ভর্তি পরীক্ষা থেকে কুবি ভিসির পকেটে ৬ লাখ, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কত পান?
চলতি ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে গুচ্ছ ভর্তি (জিএসটি) পরীক্ষা থেকে বের হয়ে নিজস্ব প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থী ভর্তি নিয়েছে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) প্রশাসন। আর এতেই বাজিমাত বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য থেকে শুরু করে সব কর্তাব্যক্তির। অভিযোগ— এই ভর্তি পরীক্ষার আয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য পারিশ্রমিক বাবদ ৬ লাখ টাকা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরপর পাচ্ছেন উপ-উপচার্য ও কোষাধ্যক্ষ; তাদের দুজন সাড়ে ৫ এবং ৫ লাখ টাকা করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত বাকি শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা পারিশ্রমিক পাবেন। গড়ে তাদের লাখ টাকার কম দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির ভর্তি পরীক্ষার আর্থিক বণ্টনের একটি নথি সামাজিক যোগাযোগামাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখান থেকে এ তথ্য জানা গেছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার আর্থিক বণ্টনের নথি ছড়িয়ে পড়ার পর নেটিজেনরা সেটি প্রশাসনের ভাগ-বাটোয়ারা আখ্যা দিয়ে সমালোচনা করছেন।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে ভর্তি পরীক্ষার এই পারিশ্রমিকটি কম-বেশি হয়ে থাকে। সর্বনিম্ন দেড়-২ লাখ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৮-১০ লাখ টাকাও নেওয়ার নজির রয়েছে উপাচার্যদের। এ নিয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আনোয়ার হোসেনের দাবি, জিএসটির অধীনে থাকা অবস্থায় আরও বেশি পারিশ্রমিক নেওয়া হত। তখন উপাচার্যরা ৮-১০ লাখ টাকা নিতেন।
জানা গেছে, বর্তমানে জিএসটি গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা জনপ্রতি পারিশ্রমিক দেড় লাখের বেশি পেয়ে থাকেন। তবে ভর্তি পরীক্ষার কমিটি কিংবা উপ-কমিটিতে থাকলে আলাদা পারিশ্রমিক নেন। সেটিও এক থেকে দুই-আড়াই লাখ টাকা হয়ে থাকে। তবে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিশেষ করে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়) উপাচার্যরা পারিশ্রমিক কম পেয়ে থাকেন। তাদের পারিশ্রমিক এক থেকে দুই লাখ হয়ে থাকে।
কেননা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার মূল দায়িত্ব পালন করেন অনুষদের ডিনরা। তারা পারিশ্রমিক নেন তিন থেকে ৫ লাখ টাকার মতো, সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র থেকে এমনটি জানা গেছে। তবে ডিনদের দাবি, পারিশ্রমিক হিসেবে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই।
জানা যায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার আয়টি মূলত ভর্তিচ্ছুদের ফরম বিক্রি করে। মোট আয়ের ৪০ শতাংশ নিজস্ব আয় হিসেবে বাজেটে স্থানান্তর করতে হয়। তবে গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে সেটি বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়নে ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে। বাকি ৬০ শতাংশ ভর্তি পরীক্ষার পরিচালনা ব্যয় এবং দায়িত্ব পালন করা শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মানী বাবদ ব্যয় করা হয়।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি পরীক্ষায় ফরম বিক্রি বাবদ সর্বমোট আয় হয়েছে ৯ কোটি ৬৮ লাখ ৭৫ হাজার ১৪০ টাকা। মোট আয়ের ৪০% নিজস্ব আয় হিসেবে বাজেটে স্থানান্তর করলে সেটি দাঁড়ায় ৩ কোটি ৮৭ লক্ষ ৫০ হাজার ৫৬ টাকা। আর বাকি ৬০% শতাংশ অর্থাৎ, ৫ কোটি ৮১ লাখ ৪৭ হাজার ৭২৪ টাকা ভর্তি পরীক্ষার পরিচালনা ব্যয় এবং দায়িত্ব পালন করা শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মানী বাবদ ব্যয় করা হয়। এছাড়াও স্থিতি হিসেবে ২২ হাজার ৬৪০ টাকা রয়েছে।
এই আর্থিক বণ্টনের তালিকাটি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, উপাচার্য ৬ লাখ, উপ-উপাচার্য ৫ লাখ ৫০ হাজার, ট্রেজারার ৫ লাখ, রেজিস্ট্রার ৭০ হাজার এবং প্রক্টর ৫০ হাজার টাকা করে পেয়েছেন। আর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানে শিক্ষক রয়েছেন ২৮৬ জন, এদের প্রতি জন শিক্ষক নিয়েছেন ৭৫ হাজার টাকা।
এছাড়া প্রতি ইউনিটের আহ্বায়ক ৭০ হাজার, প্রতি ইউনিটের সদস্য-সচিব ৪০ হাজার, ট্রেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক ৩০ হাজার, ট্রেকনিক্যাল কমিটির সদস্য (জনপ্রতি) ২০ হাজার, টেকনিক্যাল কমিটির সহায়তাকারী (জনপ্রতি) ৫ হাজার, কোঅপ্ট সদস্য (জনপ্রতি) ১৫ হাজার, ৩য় গ্রেড হতে ৬ষ্ঠ গ্রেডের কর্মকর্তা (জনপ্রতি) ২০ হাজার, ৭ম গ্রেড হতে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তা (জনপ্রতি) ১৭ হাজার, ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী (জনপ্রতি) ১৪ হাজার, ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী (জনপ্রতি) ১২ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। এছাড়াও অনুষদের উপ-কমিটির ও অন্যান্য কমিটির জন্য ২৮ লাখ ৩৫ হাজার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলীকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল দিলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি জবাব পাওয়া যায়নি।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, জিএসটির অধীনে থাকা অবস্থায় শিক্ষকরা আরও বেশি পারিশ্রমিক নিতেন। আলাদাভাবে পরীক্ষা নিলে একজন শিক্ষককে গুচ্ছ থেকে বেশি কষ্ট করতে হয়। জিএসটি থাকা অবস্থায় ভিসিরা ৮-১০ লক্ষ টাকা নিতেন। আমাদের সাবেক ভিসি মঈন স্যার সব টাকা নিয়ে যেতে পারেন নাই; তবুও ৬-৭ লাখ টাকা নিয়ে গেছেন।
তিনি আরও বলেন, আলাদাভাবে পরীক্ষা পরিচালনা করতে বেশি শ্রম দিতে হয়, সেই তুলনায় এটার (টাকা) রেশিও বেশি না। গুচ্ছ থাকা অবস্থায় শিক্ষকগণ আরও বেশি পারিশ্রমিক নিত।
এ বিষয়ে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফরহাদ কাউসার বলেন, স্বতন্ত্র ভর্তি পরীক্ষা নিতে আমরা এক প্রকার বাধ্য করেছি। একের পর এক স্মারকলিপি, আন্দোলন। অথচ ফায়দা নিয়েছেন উনারা। হলের ডাইনিংয়ে বরাদ্দ নাই, বাসে একজনের উপর একজন দাঁড়ায়, অতিরিক্ত বাস আসলেও ফেলে রাখা হয়েছে তেল আর চালকের দোহাই দিয়ে, ক্যাফেতে ভর্তুকি নাই। এরকম শত শত অভাব-অনটন। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীবান্ধব একটা উদ্দ্যোগ নাই। অথচ মহোদয়প্রতি ব্যাংক ব্যালেন্স দেখেন!
তিনি আরো বলেন, শিক্ষার্থীদের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়টা পুরোপুরি উনাদের হাতে তুলে দিয়ে একটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। দুঃখজনক হলেও সত্যি এটাই, উনারা এখানে পড়ানোর চেয়ে কামানোর ধান্ধায় বেশি থাকেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাঈম ভূঁইয়া ফেসবুকে লিখেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় স্বতন্ত্র ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতিতে আনার জন্য কত কিছু করেছি। গত দুই বছর ধরে বলে যাচ্ছি। ভর্তি পরীক্ষার লভ্যাংশের একটা অংশ আপনারা নেন, সমস্যা নাই। কিন্তু পুরো টাকাটা এভাবে ভাগাভাগি করে ফেলিয়েন না। এই টাকার একটা অংশ চাইলেই আবাসিক হল এবং ক্যাফেটেরিয়াতে ভর্তুকি হিসেবে দিতে পারেন। আমাদের শিক্ষক এবং প্রশাসনের টাকার লোভ এত বেশি যে ভর্তি পরীক্ষার টাকার লোভটাও সামলাতে পারে না।
আর্থিক বণ্টনের নথিটি শেয়ার দিয়ে শিহাব উদ্দিন সরকার নামে একজন লিখেছেন, ভর্তি পরীক্ষার টাকা ভাগাভাগি। সবার পকেট এখন অনেক গরম। মামুন রশিদ নামে একজন লেখেন, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে একক পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নেওয়াতে প্রাপ্ত টাকাগুলো ভাগ-বাটোয়ার চিত্র এটি। এটা শুধু একবছরের হিসাব, বিগত বছরের হিসাব লোকচক্ষুর আড়ালে রয়েছে।
অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানী কত?
ভর্তি পরীক্ষার আয় থেকে সম্মানী নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত ও গুচ্ছভুক্ত কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা হয় দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের। এছাড়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিও দেখা হয়।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নথিতে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে উপাচার্যের সম্মানী ২ লাখ, উপ-উপাচার্যদের দেড় লাখ, ট্রেজারারের এক লাখ ৩০ ও রেজিস্ট্রারের ১ লাখ ২৫ হাজার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, প্রতি ইউনিটের পরীক্ষার পর উপাচার্যকে খাম দেওয়া হয়। সেটিতে ১৫-২০ হাজার টাকা থাকে সাধারণত। সে হিসেবে পুরো ভর্তি প্রক্রিয়া লাখ টাকারও কম পেয়ে থাকেন উপাচার্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়টির একজন অধ্যাপক দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ভর্তি পরীক্ষায় আমাদের ডিনরা মূলত ভূমিকা বেশি রাখেন। তারা কয়েক মাস টানা ফুল টাইম কাজ করে থাকেন। এজন্য ৩ থেকে ৫ লাখ হয়ে থাকে তাদের সম্মানী। বাকি শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ঘণ্টায় সম্মানী পেয়ে থাকেন। তবে উপাচার্যদের হিডেন পারিশ্রমিক থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গুচ্ছভুক্ত এক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, গত বছর দেড় লাখের বেশি সম্মানী দেওয়া হয়েছিল। এটি গুচ্ছভুক্ত সব উপাচার্যরা পেয়ে থাকেন। তবে এখানে ভর্তি পরীক্ষার কমিটি ও উপ-কমিটিতে থাকারা আলাদা পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। কমিটির প্রধান দুই লাখের বেশি। তার সাথে থাকারা লাখের মত পারশ্রিমিক পেয়ে থাকেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সিন্ডিকেট সদস্য দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমি নিজে তো ভর্তি পরীক্ষার প্রক্রিয়ার সাথে ছিলাম। ভর্তি পরীক্ষাতে উপাচার্য বা উপ-উপাচার্যরা খুব বেশি সম্মানী ভাতা পান না। যেমন ইউনিটপ্রতি শিক্ষকরা পান ৩ হাজার টাকা, আর ডিনদেরকে দেওয়া হয় ৫ হাজার টাকা। আর উপাচার্য, উপ-উপাচার্যদেরকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের যেমন বিভিন্ন খাত বানিয়ে টাকা নেয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্যরা কখনোই এগুলো করেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুস সালাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ভর্তি পরীক্ষার ডিউটিতে শিক্ষকদের সম্মানী দেওয়া হয়। সেটি একেক পরীক্ষায় একেক রকম— আমাদের নিজস্ব পরীক্ষা হলে একরকম, বাইরের পরীক্ষা হলে একরকম।
তিনি আরও বলেন, ইউনিটপ্রতি ৩ হাজার থেকে শুরু করে ১০, ১২ ও ১৫ হাজারও হয়ে থাকে। ডিনদের সম্ভবত ৪-৫ হাজার টাকা। তবে এখানে লাখ লাখ টাকা সম্মানী পাওয়ার সুযোগ নাই।
(এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন কুবি প্রতিনিধি আকাশ আল মামুন, ঢাবি প্রতিনিধি মো. সজীব ও রাবি প্রতিনিধি মারুফ হোসেন মিশন)