ভর্তি পরীক্ষার জন্য আমি কোনো কোচিং সেন্টারে যাইনি
ব্যবসা ও করপোরেট দুনিয়ায় ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন থাকলে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) হতে পারে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য। তবে আইবিএ-তে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি অন্য অনেক ভর্তি পরীক্ষার চেয়ে আলাদা। এখানে মুখস্থনির্ভর পড়াশোনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা, বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি, যুক্তি প্রয়োগের সক্ষমতা এবং অল্প সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা। সঠিক কৌশলে প্রস্তুতি শুরু করাটাই হতে পারে সাফল্যের প্রথম ধাপ।
এমনই একজন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) আইবিএর বিবিএ অষ্টম ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. আতাউল্লাহ। এইচএসসি ২০২২ ব্যাচের এই শিক্ষার্থী আইবিএ ভর্তি পরীক্ষায় ৭ তম স্থান অর্জন করেছেন। আইবিএর প্রস্তুতি, ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্যের কৌশল এবং নিজের অভিজ্ঞতার নানা দিক নিয়ে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলেছেন আতাউল্লাহ।
রাবির আইবিএতে পড়ার স্বপ্নটা কীভাবে তৈরি হয়েছিল এবং আইবিএকেই কেন বেছে নিয়েছিলেন?
কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় জানতে পারি, বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রেস্টিজিয়াস ডিগ্রিগুলোর একটি আইবিএ থেকে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই অনলাইনে আইবিএ সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করি। যতই আইবিএ সম্পর্কে জানতে থাকি, ততই সেখানে পড়ার সুপ্ত বাসনা জেগে ওঠে। অথচ ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল আইন পড়ব এবং অনেক বড় লয়ার হব। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় সপ্তম স্থান অর্জনের মাধ্যমে সেই সুপ্ত বাসনা পূরণ করার সুযোগ পাই।
আমার এই স্বপ্ন পূরণের পেছনে সবচেয়ে কাছ থেকে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন আমার মা, বাবা ও বড় ভাই। বিশেষ করে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় আমার বড় ভাইয়ের দিকনির্দেশনা ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন: প্রস্তুতি শুরুর আগে সবারই অন্তত একটি মূল্যায়নমূলক পরীক্ষা দেওয়া উচিত
আইবিএর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি আপনি কখন থেকে শুরু করেছিলেন এবং শুরুতে কীভাবে পরিকল্পনা করেছিলেন?
আমি যখন ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ি, তখন আমার বড় ভাই ভর্তি পরীক্ষা সম্পর্কে আমাকে বিভিন্ন তথ্য দিতেন। সে সময় রমজান মাসে তিনি আমাকে সাইফুরস ভোকাবুলারি বইটি উপহার দেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পুরো বইটি আয়ত্ত করে ফেলি।
এরপর এইচএসসি পরীক্ষা অনেক খারাপ হওয়ায় কিছুটা ভেঙে পড়েছিলাম। তখন বড় ভাই আমাকে অনেক মোটিভেশন দেন এবং তার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করি।
আমি সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থী হলেও কলেজে থাকাকালীন বিভিন্ন পত্রপত্রিকা পড়তাম। ফলে সাধারণ জ্ঞান খুব সহজে বুঝতে ও আয়ত্ত করতে পারতাম। ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় আমার নির্দিষ্ট একটি পড়ার রুটিন ছিল। ভোর ৫টায় ঘুম থেকে উঠে দুপুর পর্যন্ত ইংরেজি পড়তাম। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাংলা পড়তাম। সন্ধ্যায় নিয়মিত দুই ঘণ্টা পত্রিকা পড়তাম। এরপর রাত ১২টা পর্যন্ত সাধারণ জ্ঞান, গণিত ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়তাম।
ইংরেজি, গণিত ও যুক্তি এই তিনটি অংশের প্রস্তুতি কীভাবে নিয়েছিলেন?
কলেজে থাকাকালীন একটি ভোকাবুলারি বই আয়ত্ত করার ফলে পরবর্তীতে ইংরেজির মেমোরাইজ অংশ আমার কাছে খুব সহজ মনে হয়েছে। ইংরেজি গ্রামারের জন্য আমি ‘মাস্টার’ বইটি পড়েছিলাম। আমার দেখা মতে, ইংরেজি গ্রামারের জন্য বাংলাদেশে ‘মাস্টার’ বইটি বাজারের সেরা বই।
আমি যেহেতু ইন্টারমিডিয়েটে সায়েন্সের শিক্ষার্থী ছিলাম, তাই গণিত নিয়ে আমাকে একদম বেগ পেতে হয়নি। মাঝে মধ্যে নিয়মিত প্র্যাকটিস করতাম। তবে যাদের গণিতে ভয় রয়েছে, তাদের জন্য সবচেয়ে ভালো সমাধান হলো নিয়মিত গণিত চর্চা করা। গণিত নিয়মিত চর্চার কোনো বিকল্প নেই।
আপনার প্রস্তুতির সময় সবচেয়ে কঠিন বিষয় কোনটি ছিল এবং সেটি কীভাবে কাটিয়ে উঠেছিলেন?
ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির শুরুতে আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন বিষয় মনে হয়েছিল বাংলা। কিন্তু পরবর্তীতে বাংলা আমার কাছে বেশি নম্বর পাওয়ার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হয়ে ওঠে।
বাংলা কবিতাগুলো আমার মনে থাকত না। তখন একটি উপায় বের করি। প্রতিদিন কবিতাগুলো দুইবার করে খুব দ্রুত রিডিং পড়তাম। ৩০ মিনিট করে এক ঘণ্টায় দুইবার রিডিং পড়তাম। এভাবে ২০ দিন পড়ার পর আমার সব কবিতা মুখস্থ হয়ে যায়। সেই মুখস্থ এখনও আমার মনে আছে।
বাংলা ব্যাকরণের জন্য আমার কাছে আদর্শ বই হলো নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা দ্বিতীয় পত্র। এই বইয়ের উদাহরণগুলোই ঘুরেফিরে বারবার ভর্তি পরীক্ষায় আসে। তাই যাদের ব্যাকরণের নিয়ম পড়তে ভালো লাগে না, তাদের উচিত অন্তত ব্যাকরণের উদাহরণগুলো ভালোভাবে আয়ত্ত করা।
ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে কোচিং, বই, অনলাইন রিসোর্স ও বিগত বছরের প্রশ্ন কোনগুলো সবচেয়ে বেশি কাজে এসেছে?
ভর্তি পরীক্ষার জন্য আমি কোনো কোচিং সেন্টারে যাইনি। আমার বড় ভাই আমাকে দিকনির্দেশনা দিতেন এবং সেই অনুযায়ী আমি পড়ালেখা করতাম। আমার মনে হয়, কোচিং সেন্টারে যাওয়া মানে জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় নষ্ট করা। এর পরিবর্তে কোনো বড় ভাইয়ের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে। কোনো বিষয়ে জানা বা বোঝার প্রয়োজন হলে টিউশন নিলে অনেক সময় বাঁচবে। তবে বর্তমানে বাজারে অনেক বই খুব সহজ ভাষায় লেখা। এসব বই পড়লেও যেকোনো ডাউট ক্লিয়ার করা যায়।
আপনার নিজের প্রস্তুতির এমন কোন কৌশল ছিল, যেটি সফলতার পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে?
আমার এই ভর্তি পরীক্ষার গৌরবময় সাফল্যের পেছনে একটাই কারণ নিয়মিত রুটিন অনুসরণ করে পড়ালেখা করা। এর বাইরে আর কোনো ভূমিকা আছে বলে আমি মনে করি না। আমার একটাই পলিসি ছিল পড়া, পড়া এবং নিয়মিত পড়া। দেখতে দেখতে এখন বিবিএর শেষ বর্ষে পদার্পণ করছি। আইবিএর একাডেমিক কার্যক্রম ও কোর্স আউটলাইন বর্তমান করপোরেট অফিসগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিয়মিত আপডেট করা হয়।
বর্তমানে রাবির আইবিএতে পড়াশোনার পরিবেশ, একাডেমিক চাপ ও শিক্ষকদের সহযোগিতা কেমন?
বর্তমানে আমাদের আইবিএতে এআই এবং করপোরেট ম্যানেজমেন্ট, লিডারশিপসহ বিভিন্ন কোর্স হাতেকলমে শিক্ষা দেন শিক্ষকরা। আইবিএর শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষকদের দরজা সবসময় খোলা থাকে।
আইবিএতে মূলত লিডারশিপের জন্য প্রস্তুত করা হয়। বর্তমান করপোরেট জগতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। আইবিএর গ্র্যাজুয়েটরা দিন দিন করপোরেট জগতে দেশের মুখ উজ্জ্বল করছেন। আইবিএতে পড়াকালীনই অনেক প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের হায়ার করে এবং আইবিএর গ্র্যাজুয়েটরা অনেক হ্যান্ডসাম স্যালারিতে চাকরি করেন। কারও যদি করপোরেট জগতে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন থাকে, তাহলে তার জন্য আইবিএ হতে পারে বেস্ট চয়েস।
যারা এখন রাবির আইবিএর প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য আপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পরামর্শ কী?
যারা এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের প্রতি আমার তিনটি পরামর্শ রয়েছে।
প্রথমত, নিয়মিত পড়তে হবে এবং অনলাইন বা অফলাইনে কোনো এক্সাম ব্যাচে পরীক্ষা দিয়ে নিজেকে যাচাই করতে হবে। কোনো বিষয়ে দুর্বলতা থাকলে দ্রুত তা কাটিয়ে উঠতে হবে।
দ্বিতীয়ত, এবার আইবিএতে রিটেন পরীক্ষা হবে। তাই ইংরেজি রিটেন পরীক্ষায় ভালো করার জন্য প্রতিদিন ইংলিশ নিউজ পেপার পড়া উচিত। শুরুতে বিষয়টি সাময়িকভাবে বিরক্তিকর মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অনেক বেশি কাজে দেবে।
আরও পড়ুন: ভুল সিদ্ধান্তে থমকে যেতে পারে ক্যারিয়ার, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে যেসব সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ
তৃতীয়ত, ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় একদম সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব ব্যবহার না করা। নিয়মিত পড়ালেখা করতে হবে। স্বপ্ন জয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের লক্ষ্যে স্থির থাকা এবং নিয়মিত পরিশ্রম করা।
নিয়মিত পড়ো, নিজের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠো এবং স্বপ্নের দিকে এগিয়ে চলো। স্বপ্ন জয় তোমারই হবে। দেখা হবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর করিডোর বা ক্যান্টিনে কোনো এক সময়।