১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৪

ভর্তি পরীক্ষায় সফলতার প্রথম শর্ত—লাইফস্টাইল পরিবর্তন করা

মুহম্মদ সজীব প্রধান  © টিডিসি সম্পাদিত

ভর্তি পরীক্ষার মৌসুমে বাংলাদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী একই স্বপ্ন নিয়ে ছুটে চলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেল, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, গুচ্ছ, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দিকে। সবার হাতে প্রায় একই বই, একই সিলেবাস, একই প্রশ্নব্যাংক। 

অথচ ফলাফল হয় ভিন্ন। কেন? কারণ সাফল্য শুধু তুমি কী পড়ছ তার ওপর নির্ভর করে না। তোমার দৈনন্দিন জীবন কীভাবে কাটে সেটার ওপরও নির্ভর করে। একজন শিক্ষার্থী দিনে ১৫ ঘণ্টা বই খুলে রেখেও পিছিয়ে থাকতে পারে। অন্যদিকে আরেকজন ৮ ঘণ্টা পড়াশোনা করে তাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। পার্থক্যটা অনেক সময় মেধায় নয় লাইফস্টাইলে।

তোমার আলোকিত ভবিষ্যৎ কোনো একদিন হঠাৎ এসে দরজায় কড়া নাড়বে না। প্রতিদিনের ঘুম, জাগরণ, মোবাইল ব্যবহার, খাবার, পড়ার পরিবেশ, বন্ধু নির্বাচন, চিন্তার ধরন, সময় ব্যবস্থাপনা এসবের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সিদ্ধান্ত একদিন মিলে তোমার ভবিষ্যৎ তৈরি করবে। James Clear-এর ভাষায়, ‘Success is the product of daily habits not once-in-a-lifetime transformations’ অর্থাৎ সাফল্য কোনো এককালীন নাটকীয় পরিবর্তনের ফল নয়, বরং প্রতিদিনের অভ্যাসের ফল। তাই সফল হতে চাইলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত— ‘আমার লাইফস্টাইল কেমন হওয়া উচিৎ?’ আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করো, সফলতার জন্য শুধু একটি ফর্মুলা বলুন। তাহলে আমি বলবো তোমার লাইফস্টাইল সফলতার উপযোগী করে রিসেটাপ করো।

আরও পড়ুন: প্রস্তুতি শুরুর আগে সবারই অন্তত একটি মূল্যায়নমূলক পরীক্ষা দেওয়া উচিত

তোমরা নিশ্চই পালতোলা নৌকা দেখেছো। কী দারুণ তাইনা! মাঝি বাতাসের অনুকূলে পাল তোলে আরামসে হাল ধরে বসে থাকে আর নৌকা দ্রুত গতিতে গন্তব্যের দিকে ছুটতে থাকে। আমাদের জীবনেও আমরা চাইলেই অনুকূল বাতাসে পাল তুলে জীবনতরী স্বপ্নময় গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারি। জীবন তরীর সেই পাল হলো লাইফস্টাইল। তুমি শুধু লাইফস্টাইল এমনভাবে সেটাপ করো যেন সেটা তোমার সফলতার অনুকূলে হয়। তারপর ম্যাজিক দেখবে জীবনে! জীবন যেন একপাল তোলা নৌকা! এবার চলো, তোমাদের জন্য লাইফস্টাইল কেমন হওয়া উচিৎ সে বিষয়ে কয়েকটা বুলেট পয়েন্ট বলি। 

লাইফ চ্যাঞ্জিং পয়েন্ট ০১: বর্তমান পৃথিবীতে সফল হওয়া খুবই সহজ। এখানে বেশিরভাগ মানুষ Distracted তাই তুমি যদি শুধু Focus থাকতে পারো তাহলে তুমি শুরুতেই অন্তত ৯০% এগিয়ে গেলে। ফোকাস থাকার জন্য আমাদের লাইফস্টাইল থেকে স্মার্টফোনের অত্যধিক ব্যবহার কমানো প্রথম চ্যালেঞ্জ। আমি অনেক শিক্ষার্থীদের চিনি যারা বলে আমি মেডিকেলে পড়ব। কিন্তু রাত ৩টা পর্যন্ত Facebook, YouTube, TikTok বা Reels দেখে সকাল ১১টায় ঘুম থেকে উঠে। 

পড়ার টেবিলে বসে প্রতি পাঁচ মিনিট পরপর Messenger চেক করে। এখানে মূল সমস্যা স্বপ্নে নয়। সমস্যা হলো এই শ্রেণির শিক্ষার্থীদের লাইফ স্টাইল এদেরকে একটি গোলকধাঁধায় আটকে ফেলছে। তুমি যদি এই গোলকধাঁধা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারো তাহলে বিনা পরিশ্রমে স্বপ্ন পূরণের দৌঁড়ে তুমি অন্যদের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে গেলে। বুদ্ধিমানরা এটাই করে। সানজু'স দ্য আর্ট অব ওয়ার বইয়েও ঠিক এমনই একটা কনসেপ্ট আছে। তোমার প্রতিপক্ষ যেখানে ভুল করে তুমি সেখানে সঠিক থেকো তাহলে কম পরিশ্রমে তোমার জেতার চান্স বেড়ে যাবে। 

লাইফ চ্যাঞ্জিং পয়েন্ট ০২: তোমরা ছোটবেলায় আদর্শ লিপি বইয়ে পড়েছিলে—‘Early to bed and early to rise, makes a man healthy, wealthy, and wise’ ছোট্ট এই বাক্যটির ভেতরেই লুকিয়ে আছে জীবন বদলে দেওয়ার অসাধারণ শক্তি। জীবনে বড় কিছু অর্জন করতে চাইলে ঘুম ও জাগরণের সঠিক অভ্যাসের কোনো বিকল্প নেই। ভোরের কয়েক ঘণ্টা হতে পারে তোমার দিনের সবচেয়ে productive সময়। এই সময়টাকে তুমি কাজে লাগাতে পারলে কনফিডেন্স অ্যান্ড পারফরম্যান্স রেট দেখে তুমি নিজেই বিস্মিত হবে। হ্যাল এলরডের The Miracle Morning বইয়ের মূল দর্শনও সকালের এই শক্তিকে কাজে লাগানো। 

তার প্রস্তাবিত Miracle Morning রুটিনের মাধ্যমে ঘুম থেকে উঠে দিনের প্রথম সময়টুকু নিজের শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নতির জন্য ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। সফল মানুষরা দিনের ২৪ ঘণ্টা জয় করে না, তারা কেবল সকালটা জয় করে। আর যে সকাল জয় করতে পারে সারা দিন তার নিয়ন্ত্রণেই থাকে। অনেকেই মনে করে, ‘রাত জেগে যত বেশি পড়ব, তত বেশি এগিয়ে যাব।’

সবসময় তা নয়। ক্লান্ত মস্তিষ্ক দিয়ে ১২ ঘণ্টা বইয়ের সামনে বসে থাকা আর সতেজ মস্তিষ্ক দিয়ে ৭–৮ ঘণ্টা গভীরভাবে পড়া এক জিনিস নয়। তুমি যদি ঘুমকে কেটে পড়াশোনা বাড়াও, তাহলে মনে রেখো মোমবাতিকে বেশি সময় জ্বালাতে গিয়ে যদি তার আগুনটাই দুর্বল করে ফেলো, তাহলে আলো বাড়বে না। সফল মানুষ হওয়ার আগে তোমাকে সফল মানুষের মতো জীবনযাপন শুরু করতে হবে। তুমি রাত জেগে সময় নষ্ট করে দিন শেষে অসাধারণ ফলাফল আশা করতে পারো না। এটা প্রকৃতি বিরোধী। তাই চেষ্টা করবে রাতে দ্রুত ঘুমাতে এবং ভোরে ওঠতে। সবচেয়ে ভালো হয় ঘুম থেকে সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনার মাধ্যমে দিন শুরু করা। স্রষ্টার নিকট সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ ও সহযোগিতা প্রার্থনা সারাদিন মনের মধ্যে অন্যরকম প্রশান্তি সঞ্চার করবে।

লাইফ চ্যাঞ্জিং পয়েন্ট ০৩: ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে অনেক শিক্ষার্থী মনে করে বইয়ের সামনে যত বেশি সময়, সাফল্যের সম্ভাবনা তত বেশি। কিন্তু মস্তিষ্কও একটি জৈবিক অঙ্গ সেটা আমরা ভুলে যাই। দীর্ঘ সময় পড়ার জন্য প্রয়োজন সুস্থ শরীর, ভালো রক্তসঞ্চালন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক স্থিরতা। শরীরচর্চা শুধু শরীরকে ফিট রাখে না বরং এটি মস্তিষ্কের কার্যকারিতারও সহায়ক। নিয়মিত ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বাড়াতে, যা শেখা, স্মৃতি ও cognitive function-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে নিয়মিত হাঁটা, দৌড়, সাইক্লিং বা অন্য কোনো মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম শারীরিক ও মানসিক সতেজতা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। 

অন্যদিকে মেডিটেশন ব্রেন বুস্টার হিসেবে কাজ করে। এটা মস্তিষ্কের জিম। মেডিটেশন আমাদের মনোযোগকে নিয়ন্ত্রণ ও প্রশিক্ষণ করার একটি পদ্ধতি। Mindfulness-based practices নিয়ে গবেষণায় attention, stress regulation এবং emotional control-এর ওপর ইতিবাচক প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভর্তি পরীক্ষার মতো দীর্ঘ প্রস্তুতিতে যেখানে উদ্বেগ, পরীক্ষার চাপ ও মনোযোগ বিচ্ছিন্নতা বড় সমস্যা, সেখানে কয়েক মিনিটের mindfulness practice মনকে স্থির করে আবার পড়ায় ফিরতে সাহায্য করতে পারে। তাই স্ট্যান্ডার্ড লাইফস্টাইলের জন্য দৈনিক একটা নির্দিষ্ট সময়ে ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ এবং দিনে অন্তত দুই বার মেডিটেশন করার অভ্যাস করা ভালো। 

তোমার প্রতিদিনের এই অভ্যাস হয়ত তোমার বইয়ের পৃষ্ঠা বাড়াবে না, কিন্তু তুমি যে পৃষ্ঠাগুলো পড়ছ, সেগুলো আরও ভালোভাবে শেখার সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। এক্সারসাইজ ও মেডিটেশনের পাশাপাশি সুস্থতার জন্য পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ। অস্বাস্থ্যকর খাদ্য এড়িয়ে চলবে। ভর্তি পরীক্ষার এই জার্নিতে অসুস্থতা যেন তোমার গতিরোধ করতে না পারে সেক্ষেত্রে সচেতন থাকতে হবে।

লাইফ চ্যাঞ্জিং পয়েন্ট ০৪: ঘড়ির কাঁটা সবার জন্যই দিনে ৮৬,৪০০ বার টিকটিক করে ঘুরে, কিন্তু দিনশেষে সবার প্রাপ্তি কি সমান হয়? একজন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার্থীর সবচেয়ে দামি সম্পদ হলো সময়। ব্রায়ান ট্রেসি তার Time Management বইয়ে লিখেছেন, ‘Time management is life management’ অর্থাৎ, সময়কে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা মানেই নিজের জীবনকে সঠিক পথে পরিচালনা করা। 

জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, জীবদেহ ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কোষের সমন্বয়ে গঠিত; অন্যদিকে সময়ের দৃষ্টিতে আমাদের জীবন অসংখ্য সেকেন্ড ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্তের সমষ্টি। জীবনের বড় সাফল্য আসলে প্রতিটি ছোট মুহূর্তের সঠিক ব্যবহারের ফল। তাই জীবনে সফল হতে চাইলে প্রতিটি সেকেন্ডের মূল্য বুঝতে হবে। একটি স্ট্যান্ডার্ড লাইফস্টাইল গড়ে তোলার প্রথম কাজ হলো কোন কোন বিষয় তোমার জীবন থেকে সময় চুরি করছে, তা শনাক্ত করা। এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো Time Audit করা। 

২৪ ঘণ্টায় তুমি কোথায় কত সময় ব্যয় করেছ, তার হিসাব লিখে রাখো। এরপর প্রতিটি কাজকে তিন ভাগে ভাগ করো অতি প্রয়োজনীয়, গুরুত্বপূর্ণ এবং অপচয়। পরের দিন থেকে অতি প্রয়োজনীয় কাজগুলোকে অগ্রাধিকার দাও তারপর গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য সময় রাখো, এবং অপচয়ের জায়গাগুলো কঠোরভাবে কমিয়ে দাও। এক্ষেত্রে আরেকটা কাজ করতে পারো, সেটা হলো To Do List তৈরি করা। দিনের শুরুতে সারাদিন কী কী পড়বে সেটা গুরুত্ব অনুযায়ী লিখে ফেলো। তারপর তালিকার অগ্রাধিকার অনুযায়ী প্রতিটি পড়া একে একে শেষ করো।

দিন শেষে হিসাব মিলিয়ে দেখো যে, তালিকার পড়া কতটুকু হলো আর কতটুকু হলো না। যদি সব পড়া শেষ করতে পারো তাহলে নিজেকে বাহবা দিবা। নিজেকে নিজে পছন্দের কিছু ট্রিট দিবা। আর পড়া শেষ করতে না পারলে শেষ না করার কারণ খুঁজে সেটা সমাধান করবা। নিজের সাথে নিজের একটা Accountability রাখতে হবে। মনে রাখবে, সময় কাউকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দেয় না। প্রতিদিনের ২৪ ঘণ্টা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তুমি সেই ২৪ ঘণ্টায় কী করেছ, সেটিই তোমার আগামী দিনের অবস্থান নির্ধারণ করবে। তাই সময়কে বিনিয়োগ করো।

শেষ কখা, তুমি যদি সত্যিই কোনো প্রতিযোগিতায় অন্যদের পেছনে ফেলতে চাও, তাহলে প্রথমে অন্যদের হারানোর চিন্তা বাদ দাও। নিজের পুরোনো version-কে হারাও। গতকালের অলসতাকে হারাও। গতকালের distraction-কে হারাও। গতকালের অগোছালো জীবনকে হারাও। 

গতকালের ‘কাল থেকে শুরু করব’ মানসিকতাকে হারাও। কারণ ভর্তি পরীক্ষার আসল প্রতিযোগিতা পরীক্ষার হলের এক ঘণ্টা না। এটি শুরু হয় তার অনেক আগে তোমার বিছানায়, তোমার মোবাইলে, তোমার পড়ার টেবিলে, তোমার ঘুমের সময়ে, তোমার বন্ধু নির্বাচনে এবং সবচেয়ে বেশি তোমার প্রতিদিনের সময় ব্যবস্থাপনায়। মনে রেখো তোমার স্বপ্ন তোমাকে অনুপ্রাণিত করবে, কিন্তু তোমার লাইফস্টাইল তোমাকে সেখানে পৌঁছে দেবে। একটি বীজের ভেতর বিশাল বৃক্ষের সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু শুধু সম্ভাবনা দিয়ে বৃক্ষ হয় না। তাকে মাটি, পানি, আলো, যত্ন এবং সময় দিতে হয়। তুমিও তেমনই।

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা, এডুকেশন অ্যান্ড ক্যারিয়ার প্ল্যানেট