০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১৫:৩২

৪ শিক্ষকের ৭ শিক্ষার্থী, এইচএসসিতে পাস করেননি কেউ

সবুজ পল্লী কলেজ  © সংগৃহীত

যশোরের মণিরামপুর উপজেলার সবুজ পল্লী কলেজে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সাত শিক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেননি। কলেজটিতে বর্তমানে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র চারজন। এর মধ্যে ইংরেজি বিষয়ের কোনো শিক্ষক নেই। ২০২৫ সালের ৪ মার্চ কলেজটির একমাত্র ইংরেজি প্রভাষক এস আলম মারা যাওয়ার পর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে। নন-এমপিও প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সেখানে নতুন শিক্ষক নিয়োগেও আগ্রহ দেখাচ্ছেন না কেউ। ফলে শিক্ষকসংকট ও পাঠদান ঘাটতির মধ্যে ধুঁকছে প্রতিষ্ঠানটি।

মণিরামপুর-খেদাপাড়া সড়কের পাশে ধানখেতের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে কলেজটির ছোট দুটি কাঁচা-পাকা ভবন। একটি ভবনের পলেস্তারা খসে পড়েছে। অন্যটি তুলনামূলক নতুন। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-কর্মচারীরা কখনোই বেতন-ভাতা পাননি। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতিতে চলছে কলেজের কার্যক্রম। স্থানীয়দের প্রশ্ন, যেখানে শিক্ষক নেই, নিয়মিত পাঠদান নেই, সেখানে শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করবেন কীভাবে?

খেদাপাড়া ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান জিএম ওমর ফারুকের উদ্যোগে ২০০৩ সালে সবুজ পল্লী কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে মানবিক, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগে পাঠদানের অনুমোদন পায় প্রতিষ্ঠানটি। তখন শিক্ষক ছিলেন ১৫ জন। কিন্তু বেতন-ভাতা না পাওয়ায় ধীরে ধীরে বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যান। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরাও কলেজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। পরে মানবিক বিভাগের পাঁচজন প্রভাষক দিয়ে চলছিল পাঠদান। ২০২৫ সালের ৪ মার্চ ইংরেজি বিভাগের একমাত্র প্রভাষক এস আলমের মৃত্যুর পর বর্তমানে চারজন শিক্ষক দিয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি।

নন-এমপিও হওয়ায় কলেজের শিক্ষকদের সরকারি বেতন-ভাতার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে শূন্য হওয়া ইংরেজি প্রভাষকের পদে নতুন কেউ চাকরির আগ্রহ দেখাননি। এমনকি এ পদে আবেদনও করেননি কেউ। ফলে ইংরেজি শিক্ষক ছাড়াই শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে।

কলেজটির গত কয়েক বছরের ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২ সালে ৩৬ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেন ২৯ জন। ২০২৩ সালে ২৭ জনের মধ্যে পাস করেন ২৬ জন। ২০২৪ সালে ১০ জন পরীক্ষা দিয়ে পাস করেন আটজন। ২০২৫ সালে পাঁচজনের মধ্যে পাস করেন তিনজন। তবে এবার সাতজন পরীক্ষায় অংশ নিলেও পাস করতে পারেননি কেউ। তাঁদের মধ্যে তিনজন একটি বিষয়ে এবং দুজন দুটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছেন।

কলেজ মোড়ের দোকানি আবু রহিম বলেন, ‘এলাকার অধিকাংশ ছেলেমেয়ে কলেজটিতে পড়তো। কয়েক বছর পর শিক্ষকরা চলে যেতে থাকেন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরাও আসা বন্ধ করে দেয়।’

খেদাপাড়া বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, ২০০৬ সালের পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা এসএম আব্দুল হক সবুজ পল্লী কলেজের কাছেই ‘মাতৃভাষা কলেজ’ নামে আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি ওই কলেজটি দ্রুত এমপিওভুক্ত করাতে সক্ষম হন। অথচ আগে প্রতিষ্ঠিত সবুজ পল্লী কলেজটি এমপিওভুক্তি থেকে বঞ্চিত হয়। এর মধ্যে ইংরেজি শিক্ষকও মারা যান। অর্থনীতির শিক্ষক রমজান আলী একসময় ইংরেজি ক্লাস নিতেন। শিক্ষকসংকটের কারণে ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীরাও কলেজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘২৩ বছর ধরে কলেজে শিক্ষকতা করছি। এক পয়সাও পাইনি। ছেলেমেয়ে, ঘর সংসার তো রয়েছে।’

বর্তমানে একাদশ শ্রেণিতে ৩১ জন এবং দ্বাদশ শ্রেণিতে ৪১ জন শিক্ষার্থী রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘ছেলেমেয়েদের মুখের তাকিয়ে এখনও আছি।’

কলেজটি এমপিওভুক্ত না হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এমপিওভুক্তির জন্য যেসব শর্ত পূরণ করতে হয়, সেগুলো কলেজে সবসময়ই ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে প্রতিষ্ঠানটিকে এমপিওভুক্ত হতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কলেজটির প্রতিষ্ঠাতা খেদাপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিএম ওমর ফারুক উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। কলেজ প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে। মণিরামপুরের তৎকালীন সংসদ সদস্য খান টিপু সুলতান এমপিওভুক্তিতে কোনো বাধা না দিলেও স্বপন ভট্টাচার্য সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে নানাভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। একপর্যায়ে কলেজের একমাত্র কাঁচা-পাকা ভবনটির পলেস্তারা খসে পড়তে থাকে। পরে ২০২৫ সালে সংসদ সদস্য ইয়াকুব আলী কলেজে একটি ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করে দেন।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক কলেজের এক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বলেন, ‘চেয়ারম্যানের সাথে থেকে অনেক আশা নিয়ে আমরা কলেজটি করেছিলাম। কিন্তু কয়েক বছর পার হলেও এমপিও না হওয়ায় বিজ্ঞান ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষকরা চলে যান। শিক্ষার্থীদের কলকাকলীমুখর কলেজটি এখন কোনোরকমে টিকে আছে। কলেজটি এমপিওভুক্ত হলে পাসের হার বাড়বে।’

খেদাপাড়ার স্কুলশিক্ষক মতিয়ার রহমান বলেন, ‘ভূগোল শিক্ষক দিয়ে ইংরেজি পড়ালে শিক্ষার্থীরা কেউ পাস করবে না—এটাই স্বাভাবিক। তবে, পুরনো প্রতিষ্ঠান। এমপিওভুক্ত হলে শিক্ষক পাওয়া যাবে। তখন এ সমস্যা থাকবে না।’

খেদাপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল আলিম জিন্না বলেন, ‘কলেজটি খুব দুরবস্থার মধ্যে আছে। এ বছর কেউ পরীক্ষা দিয়েছিল কি না জানি না। তবে এমপিওভুক্ত হলে এ প্রতিষ্ঠান প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে। এলাকার স্বার্থে, আমাদের ছেলে-মেয়েদের স্বার্থে কলেজটি এমপিওভুক্তির দাবি করছি।’

এদিকে, শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে যশোর শিক্ষা বোর্ড। বোর্ডটির পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর এস এম হোসেন আলী বলেন, সবুজ পল্লী কলেজের প্রধানকে ডেকে স্বীকৃতি নবায়ন করা হবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শিক্ষা বোর্ড অত্যন্ত কঠিন অবস্থানে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।

যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ফারুকে আযম মু. আব্দুস ছালাম ও সচিব প্রফেসর ড. মো. আব্দুল মতিনের সতর্কতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, বোর্ড থেকে বারবার সতর্ক করা হয়েছে। তবে চলতি বছর কলেজটির স্বীকৃতি নবায়ন হবে না—এমন কোনো নির্দেশনার কথা তিনি অস্বীকার করেন।

কলেজের অধ্যক্ষ রেজাউল ইসলাম বলেন, আগের বছরগুলোতে পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক ছিল। কিন্তু এবার কেউ পাস করেনি। ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক না থাকায় এ বিপর্যয় ঘটেছে।

তিনি বলেন, ‘একজন খণ্ডকালীন ইংরেজি শিক্ষক দিয়ে ক্লাস করানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাকে বেতন না দেওয়ায় তিনি মাস দুয়েক পর আর আসেননি। স্কুল হলে অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে ইংরেজি পড়ানো যেত। কিন্তু কলেজে সেটি সম্ভব হচ্ছে না।’

কলেজের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি কবীর হোসেন বলেন, এলাকার শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও প্রতিষ্ঠানটি টিকে আছে। তবে এবারই প্রথম পাসের হার শূন্য হয়েছে। ইংরেজি শিক্ষক থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না। আগামীতে যাতে এ অবস্থার পুনরাবৃত্তি না হয়, সে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।