১৩ মে ২০২৬, ১৩:৪৪

দুই মণ ধান বিক্রি করলে হচ্ছে এক শ্রমিকের মজুরি, বড় লোকসানে কৃষক

গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বালাডাঙ্গা গ্রামে  © টিডিসি ফটো

দুই মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের মজুরি, এই ডাঙ্গায় আট বিঘা জমি লাগাইছি। খরচ হইছে তিন লাখের বেশি। কিষান কিনছি ১৪শ টাকা কইরা। আর ধানের মণ বিক্রি করতেছি ৮শ টাকায়। দুই মণ ধান বেইচা একটা কিষানের টাকা দিতে হইতেছে। এভাবে চাষাবাদ কইরা আর পারমু না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বালাডাঙ্গা গ্রামের কৃষক শহীদ মোল্লা। বুধবার (১৩ মে) দুপুরে নিজ জমিতে বসেই আক্ষেপের কথা জানান তিনি।

টুঙ্গিপাড়ায় এবার বোরো ধানের ফলন ভালো হলেও কৃষকের মুখে নেই হাসি। স্থানীয় বাজারে ধানের দাম কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। অন্যদিকে শ্রমিকের উচ্চ মজুরি কৃষকদের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে টুঙ্গিপাড়ায় ৮ হাজার ৫৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬৮ হাজার ৩২৪ মেট্রিক টন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও হয়েছে আশানুরূপ।

তবে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বিঘা জমিতে ধান আবাদে খরচ পড়েছে প্রায় ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকা। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক ও পরিচর্যার পাশাপাশি শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটার খরচও বেড়েছে কয়েকগুণ।

কৃষকদের দাবি, এক বিঘা জমির ধান কাটতে অন্তত আটজন শ্রমিক লাগে। প্রতিজন শ্রমিকের মজুরি ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত হওয়ায় শুধু ধান কাটতেই খরচ হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার টাকা। অথচ প্রতি বিঘায় গড়ে ২৪ থেকে ২৫ মণ ধান উৎপাদন হলেও বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২০ হাজার টাকার মতো। এতে প্রতি বিঘায় তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।

উপজেলার চর গোপালপুর গ্রামের কৃষক মালেক মোল্লা বলেন, আজ সকালে তিনজন শ্রমিক আনছি ১৩শ টাকা কইরা। দুই বাপ-ব্যাটা মিলে তাদের সঙ্গে কাজ করতেছি। তিন বেলা খাওনও দিতে হইতেছে। ধান লসে বিক্রি কইরা শ্রমিকের টাকা দিতে হইতেছে।

একই উপজেলার বালাডাঙ্গা গ্রামের নারী কৃষাণি শেফালী রানী বলেন, চাষাবাদ কইরা এ বছর খুব বিপদে পড়ছি। অনেক লোকসান হইতেছে। সরকার ধানের দাম বাড়াইলে আমরা বাঁচতে পারতাম। সরকার যে দাম ঘোষণা করছে, সেই দামে তো ধান বিক্রি করতে পারতেছি না।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে ধানের দাম বেশি নির্ধারণ করা হলেও মাঠপর্যায়ে তারা সেই সুবিধা পাচ্ছেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করছেন।

এ বিষয়ে টুঙ্গিপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাকিবুল ইসলাম বলেন, এ বছর টুঙ্গিপাড়ায় বোরো ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে বাজারে ধানের দাম কম এবং শ্রমিকের মজুরি বেশি হওয়ায় কৃষকরা কিছুটা সংকটে পড়েছেন। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি সরকারি ধান ক্রয় বৃদ্ধি এবং বাজার মনিটরিং জোরদার না করা হলে আগামীতে কৃষকদের বোরো চাষে আগ্রহ কমে যেতে পারে।