া ও আনমুন জেসমিন। সম্পাদনা ও পৃষ্ঠা বিন্যাসের দায়িত্বে ছিলেন মরিয়ম দেহশিরি এবং প্রচ্ছদ ডিজাইন করেছেন মেহের নিগার। প্রকাশক নবান্ন।

ম্যাগাজিনটি প্রকাশের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে সম্পাদকীয় পরিষদের সদস্য, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রকাশক এবং ঢাকাস্থ ইরান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। এ উদ্যোগকে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করা হয়েছে।