একই কলেজের দুই যমজ জুটির বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে সাফল্য
একই কলেজ থেকে উচ্চমাধমিক শেষ করা দুই যমজ জুটির বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে সাফল্য পেয়ে আলোচনায় এসেছে শেরপুর সরকারি কলেজ। ২০২৫-২৬ সেশনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে শুধু পরিবার নয়, পুরো জেলার জন্যই গর্বের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন এই চার শিক্ষার্থী। তারা হলেন-তাসনোভা আনজুম তাসমি ও তাবাসসুম আনজুম তানহা এবং শাকিবুল হাসান জনি ও রাকিবুল হাসান রনি।
শেরপুর সদর উপজেলার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মোবারকপুর বাঁশতলা গ্রামের যমজ দুই ভাই শাকিবুল হাসান জনি ও রাকিবুল হাসান রনি এবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, তাদের এলাকা থেকে এই প্রথম কেউ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেন।
দুই ভাইই শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং শেরপুর সরকারি ভিক্টোরিয়া একাডেমি থেকে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে পড়াশোনা করা এই দুই ভাইয়ের লক্ষ্যও ছিল একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়া।
তবে তাদের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক আবেগঘন গল্প। প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় দুই ভাই আলাদা দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও তারা ভর্তি হননি। কারণ, তাদের ইচ্ছা ছিল একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়াশোনা করার। সেই লক্ষ্য নিয়েই তারা দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। অবশেষে সেকেন্ড টাইমে এসে দুজনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে নিজেদের স্বপ্ন পূরণ করেছেন।
ভর্তি পরীক্ষায় শাকিবুল হাসান জনি শিফট-১-এ মেধাতালিকায় ১৬৫৭তম হয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। অন্যদিকে রাকিবুল হাসান রনি শিফট-২-এ মেধাতালিকায় ২৭৫৪তম হয়ে গণিত বিভাগে চান্স পেয়েছেন। বর্তমানে তারা সাবজেক্ট মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া চালু রেখেছেন।
রাকিবুল হাসান রনি বলেন, “আমাদের বাবা-মা অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তাদের সেই কষ্ট লাঘব করতে চাই।”
শাকিবুল হাসান জনি বলেন, “প্রথমবার আমরা আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা চেয়েছিলাম একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। তাই আবার চেষ্টা করেছি। আল্লাহর রহমতে এবার দুজনই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েছি।”
অন্যদিকে, শেরপুর সদর উপজেলার বাগরাকসা মহল্লার যমজ দুই বোন তাসনোভা আনজুম তাসমি ও তাবাসসুম আনজুম তানহাও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় দেখিয়েছেন অসাধারণ সাফল্য। বাবাকে হারানোর বেদনা বুকে নিয়েও তারা দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। শেষ পর্যন্ত একই বিশ্ববিদ্যালয়—শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নতুন যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছেন তারা।
দুই বোনই শেরপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এসএসসি ও এইচএসসি—দুই পরীক্ষাতেই তারা গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় তাসনোভা আনজুম তাসমি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ৯৯৮তম এবং তাবাসসুম আনজুম তানহা ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে ২৯২৫তম স্থান অর্জন করে ভর্তি সম্পন্ন করেছেন।
শুধু শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে একসঙ্গে থাকতে পারার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই তারা শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
দুই বোন জানান, ২০২০ সালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাদের বাবা মো. ছানোয়ার হোসেন তরফদার, যিনি পিডিবিতে কর্মরত ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পরও তারা থেমে যাননি। বরং মায়ের অনুপ্রেরণা ও নিজেদের দৃঢ় মনোবল নিয়েই এগিয়ে গেছেন।
তারা বলেন, “আজ বাবা বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। আমরা তাঁর স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করে যাচ্ছি।”
সন্তানদের এমন অর্জনে আবেগাপ্লুত মা তাসলিমা বেগম বলেন, “এত দিনের কষ্ট আর দোয়া আজ সার্থক মনে হচ্ছে। ওরা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়, এটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া।”
এ বিষয়ে শেরপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবদুর রউফ বলেন, “এই চার শিক্ষার্থীর সাফল্য আমাদের কলেজের জন্য অত্যন্ত গর্বের। তারা সবাই মেধাবী ও পরিশ্রমী শিক্ষার্থী ছিল। তাদের এই অর্জন ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে।”
একই কলেজের দুই যমজ জুটির এমন ব্যতিক্রমী সাফল্যে আনন্দের জোয়ার বইছে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পুরো এলাকাজুড়ে। স্থানীয়দের মতে, এই অর্জন শেরপুরের শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।