ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি: লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার কৌশল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের বি ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাক্রমে ৪১তম স্থান অর্জন করেন মুহাম্মদ হাবিব আহমদ। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি, ইংরেজি ও বাংলায় ভালো নম্বর পাওয়ার কৌশল এবং ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের করণীয় নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। এ সময় তিনি নিয়মিত অনুশীলন, পাঠ্যবইয়ের প্রতি গুরুত্ব, শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করা, বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ, মডেল টেস্ট দেওয়া এবং সময় ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন।
ঢাবির লিখিত পরীক্ষার (রিটেন) প্রস্তুতি কীভাবে নিতে হবে? ইংরেজি ও বাংলায় ভালো নম্বর পাওয়ার কার্যকর উপায়গুলো কী কী?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার অন্যতম শর্ত লিখিত অংশে ভালো করা। লিখিত অংশ ভালো করার জন্য ইংরেজি ও বাংলা দুই বিষয়েই আলাদাভাবে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রতিটি বিষয়ের প্রশ্নের ধরন, উত্তর লেখার পদ্ধতি এবং প্রস্তুতির কৌশল আলাদা। আমার অভিজ্ঞতা থেকে জুনিয়রদের জন্য কয়েকটি পরামর্শ দিতে চাই।
প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিগত পাঁচ থেকে ছয় বছরের প্রশ্নের ধরন ও প্যাটার্ন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা। একসঙ্গে সব বিষয় সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়ার পরিবর্তে বিগত বছরের প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করে কোন কোন বিষয় বারবার এসেছে, সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে এবং প্রস্তুতি আরও পরিকল্পিতভাবে নেওয়া সম্ভব হবে।
ইংরেজির ক্ষেত্রে প্যারাগ্রাফ লেখা ও বাক্য গঠনের মতো বিষয়গুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত, কারণ এসব বিষয় প্রায়ই প্রশ্নে আসে। অন্যদিকে, বাংলার ক্ষেত্রে উদ্দীপক, সারমর্ম ও সারাংশের মতো বিষয়গুলো বিগত বছরের প্রশ্নে বারবার দেখা যায়। তাই এসব বিষয়ে নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে। তবে শুধু বারবার আসা বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর না করে প্রশ্নের ধরন বুঝে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও প্রস্তুতির আওতায় রাখতে হবে। এভাবে বিগত বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে প্রস্তুতি নিলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে সব বিষয়ে একসঙ্গে সময় ব্যয় না করে তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে বেশি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।
ইংরেজির ক্ষেত্রে প্রস্তুতি
ইংরেজি রিটেনে ভালো করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিদিন লেখার অভ্যাস গড়ে তোলা। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় প্রতিদিন অন্তত এক থেকে দুই পৃষ্ঠা ইংরেজিতে লেখার চেষ্টা করতে হবে। সেটা প্যারাগ্রাফ হতে পারে, কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যা হতে পারে কিংবা অন্য কোনো লিখিত অনুশীলন হতে পারে। নিয়মিত লেখার মাধ্যমে ইংরেজিতে বাক্য গঠন, শব্দের ব্যবহার এবং নিজের বক্তব্য সুন্দরভাবে উপস্থাপনের দক্ষতা বাড়বে।
পাশাপাশি ভোকাবুলারি বা শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, পরীক্ষায় যে বিষয়েই প্যারাগ্রাফ আসুক না কেন, সে বিষয়ে লেখার জন্য পর্যাপ্ত শব্দভান্ডার থাকা প্রয়োজন। প্রতিদিন নতুন শব্দ শেখার পাশাপাশি সেগুলোর অর্থ, ব্যবহার ও প্রয়োগ সম্পর্কে ধারণা নিতে হবে। শুধু শব্দের অর্থ মুখস্থ না করে সেগুলো দিয়ে বাক্য তৈরির অনুশীলন করলে লেখার সময় শব্দগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করা সহজ হবে।
ইংরেজি প্যারাগ্রাফ ও বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে পাঠ্যবইয়ের (Textbook) অনুশীলনগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে প্যারাগ্রাফ লেখার যেসব অনুশীলন দেওয়া থাকে, সেগুলো ভালোভাবে পড়তে হবে। বিশেষ করে সিলেবাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো আগে থেকেই প্রস্তুত করে রাখা উচিত। পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত বই এবং কোচিং সেন্টারের শিটগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। সেখানে দেওয়া প্যারাগ্রাফ, ব্যাখ্যা ও অন্যান্য প্রশ্নের উত্তরগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়তে হবে। তারপর নিজের মতো করে উত্তর লিখতে হবে এবং পরবর্তীতে ভুলগুলো চিহ্নিত করে সংশোধন করতে হবে।
যেকোনো বিষয় শুধু উত্তর মুখস্থ করলেই হবে না; কীভাবে একটি প্যারাগ্রাফের শুরু করতে হয়, কীভাবে মূল বক্তব্যগুলো ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করতে হয় এবং কীভাবে উপসংহার লিখতে হয়, সেগুলো বুঝতে হবে। বিশেষ করে প্যারাগ্রাফ লেখার শুরুর এবং শেষের সেন্টেন্স স্ট্রাকচার অত্যন্ত স্ট্যান্ডার্ড হওয়া জরুরি। অন্যের লেখা থেকে উত্তর উপস্থাপনের কৌশল আয়ত্ত করে নিজের ভাষায় লেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এতে পরীক্ষায় পরিচিত বিষয়ের পাশাপাশি নতুন কোনো বিষয় এলেও নিজের মতো করে উত্তর লেখা সম্ভব হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিয়মিত মডেল টেস্ট দেওয়া। কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়ে থাকলে সেখানকার পরীক্ষাগুলো গুরুত্বসহকারে দিতে হবে। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর কোথায় ভুল হচ্ছে, কোন ধরনের প্রশ্নে নম্বর কমছে এবং লেখার মধ্যে কী কী দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এরপর সেই দুর্বলতাগুলো দূর করার জন্য অনুশীলন করতে হবে।
সবশেষে ইংরেজির ক্ষেত্রে সময় ব্যবস্থাপনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অনেকেই ভালো উত্তর লিখতে পারলেও নির্ধারিত সময়ে লেখা শেষ করতে পারে না। তাই বাসায় অনুশীলনের সময়ও ঘড়ি ধরে লিখতে হবে। এতে দ্রুত লেখার অভ্যাস তৈরি হবে এবং পরীক্ষার হলে সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার প্রস্তুতি থাকবে।
বাংলার ক্ষেত্রে প্রস্তুতি
বাংলা লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রথমেই পাঠ্যবই ভালোভাবে পড়তে হবে। গদ্য ও পদ্যের মূল বক্তব্য, লেখকের উদ্দেশ্য, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যগুলো বুঝে পড়া জরুরি। শুধু গদ্য-পদ্য পড়ে গেলেই হবে না; সেখান থেকে কী ধরনের প্রশ্ন আসতে পারে এবং সেগুলোর উত্তর কীভাবে সাজিয়ে লিখতে হয়, সে সম্পর্কেও ধারণা রাখতে হবে। এ ছাড়া গদ্য ও পদ্যের গুরুত্বপূর্ণ লাইনের বিশ্লেষণ পড়তে হবে। অনেক সময় গদ্য-পদ্যের গুরুত্বপূর্ণ লাইনের সারমর্ম লিখতে বলা হয়। এ ক্ষেত্রে বাংলা শব্দগুলোর শাব্দিক অর্থ এবং কোন শব্দ কোন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলো জানতে হবে।
বাংলা লিখিত অংশে ভালো করার জন্য বই থেকে প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং নিয়মিত লিখে অনুশীলন করা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় অপ্রাসঙ্গিক কথা না লিখে প্রশ্নের মূল বক্তব্যের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। উত্তর যেন সুসংগঠিত হয় এবং বক্তব্যগুলো ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপিত হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পাঠ্যবইয়ের আলোচ্য বিষয়গুলো ভালোভাবে বুঝতে পারলে প্রশ্নের উত্তর নিজের ভাষায় লেখা সহজ হবে।
বাংলা ব্যাকরণের ক্ষেত্রেও নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে। বিশেষ করে বাগধারা, বাক্য সংশোধন এবং সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য ব্যাকরণিক বিষয় বারবার চর্চা করতে হবে। এসব বিষয়ে শুধু নিয়ম পড়ে রাখলে হবে না; বিভিন্ন উদাহরণ ও প্রশ্ন সমাধানের মাধ্যমে সেগুলো আয়ত্ত করতে হবে। যে বিষয়গুলোতে বারবার ভুল হচ্ছে, সেগুলো আলাদা করে চিহ্নিত করে পুনরায় অনুশীলন করতে হবে।
এ ছাড়া বাংলা লিখিত পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত বই, অনুশীলনী এবং কোচিং সেন্টারের শিটগুলো অনুসরণ করা যেতে পারে। সেখানকার প্রশ্ন ও নমুনা উত্তরগুলো পড়লে প্রশ্নের ধরন এবং উত্তর লেখার কৌশল সম্পর্কে ভালো ধারণা তৈরি হবে। তবে নমুনা উত্তর হুবহু মুখস্থ করার পরিবর্তে বিষয়টি বুঝে নিজের ভাষায় লেখার অভ্যাস করতে হবে। এতে প্রশ্নের উপস্থাপনায় পরিবর্তন এলেও উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হবে না।
বাংলার ক্ষেত্রে নিয়মিত পরীক্ষা দেওয়াও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মডেল টেস্ট দেওয়ার পর কোন প্রশ্নে ভুল হয়েছে, কোথায় উত্তর অসম্পূর্ণ রয়েছে এবং কোন কারণে নম্বর কমেছে, সেগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাকরণে একই ধরনের ভুল বারবার হলে সেই নিয়মগুলো আবার পড়তে হবে এবং নতুন প্রশ্নের মাধ্যমে অনুশীলন করতে হবে।
এখানেও সময় ব্যবস্থাপনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কোনো একটি প্রশ্নের পেছনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করলে অন্য প্রশ্নের উত্তর অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। তাই প্রশ্নের নম্বর ও উত্তর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে সময় ভাগ করে নেওয়া উচিত।
ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের জন্য আমার পরামর্শ
আমি মূলত নিয়মিত অনুশীলন, পাঠ্যবই ভালোভাবে পড়া, ভোকাবুলারি সমৃদ্ধ করা এবং মডেল টেস্ট দেওয়ার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছি। এর বাইরে খুব বেশি বিশেষ কোনো কৌশল অনুসরণ করিনি; এমনকি আমার নিজের প্রস্তুতিও খুব বেশি গোছানো ছিল না। তবে আমার মনে হয়, লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো নিজের দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করা এবং সেগুলো দূর করার চেষ্টা করা।
জুনিয়রদের বলব, ইংরেজি ও বাংলা কোনো বিষয়কেই অবহেলা করা যাবে না। প্রতিদিন অল্প হলেও লিখিত অনুশীলন করতে হবে। নিয়মিত পরীক্ষা দিতে হবে এবং পরীক্ষার ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিতে হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উত্তর লেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারণ, শুধু বিষয় জানা যথেষ্ট নয়; পরীক্ষার খাতায় সেই জ্ঞান সঠিকভাবে ও সময়মতো উপস্থাপন করতে পারাও গুরুত্বপূর্ণ।
আমার মতে, ধারাবাহিক অনুশীলন, নিজের ভুল সংশোধন এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে পারলে লিখিত পরীক্ষায় ভালো করার ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে থাকা সম্ভব।