এইচএসসিতে প্রথমবার ফেল করেও ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় শীর্ষ ৫০-এ পথিক
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মেধাবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন পথিক হাসান প্রান্ত। নিজ এলাকায় ছিলেন অন্যতম সেরা শিক্ষার্থী। এসএসসিতেও পেয়েছিলেন জিপিএ-৫। তবে উচ্চমাধ্যমিকে এসে ছন্দপতন ঘটে তার। ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে অকৃতকার্য হন তিনি। একসময় যাকে ঘিরে পরিবার ও স্বজনদের অনেক প্রত্যাশা ছিল, সেই পথিককেই শুনতে হয় আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনদের নানা কটাক্ষ। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ভেঙে না পড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
পরিবারের পাশাপাশি স্ত্রীও তাকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগান। নিয়মিত পড়াশোনা, ধারাবাহিক পরীক্ষা দেওয়া এবং নিজের দুর্বলতা খুঁজে বের করে তা কাটিয়ে ওঠার কৌশলে শেষ পর্যন্ত সফল হন পথিক। দ্বিতীয়বার এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটে (বি ইউনিট) মেধাতালিকায় ৪৭তম স্থান অর্জন করেন তিনি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে থাকছেন পথিক।
পথিক হাসান প্রান্তের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে। তিনি গফরগাঁও রাজেন্দ্র কিশোর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে ভর্তি হন গফরগাঁও সরকারি কলেজে। তবে উচ্চমাধ্যমিকে এসে পড়াশোনায় নিজের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি তিনি। ২০২৪ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানে অকৃতকার্য হন। পরে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ-৪.৬৭ অর্জন করেন।
এই ফলাফল তার জীবনের অন্যতম বড় ধাক্কা হলেও পরিবারের সমর্থন তাকে মানসিকভাবে শক্ত রেখেছিল। পথিক জানান, এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে নিজের পড়াশোনায় অমনোযোগিতাই প্রধান কারণ ছিল। দীর্ঘ দেড় বছর পড়াশোনায় যথাযথ মনোযোগ না দেওয়ার ফলেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে একসময় এলাকার মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত থাকায় বিষয়টি তার জন্য বিব্রতকর ছিল।
পথিক বলেন, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় ভালো ছিলাম। নিজের এলাকায় ভালো শিক্ষার্থী হিসেবেই পরিচিতি ছিল। সেখান থেকে এইচএসসিতে অকৃতকার্য হওয়াটা আমার জন্য অবশ্যই খারাপ লাগার বিষয় ছিল। তবে এ কারণে খুব বেশি ভেঙে পড়িনি। কারণ, পরিবারের পক্ষ থেকে অনেক বেশি সমর্থন পেয়েছি। আব্বু-আম্মু সব সময় পাশে ছিলেন। তবে আত্মীয়স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী এমনকি বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকেও নানা ধরনের চাপ অনুভব করতাম। অনেকে সরাসরি কিছু না বললেও তাদের আচরণে মনে হতো, আমাকে নিয়ে তারা উপহাস করছেন কিংবা আমাকে আর আগের মতো প্রত্যাশিত মনে করছেন না। বিষয়গুলো খারাপ লাগলেও তখন কিছু বলার সুযোগ ছিল না।
প্রতিকূল সেই সময়ে পরিবারের পাশাপাশি স্ত্রীও তাকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা দেন। পথিকের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমবার অকৃতকার্য হওয়ার পর তাঁর মা চাচ্ছিলেন না যে তিনি আবার এইচএসসি পরীক্ষা দিন। তবে স্ত্রী তাঁকে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন এবং মানসিকভাবে পাশে থাকেন। তার অনুপ্রেরণাতেই নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন পথিক।
তিনি বলেন, আমার পরিবার আমাকে অনেক বেশি সমর্থন করেছে। বিশেষ করে আব্বু-আম্মুর পাশাপাশি আমার স্ত্রীও আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। প্রথমবার অকৃতকার্য হওয়ার পর মা চাচ্ছিলেন না যে আমি আবার পরীক্ষা দিই। কিন্তু আমার স্ত্রী আমাকে বারবার উৎসাহ দিয়েছেন, পরীক্ষা দিতেই হবে বলে অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় শেষ পর্যন্ত আবার পরীক্ষা দিই এবং আলহামদুলিল্লাহ, উত্তীর্ণ হই।
নিয়মিত পড়াশোনাই ছিল প্রস্তুতির মূলমন্ত্র
এইচএসসিতে দ্বিতীয়বার উত্তীর্ণ হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে(ঢাবি) ভর্তির প্রস্তুতি শুরু করেন পথিক। তাঁর মতে, ভর্তি প্রস্তুতিতে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল ছিল ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং প্রতিদিনের নির্ধারিত পড়া শেষ করা। কত ঘণ্টা পড়ছেন, সেটিকে গুরুত্ব না দিয়ে প্রতিদিনের লক্ষ্য পূরণ করাকেই বেশি প্রাধান্য দিতেন তিনি।
নিজের প্রস্তুতির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে পথিক বলেন, আমার কাছে প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল নিয়মিত পড়াশোনা। আমি প্রতিদিনের জন্য আলাদা লক্ষ্য নির্ধারণ করতাম। যেমন, যেদিনের ক্লাসের পড়া সেদিনেই শেষ করব, পাশাপাশি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভোকাবুলারি ও মেমোরাইজিং পার্টের অন্য অংশগুলো পড়ব। নিজের মতো করে রুটিন সাজিয়ে নিতাম। আমার কাছে তিন ঘণ্টা বা দশ ঘণ্টা পড়ার হিসাব গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বরং যে কাজটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি, সেটি শেষ করাই ছিল মূল বিষয়। তিন ঘণ্টায় শেষ হলে তিন ঘণ্টা, আর দশ ঘণ্টা লাগলে দশ ঘণ্টা পড়তাম।
পড়াশোনায় ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে ব্যক্তিগত ব্যস্ততাকেও কখনো প্রস্তুতির পথে বাধা হতে দেননি তিনি। নিজের কাজিনের বিয়ের অনুষ্ঠানের ব্যস্ততার মধ্যেও পড়াশোনা ও পরীক্ষার রুটিন বজায় রাখার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। পথিক জানান, কাজিনের বিয়ের দিন গায়েহলুদের অনুষ্ঠান ও পারিবারিক নানা দায়িত্ব থাকলেও সকালে নিজের পড়া শেষ করে কোচিংয়ের পরীক্ষা দিয়ে এরপর অনুষ্ঠানের কাজে যুক্ত হয়েছিলেন। প্রতিদিনের নির্ধারিত পড়া ও পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দিতে চাননি তিনি।
নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে দিয়েছেন অসংখ্য পরীক্ষা
ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি পরীক্ষাভিত্তিক প্রস্তুতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন পথিক। বিভিন্ন কোচিংয়ের নিয়মিত পরীক্ষা, টপিকভিত্তিক পরীক্ষা, মডেল টেস্ট এবং পূর্ণাঙ্গ ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন তিনি। এমনকি একাধিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে নিয়মিত পরীক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে নিজের প্রস্তুতির অবস্থান যাচাই করতেন।
পথিক বলেন, আমি প্রচুর পরীক্ষা দিয়েছি। কোচিংয়ের নিয়মিত পরীক্ষার পাশাপাশি চর্চা ও প্রিমিয়ামেও ভর্তি হয়েছিলাম। সেখানে টপিক ভিত্তিক পরীক্ষা এবং মডেল টেস্ট দিতাম। আরও দুই-তিনটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়ে নিয়মিত পরীক্ষা দিয়েছি। এর ফলে কোন বিষয়ে বা কোন টপিকে আমার দুর্বলতা রয়েছে, সেটি সহজেই বুঝতে পারতাম। এরপর সেই জায়গাগুলো খুঁজে বের করে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করতাম। আমার কাছে এটি প্রস্তুতির অন্যতম কার্যকর কৌশল। প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই নিয়মিত পরীক্ষা দিয়ে নিজের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা উচিত।
এইচএসসিতে খারাপ ফল করা শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ
এইচএসসি পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া কিংবা জিপিএ-৫ অর্জন করতে না পারা শিক্ষার্থীদের হতাশ না হয়ে ভর্তি প্রস্তুতিতে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন পথিক। তার ভাষায়, ভর্তি পরীক্ষার আগে পাওয়া অল্প সময়টুকুও যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে ভালো ফল করা সম্ভব। এই সময়ে আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিতজনদের নেতিবাচক মন্তব্যে মনোযোগ না দিয়ে নিজের লক্ষ্য অর্জনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে।
তিনি বলেন, যারা এবার এইচএসসিতে ভালো ফল করতে পারেনি, তাদের হাতে এখনো সময় আছে। হয়ত দেড় থেকে দুই মাস সময় পাবে। এই সময়টুকু কাজে লাগাতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভর্তি পরীক্ষায় কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো একটি অবস্থান অর্জন করতে পারলে এখন যারা উপহাস করছে, তারাই একসময় প্রশংসা করবে। তাই নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে চেষ্টা করতে হবে। গৎবাঁধা পড়াশোনা না করে কৌশলভিত্তিক প্রস্তুতি নিতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পড়াশোনা করে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে।
যারা দ্বিতীয়বার এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্যও রয়েছে তার পরামর্শ। পথিকের মতে, এইচএসসির অসমাপ্ত পড়াশোনা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রস্তুতি পাশাপাশি চালিয়ে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। একটি ব্যর্থতাকে জীবনের শেষ হিসেবে না দেখে নতুনভাবে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রথমবারই সবাই ভর্তি পরীক্ষায় সফল হবে, এমন কোনো কথা নেই। অনেক শিক্ষার্থীকে দ্বিতীয়বার চেষ্টা করতে হয়। তাই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নিতে হবে। এইচএসসিতে যেসব বিষয়ে দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলোর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিতে হবে। দুটি বিষয় একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এই সময়টায় আশপাশের মানুষকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কঠিন সময় মানুষকে অনেক কিছু শেখায়। কে প্রকৃত অর্থে পাশে থাকে, কে ভালো চায়, সেটিও বোঝা যায়। তবে এসব নিয়ে বেশি চিন্তা না করে নিজের কাজ করে যেতে হবে।
সবশেষে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে পথিক বলেন, নিজের সঙ্গে অন্য কারও তুলনা করা যাবে না। প্রতিটি মানুষের জীবনের পথ আলাদা। কখনো কখনো জীবনে এমন কিছু প্রতিকূল সময় আসে, যা পরবর্তী ভালো সময়ের জন্য মানুষকে প্রস্তুত করে। তাই কোনো অবস্থাতেই হাল ছাড়া যাবে না। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তিনি সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী। হজরত ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের উদাহরণ টেনে পথিক বলেন, দীর্ঘ প্রতিকূলতা পেরিয়ে একসময় তিনি মিসরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন। মানুষের জীবনেও এমন পরিবর্তনের সময় আসে। তাই সাময়িক ব্যর্থতাকে শেষ মনে না করে ধৈর্য ধরে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।