মাংস সবুজ হওয়ার যেসব কারণ জানালেন বাকৃবির খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ
খুলনার পাইকগাছায় রান্নার সময় গরুর মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। এর কারণ ব্যাখা করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোছা. মিনারা খাতুন। তিনি বলেছেন, পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণ ছাড়া এ ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। তাই বিষয়টি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি গুরুত্বহীন মনে করাও উচিত নয়।
শনিবার (২৫ জুলাই) ডেইলি ক্যাম্পাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাকৃবির মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক এবং খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মিনারা খাতুন এসব কথা বলেন।
গত বুধবার বিকেলে খুলনার পাইকগাছা পৌরসভার মডার্ন বেকারির কয়েকজন কর্মচারী বনভোজনের জন্য কেনা গরুর মাংস রান্না করার সময় মাংসের রং অস্বাভাবিকভাবে সবুজ হয়ে যেতে দেখেন। পরে তারা হাঁড়িসহ মাংসটি স্থানীয় থানায় নিয়ে যান। ঘটনার পর কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও এর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নষ্ট মাংস, রাসায়নিক দূষণসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
ড. মিনারা খাতুন বলেন, একদিনের পুরোনো মাংস হওয়াই সবুজ হয়ে যাওয়ার যথেষ্ট ব্যাখ্যা নয়। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ছবি দেখে আতঙ্কিত হওয়ারও কারণ নেই। আবার এমন অস্বাভাবিক পরিবর্তনকে অবহেলাও করা উচিত নয়। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মাংসে অস্বাভাবিক সবুজ রং, দুর্গন্ধ, পিচ্ছিল ভাব বা অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে তা খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করাতে হবে।
তিনি বলেন, জবাইয়ের পর ০ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হলে একদিনের মধ্যে মাংস সাধারণত সবুজ হয়ে যায় না। এ সময় মাংস কিছুটা গাঢ় বা বাদামি বর্ণ ধারণ করতে পারে, তবে স্পষ্ট সবুজ রং ধারণ করা স্বাভাবিক নয়।
মাংসের ঝোল লাল থাকলে সেটি নিরাপদ—এমন ধারণারও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, মাংসের কিছু অংশে সবুজাভ পরিবর্তন হলেও ঝোলের রং স্বাভাবিক থাকতে পারে। কারণ ঝোলের রং মূলত রক্তের রঞ্জক, মসলা এবং রান্নার সময় সংঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে। তাই শুধু ঝোলের রং দেখে মাংস নিরাপদ কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না।
একই গরুর অন্য অংশ খাওয়া ব্যক্তিদের কোনো সমস্যা হয়নি কিংবা বেকারিতে ব্যবহৃত রাসায়নিকের কারণে এমন ঘটনা ঘটেছে—এ ধরনের ধারণারও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই বলে জানান ড. মিনারা। তিনি বলেন, একই পশুর বিভিন্ন অংশে সংরক্ষণ পদ্ধতি, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও দূষণের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে। ফলে একই মাংসের সব অংশে একই ধরনের পরিবর্তন নাও দেখা দিতে পারে।
মাংস সবুজ হয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তিনি মায়োগ্লোবিনের রাসায়নিক পরিবর্তন, অনুপযুক্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ, হাইড্রোজেন সালফাইড উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার কারণে সালফমায়োগ্লোবিন সৃষ্টি, তামা বা অন্যান্য ধাতব যৌগের সংস্পর্শ এবং সিউডোমোনাস প্রজাতির রঞ্জক উৎপাদনকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেন। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে পেশির আঁশে আলোর প্রতিফলনের কারণেও সবুজ, নীল বা রংধনুর মতো আভা দেখা যেতে পারে, যা সবসময় মাংস নষ্ট হওয়ার লক্ষণ নয়।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জবাই থেকে ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন কোল্ড চেইন বজায় রাখা, স্বাস্থ্যসম্মত জবাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ পানি এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এই বিশেষজ্ঞ। একই সঙ্গে ফ্রিজ ও ফ্রিজারের তাপমাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং মাংসের উৎস, জবাইয়ের সময় ও সংরক্ষণসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণেরও পরামর্শ দেন তিনি।