০৬ আগস্ট ২০২৬, ১৯:৩২

খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাসেও ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনের উত্তাপ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা  © সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল আন্দোলনের প্রভাব থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগ-সমর্থক ছিলেন। এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের মধ্যেও ছিল। অনেকেই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা সমর্থন জানাতে বাধ্য হতেন। 

তবে অল্পসংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষার্থী শুরু থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। প্রকাশ্যে প্রতিবাদের সুযোগ সীমিত থাকলেও তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং ব্যক্তিগতভাবে আন্দোলনের পক্ষে মত প্রকাশ করতেন। কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বাইরে থেকেও অনলাইনে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান এবং ক্যাম্পাসে থাকা জুনিয়রদের আন্দোলনে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন।

১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের হামলার পর সারা দেশে প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে। ওই রাতেই খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রলীগ-সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী এর প্রতিবাদ জানান। তারা ছাত্রলীগের গ্রুপ ত্যাগ করে সেটির স্ক্রিনশট ফেসবুকে প্রকাশ করেন। পরে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষার্থীও একইভাবে গ্রুপ ছেড়ে প্রকাশ্যে অবস্থান জানান।

১৫ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিতে ইমন ইবনে তারিক, ফারজানা তরফদার নিশি, আকবার আলী, ইসরাত জাহান, সুমাইয়া শিমু, মনিরুল ইসলাম, স্বরন কুমার দাস, রাফিদুল ইসলাম, নাজমুস সাকিব, মনিশা আক্তার, গাজী তানভির, লাইনুন নাহার, সাফিউজ্জামান তোয়াশিন, আবরার মেসবাহ, আরাফ, ফুয়াদ, আবু শাহেদ, তানভীর সপ্নিল, জিহাদসহ আরও অনেক শিক্ষার্থী রাজপথে নামেন। তাঁরা শিববাড়ী পর্যন্ত মিছিল করেন। 

এ সময় কয়েকজন আওয়ামীপন্থী শিক্ষক আন্দোলনে যেতে মানা করেন এবং আন্দোলনে অংশ নিলে গুম হওয়ার আশঙ্কা ও তালিকা তৈরির কথাও শোনা যায়। পাশাপাশি ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের হুমকিও ছিল। তবু শিক্ষার্থীরা আন্দোলন থেকে সরে আসেননি।

১৬ জুলাই আন্দোলনকারীরা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মিছিল করেন। তাদের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘তুমি কে, আমি কে,রাজাকার, রাজাকার’ এবং ‘আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই’। মিছিল শেষে হলে ফিরে তারা আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার খবর জানতে পারেন। রাতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ও রেজিস্ট্রার কোনো প্রকার সিন্ডিকেট ছাড়াই শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেয়। পরদিন সকালে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। এতে শিক্ষার্থীরা ভীত হয়ে পড়ে। তারা কি করবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরদিন সকালে তাদেরকে জোর করে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।

হলের শিক্ষার্থীরা সারাদেশের প্রচন্ড গোলাগুলি ও অস্থিরতার মধ্যে নিজ নিজ বাসায় পৌঁছায় ও কিছু শিক্ষার্থী হলের আশেপাশের বাসা ও মেসে নিরাপত্তাহীনভাবে আশ্রয় নেয়। খুলনায় অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা কারফিউ উপেক্ষা করে শিববাড়ী মোড়, শহীদ হাদীস পার্ক, নিরালা, গল্লামারী ও জিরো পয়েন্টে মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি ও স্লোগান অব্যাহত রাখেন। মাহদী হাসান সীন, আহনাফ তাহমিদ চৌধুরী, সুমাইয়া আনসারী জোহানা, আসিফ শান্ত, অতনু হাওলাদার, সাইমা আক্তারসহ আরও অনেকে এতে অংশগ্রহণ করেন।

১৮ জুলাই মীর মুগ্ধ শহীদ হওয়ার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়। সেদিনই আন্দোলনকে সমন্বিত করার উদ্দেশ্যে ভেটেরিনারি অনুষদের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান, দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে ‘খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণ শিক্ষার্থী’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপ চালু করেন। পরবর্তী সময়ে এই গ্রুপ থেকেই আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালিত হয়। সকল ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ভোটের মাধ্যমে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ শাখাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। 

৩০ জুলাই স্বৈরাচার ঘোষিত ‘শোক দিবস’ প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষার্থীরা একযোগে ফেসবুক প্রোফাইল লাল করেন। জুলাইয়ের আন্দোলনে যখন সকল ইন্টারনেট যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়, তখন এই গ্রুপ থেকে শুধুমাত্র ওয়াইফাই সংযোগের মাধ্যমে খুকৃবি চ্যাট বক্সের ব্যাবস্থা করা হয়। যেখানে আন্দোলনের পরিস্থিতি ও পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করা হতো।

খুলনায় আন্দোলনের সবচেয়ে ভয়াবহ দিন ছিল ২ আগস্ট। সেদিন পুলিশ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও ছররা গুলি নিক্ষেপ করে। এ সময় মাহদী হাসান সীন আহত হলে আহনাফ তাহমিদ চৌধুরী তাকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন। ৪ ও ৫ আগস্ট কারফিউ ভেঙে শিক্ষার্থীরা শিববাড়ী মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের বিজয় আসে। এর ধারাবাহিকতায় ৬ আগস্ট খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয় ‘খুকৃবি সংস্কার আন্দোলন–২৪’।

জুলাইয়ে খুকৃবির শিক্ষকদের ভূমিকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষক নীরব থাকলেও কয়েকজন শিক্ষক চাকুরি ক্ষেত্রে প্রভাব পড়বে জেনেও প্রকাশ্যে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানান। ১৮ জুলাই ড. নজরুল ইসলাম বাদল ফেসবুকে লেখেন, ‘আপনি যদি একজন শিক্ষক হয়ে থাকেন, আর এখনো এই বর্বরোচিত অত্যাচারের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসটুকু না রাখেন, তাহলে এই পেশা আপনার জন্য নয়।’ ড. এম. এ. হান্নান লেখেন, ‘শিক্ষক হিসেবে আমি লজ্জিত। ইতিহাস বলে, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক সংগ্রাম কোনো দিন বৃথা যায়নি, এবারও যাবে না।’

ড. মেহেদী আলম ইমরান ১৬ জুলাই ক্ষুদিরাম বসুর একটি উদ্ধৃতি শেয়ার করে লেখেন, ‘লড়ো। না লড়তে পারলে বলো, না বলতে পারলে লেখো, না লিখতে পারলে সঙ্গ দাও। যদি তাও না পারো, যে পারছে তাকে নিরুৎসাহিত করো না। কারণ, সে তোমার ভাগের লড়াই করছে।’ ৩১ জুলাই মাহবুবা মিশু চোখে লাল কাপড় বাঁধা ছবি প্রোফাইল ছবি হিসেবে ব্যবহার করে লেখেন, ‘স্টপ জেনোসাইড, এভরি লাইফ ম্যাটারস’।

৩ আগস্ট ড. জাবের রানা একটি ভিডিও শেয়ার করেন, যেখানে লেখা ছিল, ‘তোর কোটা তুই নে, আমার ভাইকে ফিরিয়ে দে। লাশের ভেতর প্রাণ দে, নইলে গদি ছাইড়া দে।’ একই দিন ড. নাজমুল হক অপু লেখেন, ‘মানুষের রক্ত কি খুব সুস্বাদু? আপনার এত রক্তের নেশা কেন?’ ১৫ জুলাই জহুরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ছবি শেয়ার করে লেখেন, ‘এই অবস্থা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। খুবই অসহায় আর লজ্জিত মনে হচ্ছে।’ ১৮ জুলাই নুসরাত জাহান মুমু শহীদদের স্মরণে একটি ভিডিও শেয়ার করে লেখেন, ‘আর কত! এত কষ্ট করে বড় করা সন্তান আজ মায়ের সামনে নিথর লাশ হয়ে পড়ে আছে।’

এ ছাড়া ড. তসলিম হোসেন, ড. হাফিজুর রহমান, ডা. আমির হোসেন, ডা. উজ্জ্বল হোসেন, মৌসুমি জাহান সুমি, আরিফ সাদিক, জোনায়েদ তালুকদার, জাকিয়া সুলতানাসহ নাম প্রকাশ না করা আরও অনেক শিক্ষক বিভিন্নভাবে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে বিভিন্নভাবে দাঁড়ান এবং সাহস জোগান।

জুলাইয়ে খুকৃবি সংগঠনগুলোর ভূমিকা
৩০ জুলাই ইন্টারন্যাশনাল ভেটেরিনারি স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (IVSA) খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চ্যাপ্টারের প্রেসিডেন্ট মারুফ আলভি ও এক্সচেঞ্জ অফিসার মাহমুদুল হাসানের আহ্বানে ফেইসবুক পেইজের প্রোফাইল লাল করা হয়। ৪ আগস্ট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জুলাইয়ের হত্যাযজ্ঞ তুলে ধরতে একটি উন্মুক্ত চিঠি প্রকাশ করা হয়। 

এছাড়া ৩ আগস্ট খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির কার্যনির্বাহী কমিটি ও সাধারণ সদস্যদের পক্ষ থেকে একটি প্রতিবাদলিপি প্রকাশ করা হয়। সেখানে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করা হয়। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা ও পুলিশের দমন-পীড়নের তীব্র নিন্দা জানানো হয়।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সংখ্যায় কম হলেও সাহস, ত্যাগ ও অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে নিজেদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করে। আন্দোলনের সেই দিনগুলো আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে সাহস, ঐক্য ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে আছে।