১০ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:১১

বাবাকে না জানিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি প্রস্তুতি, বাজিমাত মৈত্রীর

মায়িশা যারিন মৈত্রী  © টিডিসি সম্পাদিত

প্রথমবার ব্যর্থতার পর বাবাকে না জানিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লড়াইয়ে নেমেছিলেন মায়িশা যারিন মৈত্রী। নিজের ওপরও পুরোপুরি ভরসা ছিল না, কোথাও সুযোগ পাবেন কি না, তা নিয়েও ছিল সংশয়। সেই অনিশ্চয়তার মধ্যেই তিন মাসের প্রস্তুতি নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভর্তি পরীক্ষায় চমক দেখিয়েছেন তিনি। বিজ্ঞান শাখা থেকে সি ইউনিটের প্রথম শিফটে মেধাক্রমে ১৪তম এবং সম্মিলিত মেধাক্রমে ৩৩তম হয়েছেন মৈত্রী। বি ইউনিটেও তার মেধাক্রম ছিল ৫৮।

দুই ইউনিটে চান্স পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে মৈত্রী বলেন, ফল প্রকাশের পর দুই ইউনিটেই নিজের রোল নম্বর দেখতে পেয়ে বিভ্রান্ত হয়ে যাই। মোবাইলের স্ক্রিনে বারবার নিজের রোল নম্বরটি দেখছিলাম। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল, হাত কাঁপছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, হয়তো রোল নম্বরটাই ভুল টাইপ করেছি। আমার অবস্থা দেখে আমার মায়ের চোখেও পানি চলে আসে। শেষ পর্যন্ত নিজে নিশ্চিত হতে না পেরে বড় ভাই মাথিনকে ফলাফলের পিডিএফ পাঠাই। ভাইয়া বলার পর নিশ্চিত হই। 

‎ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘প্রপার প্রিপারেশন’ ছিল তিন মাসের। প্রথম দুই মাসের মধ্যেই পুরো সিলেবাস শেষ করে বারবার রিভিশন দেওয়ার চেষ্টা করেছন। তার কাছে একবার ভালোভাবে পড়ার চেয়ে বারবার পড়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাশাপাশি নিয়মিত ওএমআর শিটে পরীক্ষা দেওয়ার অভ্যাসও গড়ে তুলেছিলেন।

প্রস্তুতির শুরুতে ঘণ্টা ধরে পড়ার চেষ্টা করলেও পরে সেই পদ্ধতি বাদ দেন মৈত্রী। তার বদলে প্রতিদিনের জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে তা শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন। কোনো দিন নির্ধারিত কাজ শেষ করতে না পারলে পরের দিনগুলোতে তা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতেন।

নিজেকে একজন ‘স্লো রিডার’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পড়া শেষ করতে তার তুলনামূলক বেশি সময় লাগত। তাই খাওয়া, নামাজ, ঘুম ও জরুরি কাজ বাদ দিয়ে প্রায় পুরো সময়ই পড়াশোনায় দেওয়ার চেষ্টা করেছি। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় নতুন করে বুঝেছি—‘হাল ধরে রাখা’ কতটা কঠিন।

এই কঠিন সময়ে তার সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস। নিয়মিত মোনাজাতে তিনি শক্তি ও লেগে থাকার তৌফিক চেয়েছেন। তবে শুধু আত্মবিশ্বাস নয়, নিজের ভেতরের এক ধরনের জেদও তাকে এগিয়ে নিয়েছে। কখনো মনে হতো, ভর্তি পরীক্ষায় ভালো করবেন, আবার কখনো মনে হতো, যেকোনো একটি সিট পেলেই চলবে। 

মৈত্রী বলেন, এক বেলার মোনাজাতে আল্লাহর কাছে ভর্তি পরীক্ষায় ‘টপ’ করার তৌফিক চেয়েছি। আবার পরের বেলাতেই শুধু একটি সিট পাওয়ার জন্য দোয়া করেছি। হতাশা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি প্রায় প্রতিদিনই ছিল। তবে মোটিভেশনের চেয়ে নিজের ভেতরের জেদই তাকে বেশি লড়াই করতে সাহায্য করেছে।

ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোনো কোচিং করেননি তিনি। বাসায় নিজের মতো করেই প্রস্তুতি নিয়েছেন। তার একমাত্র মেন্টর ও গাইড ছিলেন ভাই। তবে নিয়মিত পরীক্ষা দেওয়ার জন্য একজন সিনিয়র ভাইয়ের এক্সাম ব্যাচে যুক্ত ছিলেন। তার মতে, নিয়মিত পরীক্ষা দেওয়ার অভ্যাস প্রস্তুতিতে বেশ কাজে দিয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় আসনসংখ্যা কম হওয়ায় সামান্য নম্বরের পার্থক্যও যে গুরুত্বপূর্ণ, সেটি মাথায় রেখেছিলেন মৈত্রী। তাই প্রশ্নের ধরন অনিশ্চিত হলেও কোনো বিষয় বাদ দেননি। আগের বছরের প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে যেসব টপিক থেকে নিয়মিত প্রশ্ন আসে, সেগুলোতে বাড়তি গুরুত্ব দিয়েছেন। একই সঙ্গে অন্য টপিকগুলোও পড়ার চেষ্টা করেছেন।

পরীক্ষার হলের জন্যও আগে থেকেই নিজের কৌশল ঠিক করে রেখেছিলেন তিনি। মানসিকভাবে বিষয়ভিত্তিক সময় ভাগ করে নিয়েছিলেন। সহজ প্রশ্নগুলো আগে সমাধান করতেন, যাতে কোনো প্রশ্নে আটকে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট না হয়। যেসব প্রশ্নের উত্তর একনজরেই দেওয়া সম্ভব, সেগুলো ফেলে রাখতেন না। কোনো প্রশ্নের উত্তর প্রথমবার মনে না এলে সেটিতে আটকে না থেকে পরে আবার ফিরে আসতেন।

তার মতে, পরীক্ষার হলে নার্ভাসনেসের কারণে কোনো প্রশ্নের উত্তর প্রথমবার মনে না এলেও কিছুক্ষণ পর আবার দেখলে সেটি মনে পড়ে যেতে পারে। তাই পুরো প্রশ্নপত্রে একাধিকবার চোখ বোলানোর চেষ্টা করেছেন। আইকিউ অংশের প্রস্তুতিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। কারণ এ অংশ থেকে তুলনামূলকভাবে ভালো নম্বর তোলার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

মৈত্রীর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি টানও ছিল দীর্ঘদিনের। ঢাকার কাছাকাছি হওয়া যেমন একটি কারণ, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতকালীন সৌন্দর্যের প্রতিও তার আলাদা আকর্ষণ রয়েছে। দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সময় বড় ভাই অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম তোলার পরামর্শ দিলেও জাবি ছাড়া অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম না তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

ইংরেজি বিষয়ের প্রতিও আগে থেকেই আগ্রহ ছিল মৈত্রীর। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে একাধিকবার ইংরেজি বিষয় পছন্দ দিয়েও বিষয়টি না পাওয়ায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগকে লক্ষ্য করেই ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। এবার তার সেই স্বপ্ন পূরণের পথে বড় একটি ধাপ এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে।

নিজের এই সাফল্যের পেছনে মা ও বড় ভাইয়ের অবদানকে বিশেষভাবে স্মরণ করেন মৈত্রী। তার ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময়সূচি আর মায়ের দৈনন্দিন কাজের সময়সূচি প্রায় একই ছিল। মেয়ের প্রস্তুতির জন্য তার চেয়েও বেশি কষ্ট করেছেন মা। অন্যদিকে, শত ব্যস্ততার মধ্যেও বড় ভাই তার পড়াশোনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কোনো সমস্যায় পড়লে দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করেছেন। মৈত্রী মনে করেন, পরিবারের এই সহযোগিতা তার জন্য অনেক বড় শক্তি ছিল। একই সঙ্গে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাকেও নিজের সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখেন তিনি।

ভর্তি পরীক্ষায় যারা সামনে অংশ নেবেন, তাদের জন্য মৈত্রীর পরামর্শ, শুরুতেই ঠিক করতে হবে কোন বিষয়ে পড়ার আগ্রহ রয়েছে এবং সেই অনুযায়ী কোন ইউনিটের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত। নিজের প্রথমবারের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছেন, শুধু গতানুগতিকভাবে প্রস্তুতি নিলেই হয় না; নিজের লক্ষ্য সম্পর্কেও পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।

প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষার সময় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে গতানুগতিকভাবে বিজ্ঞান ইউনিটের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন মৈত্রী। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেননি, আসলে কোন বিষয়ে পড়তে চান। ফলে প্রত্যাশিত ফল পাননি। তবে প্রথমবার বি ও সি ইউনিটে ব্যাকআপ হিসেবে পরীক্ষা দেওয়ার অভিজ্ঞতা দ্বিতীয়বারের প্রস্তুতিতে নিজের লক্ষ্য নির্ধারণে তাকে সাহায্য করে।

নিজের সাফল্যের সূত্র হিসেবে মৈত্রী সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা, নিজের ওপর বিশ্বাস এবং কঠোর পরিশ্রমকে। নিজেকে কখনোই অ্যাকাডেমিক জীবনের ‘মেধাবী শিক্ষার্থী’ হিসেবে দেখেননি তিনি। তাই মেধার জোরে নয়, পরিশ্রমের জোরে ভালো ফল করার জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করতেন।

তার বিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম অনেক সময় মেধাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কেউ পাশে থাকুক বা না থাকুক, শেষ পর্যন্ত লেগে থাকতে হবে।

মৈত্রীর ভাষায়, ‘হাল ধরে রাখলে কোনো না কোনো দিকে নিয়ে যাবেই।’ মাঝপথে হাল ছেড়ে দিলে কখনোই জানা হবে না, আরও কতদূর যাওয়া সম্ভব ছিল।