০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১৭:৪৬

সবাই ঢাবিতে চান্স পেয়ে দেখায়, নুসরাত দেখিয়েছে ‘চান্স পেয়েও ভর্তি না হয়ে’

নুসরাত জাহান  © টিডিসি সম্পাদিত

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মেয়ে নুসরাত জাহান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষের একজন শিক্ষার্থী। তিনি চবির ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় মানববিদ্যা ও কলা অনুষদে (বি ইউনিট) ১৫ তম, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের (ডি ইউনিট) ৩১৯ তম, ঢাবিতে বি ইউনিটে ৭৬৬তম বাংলা বিভাগে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। ভর্তি পরীক্ষায় নিজের সাফল্য, প্রস্তুতি ও নতুন ভর্তিচ্ছুদের জন্য কিছু টিপস নিয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের। বলেছেন দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের চান্স পাওয়ার গল্পও। নুসরাতের ভাষায়, আমি মনে করি জীবনে সবকিছুই এককটা পথ, এডমিশনে উত্তীর্ণ না হলেও যে জীবনের সব পথ বন্ধ হয়ে যেত এমন নয়। বরং, আরো নতুন নতুন দিগন্ত খুঁজে বের করতাম। ঢাবিতে ৭৬৬ তম হই। বিশ্ববিদ্যালয়টি নিয়েও আমার খুব বেশি মুগ্ধতা কাজ করত না। আমি ব্যক্তিগতভাবে জীবনকে একটু অন্যরকম করে দেখি। আমার মনে হতো 'ঢাবিতে সবাই বলে চান্স পেয়ে দেখান। আমি ভর্তি না হয়ে দেখাব।' তার কথাগুলো শুনেছেন— চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক আব্দুল্লাহ আল নাঈম

আপনার সাফল্যের খবর পাওয়ার মুহূর্তটি কেমন ছিল? প্রথম কাকে জানিয়েছিলেন?
আমার সাফল্যের খবরটা ছিল আমার জীবনের এক ধরনের ট্র্যাজেডি। আমি প্রথম যখন ‘ডি’ ইউনিটে ৩১৯ তম হই, আমার সঙ্গে একসঙ্গে পরীক্ষা দেওয়া খুব কাছের একজন মানুষের চান্স হয়নি। আমি প্রায় এক দুইদিন খবরটা গোপন রাখলাম। ‘বি’ ইউনিটের পরীক্ষায় সমাজবিজ্ঞান ভবনে বসে কাঁদছিলাম আমার সেই বান্ধবীকে সম্ভবত হারিয়ে ফেলব এই ভয়ে। আমার জীবনে বন্ধুত্ব এই সামান্য সাফল্যের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শুধু মাকেই জানিয়েছিলাম, আর নিষেধ করেছিলাম কাউকে না বলতে। এরপর ‘বি’ ইউনিটে ১৫ তম হই। এডমিশন আমার চিন্তা ভাবনা সবসময় বাস্তবিক ছিলো। আমি মনে করি জীবনে সবকিছুই এককটা পথ, এডমিশনে উত্তীর্ণ না হলেও যে জীবনের সব পথ বন্ধ হয়ে যেত এমন নয়। বরং, আরো নতুন নতুন দিগন্ত খুঁজে বের করতাম। আর ঢাবিতে ৭৬৬ তম হই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও আমার খুব বেশি মুগ্ধতা কাজ করতো না। আমি ব্যক্তিগতভাবে জীবনকে একটু অন্যরকম করে দেখি, আমার মনে হতো 'সবাই বলে চান্স পেয়ে দেখান। আমি ভর্তি না হয়ে দেখাব।'

আমি চট্টগ্রামের মেয়ে। তবে জীবনের প্রথম ১৮টি বছর চট্টগ্রামের বাইরে কাটিয়েছি। ভর্তি পরীক্ষায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও ইংরেজি সাহিত্যে পড়ার ইচ্ছা ছিল। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় এখানেই পড়ার সিদ্ধান্ত নিই। ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি আগে থেকেই আমার আলাদা ভালো লাগা ছিল। পাশাপাশি, আমার বাবাও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। বাবার সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পারিবারিক যোগসূত্রও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি আমার আকর্ষণ বাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের বাইরে গিয়ে ইংরেজি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণেরও ইচ্ছা রয়েছে।

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি আপনি কতদিন আগে থেকে শুরু করেছিলেন এবং কীভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন?
এইচএসসি পরীক্ষার প্রায় চার মাস আগে আমি প্রথম এডমিশন নিয়ে সচেতন হই। বাংলা ইংরেজি শুরু থেকেই খুব মনোযোগ দিয়ে পড়তাম। তখন থেকে এডমিশন কেন্দ্রীক ধারণা নেওয়া শুরু। সাথে এটাও মাথায় রেখেছিলাম যেন এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ না হয় যেহেতু পরীক্ষাও কাছাকাছি সময়ে ছিল। আমি পুরোটা সময় রামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছিলাম যেখানে কোনো ভালো কোচিং সেন্টারও ছিল না। পুরোটাই অনলাইনকেন্দ্রিক পড়াশোনা। 

প্রতিদিন গড়ে কত ঘণ্টা পড়াশোনা করতেন? আপনার পড়ার রুটিনটা কেমন ছিল?
আমার চিন্তা ছিল, অফলাইন কোচিং অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। পরিবেশ বদলে শহরে এসে নিজেকে বিপাকে ফেলার বদলে নিজের কম্ফোর্টজোনে থেকে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিয়ে পড়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো ধরা বাধা নিয়ম না মেনে যতক্ষণ মনোযোগ কাজ করতো, পড়তাম। আমার কেন জানি ১২-১৬ ঘণ্টা পড়া খুব অবৈজ্ঞানিক মনে হতো। আমি ঘণ্টা হিসেব করার চেয়ে ফোকাসে বেশি গুরুত্ব দিতাম। রিলসের মতো ফোকাস নষ্ট করা জিনিসপত্র এড়িয়ে চলতাম। কিন্তু একেবারে অনলাইন বিমুখ ছিলাম না। সমসাময়িক খোঁজখবর রাখতাম। এতে আমার সাধারণ জ্ঞান সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকত। 

ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় কোন বিষয়টি আপনার কাছে সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে? সেটি কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?
পরীক্ষার ভয় কাটানো। আমি কয়েকটি বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিই পরীক্ষার ভয় কাটানোর জন্য। এতো এতো শিক্ষার্থীর মাঝে আমার অবস্থান আসলে কোথায় সবসময় এটা জানার চেষ্টা করতাম। আমি মনে করি হতাশা একটা নেগেটিভ এনার্জি। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, স্রষ্টা যা করেন কল্যাণের জন্য করেন। সুতরাং, পরীক্ষা দিতে ভয় পাব না। আমি ব্যর্থ হলেও স্রষ্টা হয়ত তাতে আমার জন্য কল্যাণই রেখেছেন। 

কোচিংয়ের পাশাপাশি নিজে পড়াশোনা করেছেন কি? আপনার প্রস্তুতিতে কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে বেশি কাজে দিয়েছে?
আমি নির্দিষ্ট কোনো কোচিং ফলো করতাম না। অনেক বেশি পরীক্ষা দিতাম। আমার মুখস্থ অংশ তেমন মনে থাকতো না। তাই বাকি পড়াটুকু খুব বুঝে বুঝে পড়ার চেষ্টা করতাম। ইংরেজির প্রতিটা গ্রামারের ব্যাখ্যা আমি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করতাম। গ্রামার অংশ থেকে প্রশ্ন আসবে, আর আমি ভুল করব এমন যেন না হয়। সাধারণ জ্ঞান মনে রাখা তুলনামূলক কঠিন। কিন্তু ইতিহাস, ভূগোল, পৌরনীতির প্রতি জেনুইন আগ্রহ থেকে বিস্তারিত জেনে কেবল গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো বারবার পড়লেই মনে রাখা সহজ। আর আমি সব টপিকে মোটামুটি ধারণা রাখতাম। একচেটিয়া কোনো কিছু মুখস্থ রাখার চেষ্টা করতাম না। উপভোগ করেই পড়তাম। 

ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নে কোন ধরনের অংশে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?
যে ধরনের টপিকগুলো বুঝে পড়ে মনে রাখা সহজ সে ধরনের টপিকগুলোই বেশি পড়তাম। মুখস্থ অংশে আমার দূর্বলতা ছিল। তাই সেটা নিয়ে খুব বেশি সময় নষ্ট করিনি। 

পরীক্ষার হলে সময় ব্যবস্থাপনা ও প্রশ্ন বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আপনার কৌশল কী ছিল?
ঢাবি পরীক্ষার ক্ষেত্রে আমার বহুনির্বাচনি অংশ খুব বেশি ভালো হয়নি। মোটামুটি পাশ মার্ক নিশ্চিত করে আমি দ্রুত খাতা জমা দিয়ে রিটেন অংশ ভালো মতো লিখেছিলাম। চবির পরীক্ষাগুলোর ক্ষেত্রে প্রথম মোটামুটি নিশ্চিতগুলো শুরুতে দাগিয়ে ফেলি। এরপর ভেবে চিন্তে ৫০/৫০ নিশ্চিতগুলো দাগাই। কোনো প্রশ্ন নিয়ে খুব বেশি সময় নষ্ট করতাম না। পরীক্ষার শেষের সময়ের জন্য রেখে দিতাম। আর খুব আশাবাদী থাকতাম। প্রশ্নপত্র পেয়ে প্যানিক করতাম না। আল্লাহর উপর ভরসা রেখে ধীরে সুস্থে ঠান্ডা মাথায় দাগাতাম। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। 

প্রস্তুতির সময় কখনো হতাশা বা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল? হলে কীভাবে নিজেকে সামলে নিয়েছেন?
এক্ষেত্রে আমি ভাগ্যে বিশ্বাসী। আমি মনে করতাম না, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আমার প্রতিভা আর কোথাও বিকশিত হবার সুযোগ নেই। এ ধরনের চিন্তাহীনতা আমাকে ভয় থেকে দূরে রাখতো। আমি স্বতস্ফুর্তভাবে পড়তে পারতাম। 

আপনার সাফল্যের পেছনে পরিবার, শিক্ষক বা বন্ধুদের ভূমিকা কতটা ছিল?
আমার পরিবারে আমার মায়ের ভূমিকা ছিল অনেক। মা সবসময় বলতো, চান্স না পেলে কিছুই হবে না। একটা অভিজ্ঞতা হলো। আম্মুর এই ধরনের কথায় আমার উপর এক্সপেকটেশনের কোনো বোঝা থাকতো না। পড়াশোনার জন্য সম্পূর্ণ সুস্থ পরিবেশ আম্মু আমাকে দিয়েছিলেন। আমি এখন যতটুকু, পুরোটাই আমার মায়ের অবদান। 

এই বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগকে পছন্দ করার বিশেষ কারণ কী?
চট্টগ্রামে আমার জন্ম। আমি আমার সারাজীবন চট্টগ্রামের বাইরে কাটালেও আমার বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই চট্টগ্রাম। তাছাড়া, সাহিত্য সবসময় আমার কম্ফোর্টের জায়গা। আমার মনে হতো আমি যেমন, আমি যা করতে ভালোবাসি তার সাথে সাহিত্য পুরোপুরি খাপ খায়। গতানুগতিক জীবন আমার ভালো লাগতো না। চট্টগ্রাম আর সাহিত্য এদিক থেকে ভালো কম্বিনেশন। আর ইংরেজি সাহিত্যই নেওয়া বিশেষ করে কারণ ইংরেজি ছোটবেলা থেকেই আমার strength এর জায়গা ছিল। আমার মনে হতো, আমি ভালো করতে পারব এই বিভাগে।

পরীক্ষার হলে কোন কৌশল অবলম্বন করে পরীক্ষা দিয়েছেন?
প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে খুব বেশি প্যানিক করতাম না। ভেবে চিন্তে মনোযোগ দিয়ে দাগাতাম। সময় নিয়ে সচেতন থাকতাম। 

যারা আগামী বছর ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে, তাদের প্রস্তুতি নিয়ে আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ কী?
ভর্তি পরীক্ষা জীবনের অন্য সব পরীক্ষার মতোই একটি স্বাভাবিক পরীক্ষা। সফলতা ব্যর্থতা কোনোটাই জীবনের চূড়ান্ত মোটিভ নির্ধারণ করে না। তাই, যথাসম্ভব নিজের শরীর স্বাস্থ্যের খেয়াল রেখে নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করা উচিত। গুছিয়ে টেকনিক অবলম্বন করে পড়া উচিত। সর্বোপরি, খুব বেশি ভয় পাওয়া উচিত না। 

একজন ভর্তি পরীক্ষার্থীকে আপনি যদি মাত্র তিনটি বিষয় মেনে চলার পরামর্শ দেন, সেগুলো কী হবে? 
প্রথমত মনোযোগ নষ্ট করে এমন জিনিস এড়িয়ে চলা। নিজের স্বাস্থ্য এবং মনের যত্ন নেওয়া। দ্বিতীয়ত স্ট্যাটেজি ফলো করে পড়া। গতানুগতিক একচেটিয়া মুখস্থ না করা। তৃতীয়ত বিশ্বাসী হলে সৃষ্টিকর্তার উপর ভরসা রেখে প্রতিটি ধাপ সহজভাবে গ্রহণ করা।