২০ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৪২

বাকৃবিতে কম্বাইন্ড ডিগ্রির আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীকে ফেল করানোর অভিযোগ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় লোগো  © সংগৃহীত

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) বিএসসি ইন ভেটেরিনারি সায়েন্স অ্যান্ড অ্যানিমাল হাজব্যান্ড্রি বা ‘কম্বাইন্ড ডিগ্রি’ চালুর দাবিতে আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের একাংশের একাডেমিক ফলাফলে ‘বিরূপ প্রভাব’ পড়ার অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের সাম্প্রতিক ফলাফলকে ঘিরে নতুন করে এ অভিযোগ সামনে এসেছে। 

তাঁদের দাবি, আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে মূল্যায়নে পক্ষপাতের শিকার হয়েছেন। শুধু একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল নয়, বিভিন্ন ব্যাচের একাধিক শিক্ষার্থীর কয়েকটি কোর্সের ফল নিয়েও আগে থেকেই প্রশ্ন রয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে আবেদন করেও দীর্ঘদিন কোনো সিদ্ধান্ত না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

অভিযোগের সূত্রপাত পশুপালন অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এএনএম এহসানুল হক হিমেলের সাম্প্রতিক ফলাফলকে ঘিরে। লেভেল-৩, সেমিস্টার-২-এর ফল প্রকাশের পর অ্যানিমেল সায়েন্স বিভাগের ‘মিট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’ কোর্সের থিওরি ও প্র্যাকটিক্যাল দুই অংশেই তিনি অকৃতকার্য হয়েছেন। হিমেল ২০২৫ সালে কম্বাইন্ড ডিগ্রি চালুর দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে হিমেল তাঁর আগের সেমিস্টারগুলোর ফলাফল ও নম্বরপত্র প্রকাশ করে সাম্প্রতিক ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর দাবি, আন্দোলনের আগে তাঁর একাডেমিক ফলাফল সন্তোষজনক ছিল। আন্দোলনের পর ফলাফলে আকস্মিক পরিবর্তন এবং সর্বশেষ একই কোর্সের থিওরি ও প্র্যাকটিক্যাল দুই অংশে অকৃতকার্য হওয়ায় মূল্যায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। 

হিমেল বলেন, ‘আন্দোলন-পূর্ববর্তী সময়ে আমার চার সেমিস্টারের ফলাফল মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল। লেভেল-২, সেমিস্টার-২ শেষে আমার গড় সিজিপিএ ছিল ৩.৬৭১ এবং তখন পর্যন্ত কোনো কোর্সে আমার ক্যারি (ফেল) ছিল না। আন্দোলনপরবর্তী সময়ে লেভেল-৩, সেমিস্টার-১-এ আমার সিজিপিএ কমে দাঁড়ায় ২.৯৪৬। পরবর্তী সেমিস্টারে সিজিপিএ ৩.২৭৮ হলেও মিট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কোর্সের থিওরি ও প্র্যাকটিক্যাল উভয় অংশেই এফ গ্রেড এসেছে, যা খুবই অপ্রত্যাশিত।’

তিনি আরও বলেন, ‘উক্ত কোর্সের ক্লাস টেস্ট, এটেন্ডেন্স এবং নোটবুকে সন্তোষজনক পারফরম্যান্স থাকা সত্ত্বেও ফেল আসাটা অস্বাভাবিক। আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে কোনো শিক্ষার্থীর একাডেমিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত করা কোনো শিক্ষকের কাছেই কাম্য নয়। ধারাবাহিকভাবে ফলাফল বিপর্যয়ের কারণে আমি এবং আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আমার সহপাঠীদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব আমাদের একাডেমিক জীবনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও পড়ছে।’

এদিকে হিমেলের প্রকাশিত ফলাফল ও নম্বরপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন। কেউ কেউ তাঁর পোস্ট শেয়ার ও পুনঃপ্রকাশ করে ফলাফল মূল্যায়নের বিষয়টি তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে বিষয়টি শুধু হিমেলের ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। এর আগে ভেটেরিনারি অনুষদের বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের আরও কয়েকটি কোর্সের ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের ‘এলিমেন্টারি ডেইরি সায়েন্স’ ও তৃতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের ‘অ্যানিম্যাল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট’ কোর্স দুটি পশুপালন অনুষদের ডেইরি সায়েন্স ও অ্যানিম্যাল সায়েন্স বিভাগের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা পড়ান। দুই বর্ষের শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একই সেমিস্টারের অন্যান্য কোর্সের তুলনায় এসব কোর্সে তাঁদের ফলাফল অস্বাভাবিকভাবে কম হয়েছে।

ভেটেরিনারি অনুষদের ডিন কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ‘এলিমেন্টারি ডেইরি সায়েন্স’ ও ‘অ্যানিম্যাল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট’ দুইটি ভিন্ন বর্ষের দুটি কোর্সেই সর্বোচ্চ গ্রেড এ প্লাস পেয়েছেন মাত্র তিনজন করে শিক্ষার্থী। একই সেমিস্টারের অন্যান্য কোর্সে তুলনামূলক ভালো ফল করলেও এসব কোর্সে প্রত্যাশার তুলনায় কম ফল হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।

ভেটেরিনারি অনুষদের শুধু লেভেল-২ ও লেভেল-৩ নয় লেভেল-১ এর শিক্ষার্থীদেরও পশুপালন অনুষদের সংশ্লিষ্ট কয়েকটি কোর্সের ফল নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। একই সেমিস্টারের অন্যান্য কোর্সে ভালো ফল করলেও এসব কোর্সে ফলাফল তুলনামূলক কম হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।

ফলাফল পুনরালোচনার দাবিতে লেভেল-৩ সেমিস্টার-২ (লেভেল-৩ সেমিস্টার-১ এর ফলাফল নিয়ে) এবং লেভেল-২ সেমিস্টার-২ (লেভেল-২ সেমিস্টার-১ এর ফলাফল নিয়ে) এর শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর আবেদন করেন। ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমানের মাধ্যমে গত ২৬ জানুয়ারি পৃথকভাবে আবেদনগুলো জমা দেওয়া হয়। তবে আবেদন করার ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত বা ফলাফল জানানো হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

ভুক্তভোগী ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কম্বাইন্ড ডিগ্রি চালুর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ভেটেরিনারি ও পশুপালন অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে রয়েছে। আর সেই বিরোধের নেতিবাচক প্রভাব একাডেমিক মূল্যায়নে পড়ছে এবং তার ভুক্তভোগী হচ্ছি আমরা শিক্ষার্থীরা।’

পশুপালন অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী শিবলী সাদী বলেন, ‘গত ১৮ আগস্ট অ্যানিমাল হাজব্যান্ড্রি অনুষদের লেভেল-৩, সেমিস্টার-২-এর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে পরিলক্ষিত হলো, গত সেমিস্টারের ধারাবাহিকতায় এ সেমিস্টারেও কম্বাইন্ড ডিগ্রির দাবিতে সংঘটিত আন্দোলনে যারা সম্মুখসারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের প্রত্যেকের ফলাফলেই বিপর্যয় ঘটেছে। বিশেষ করে অ্যানিম্যাল সায়েন্স বিভাগের মিট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি কোর্সে আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থীদের কারও থিওরি, কারও প্র্যাকটিক্যাল এবং কারও উভয় অংশেই ফেল এসেছে। গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত সমঝোতা সভায় উপাচার্য স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের প্রশাসনিক কিংবা একাডেমিক শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে না। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা এর ব্যত্যয় লক্ষ্য করছি। আশা করি, উপাচার্য এ বিষয়ে সুষ্ঠু সমাধান করবেন।’

এ বিষয়ে পশুপালন অনুষদের ডিন ড. মো. রকিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্বকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ বা আন্দোলনের প্রভাব একাডেমিক ফলাফলে পড়া উচিত নয়। ছাত্ররা যেটি আশঙ্কা করছে, সেটি ঘটেছে বলে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। এরকম ঘটে থাকলে সেটি খুবই দুঃখজনক। একজন শিক্ষকের ভূমিকা একজন বিচারকের চেয়েও বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সবার জন্য সমান এবং কোনো ছাত্রের অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সেদিকে আমরা সজাগ দৃষ্টি রাখছি। যেকোনো গোপনীয় বা নেতিবাচক বিষয় নিশ্চিত না হয়ে সরাসরি ফেসবুকে বা জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত নয়। এতে বিভ্রান্তি ছড়ায়, যা পরবর্তীতে দূর করা কঠিন হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা চাইলে ফলাফল পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করতে পারে। অনুষদের ডিন হিসেবে আমি সেখানে তাদের সহযোগিতায় আছি।’

ভেটেরিনারি সায়েন্স অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. বাহানুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা তাদের ফলাফল নিয়ে অসন্তোষের বিষয়টি আমাকে জানিয়েছিল। এরপর তারা অনুষদের ডিনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বরাবর লিখিত আবেদন করে। আমি আবেদনগুলো একসঙ্গে সংগ্রহ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছি। তবে এখন পর্যন্ত এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সিদ্ধান্ত বা ফলাফল সম্পর্কে জানতে পারিনি।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল হক বলেন, ‘পরীক্ষার ফলাফল পুনর্বিবেচনার বিষয়ে এক্সাম কন্ট্রোলারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তিনি বলতে পারবেন ভেটেরিনারি অনুষদের ছাত্রদের আগের আবেদনটি পৌঁছেছে কি না বা কেন সেটি অ্যাডজাস্ট করা হয়নি।’

অভিযোগকারী শিক্ষার্থীকে বিস্তারিত লিখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে একটি আবেদন করার পরামর্শ দিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটির মাধ্যমে যাতে বিষয়টি খতিয়ে দেখা যায় এজন্য বিস্তারিত বিবরণসহ আবেদন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান স্ট্যাটিউটস ও অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী একাডেমিক নিয়ম মেনে ফলাফল পুনরায় পর্যালোচনার বিষয়টি দেখা হবে।’