স্টার মার্কস থেকে জিপিএ-৫, দুই যুগে যেভাবে বদলেছে পরীক্ষার ফল প্রকাশের ধরন
একসময় এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অপেক্ষা থাকত কে প্রথম বিভাগে, কে দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ভালো ফলের স্বীকৃতি হিসেবে কারও ফলাফলে যুক্ত হতো স্টার মার্কস। তখন পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরই ছিল মেধা ও সাফল্য পরিমাপের প্রধান মাপকাঠি। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই মূল্যায়নব্যবস্থা। বিভাগভিত্তিক ফলের জায়গা নিয়েছে গ্রেডিং পদ্ধতি।
এখন সর্বোচ্চ সাফল্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে জিপিএ-৫। তবে গ্রেডের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক নম্বর প্রকাশের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পুরোনো নম্বরনির্ভর প্রতিযোগিতাও পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে মূল্যায়ন পদ্ধতির দর্শন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মত শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের।
স্টার মার্কসের যুগে ফলের পরিচয়
বাংলাদেশে এই পরিবর্তনের ইতিহাস দুই দশকের বেশি সময়ের। প্রথমে গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর আগে বাংলাদেশের পাবলিক পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের ফল প্রকাশ করা হতো বিভাগ বা শ্রেণির ভিত্তিতে। প্রাপ্ত নম্বরের ওপর নির্ভর করে শিক্ষার্থীরা প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হতেন। সাধারণভাবে ৬০ শতাংশ বা তার বেশি নম্বর পেলে প্রথম বিভাগ, ৪৫ থেকে ৬০ শতাংশের কম পেলে দ্বিতীয় বিভাগ এবং ৩৩ থেকে ৪৫ শতাংশের কম নম্বর পেলে তৃতীয় বিভাগ হিসেবে বিবেচিত হতেন। ৩৩ শতাংশের কম নম্বর পেলে অকৃতকার্য হতে হতো।
শুধু বিভাগ নয়, ভালো ফলের স্বীকৃতি হিসেবে প্রচলিত ছিল স্টার মার্কস ও লেটার মার্কসের মতো পরিচিতি। ফলে পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের সাফল্য বোঝার জন্য বিভাগ, প্রাপ্ত নম্বর এবং বিশেষ কৃতিত্বের বিষয়গুলো সামনে আসত। কে কত নম্বর পেয়েছেন, কার ফল অন্যদের তুলনায় ভালো—এ হিসাবও ছিল স্পষ্ট।
এখন সর্বোচ্চ সাফল্যের প্রতীক হয়ে উঠেছে জিপিএ-৫। তবে গ্রেডের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক নম্বর প্রকাশের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পুরোনো নম্বরনির্ভর প্রতিযোগিতাও পুরোপুরি দূর হয়নি। ফলে মূল্যায়ন পদ্ধতির দর্শন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বলে মত শিক্ষাবিশেষজ্ঞদের।
বিভাগভিত্তিক ব্যবস্থায় একই বিভাগ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে নম্বরের ব্যবধান থাকলেও ফলাফলের মূল পরিচয় হয়ে উঠত বিভাগ। অর্থাৎ, প্রথম বিভাগ পাওয়া দুই শিক্ষার্থীর একজনের নম্বর ৬০ শতাংশের কাছাকাছি, অন্যজনের ৮০ শতাংশের বেশি হলেও বিভাগীয় পরিচয় একই থাকত। এই ব্যবধান বোঝার জন্য নম্বরের বিস্তারিত হিসাব দেখতে হতো।
দুইশ বছর আগে বিশ্বে গ্রেডিংয়ের ধারণা
পরীক্ষার ফলকে শ্রেণি বা গ্রেডে ভাগ করে শিক্ষার্থীদের অর্জন মূল্যায়নের ধারণা নতুন নয়। এর প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের অন্যতম পুরোনো নথি পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৭৮৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এজরা স্টাইলস পরীক্ষার পর শিক্ষার্থীদের চারটি শ্রেণিতে ভাগ করেছিলেন। শ্রেণিগুলোর নাম ছিল ‘অপটিমি’, ‘সেকেন্ড অপটিমি’, ‘ইনফেরিওরেস’ ও ‘পেজোরেস’। এগুলোর অর্থ ছিল যথাক্রমে সেরা, দ্বিতীয় সেরা, অপেক্ষাকৃত কম ভালো এবং সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা।
পরবর্তী সময়ে এই শ্রেণিভিত্তিক মূল্যায়ন আরও কাঠামোবদ্ধ হয়। ১৮১৭ সালে ইয়েলে চার থেকে শূন্য পর্যন্ত সংখ্যাভিত্তিক গ্রেডের একটি পদ্ধতি চালু হয়। সেখানে দুই ছিল উত্তীর্ণ হওয়ার মানদণ্ড। পরে বিষয়ভিত্তিক ফলের সঙ্গে গ্রেড যুক্ত করা এবং বিভিন্ন বিষয়ের ফলের ওজন নির্ধারণের মতো ধারণাও বিকশিত হয়। আধুনিক গ্রেডিং পদ্ধতির বিকাশে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গ্রেডিং, লেটার গ্রেড এবং জিপিএ এক বিষয় নয়। গ্রেডিং হলো নম্বর বা অর্জনের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীর ফলকে নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ভাগ করার পদ্ধতি। আর জিপিএ বা গ্রেড পয়েন্ট অ্যাভারেজ হলো বিভিন্ন বিষয়ের গ্রেড পয়েন্টের গড়। অর্থাৎ, গ্রেডিংয়ের মাধ্যমে একটি বিষয়ের ফল নির্দিষ্ট গ্রেডে রূপান্তরিত হয়; একাধিক বিষয়ের গ্রেড পয়েন্টের সমন্বয়ে নির্ধারিত হয় সামগ্রিক জিপিএ।
বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সময়ের সঙ্গে এই মূল্যায়ন পদ্ধতির নানা রূপ তৈরি হয়েছে। কোথাও সংখ্যাভিত্তিক, কোথাও অক্ষরভিত্তিক গ্রেড চালু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে এ, বি, সি, ডি ও এফ—এ ধরনের লেটার গ্রেডিংও ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পায়। অর্থাৎ, আজকের প্রচলিত জিপিএ পদ্ধতি একদিনে তৈরি হয়নি; দীর্ঘ সময়ের পরিবর্তন ও পরীক্ষামূলক প্রয়োগের মধ্য দিয়ে এর বিকাশ ঘটেছে।
দুই যুগ আগে শুরু এসএসসিতে-এইচএসসিতে
বাংলাদেশে পাবলিক পরীক্ষায় গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় বিভাগভিত্তিক ফলের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের অর্জনকে তুলনামূলকভাবে বিস্তারিতভাবে মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে। ২০০১ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় প্রথম গ্রেডিং পদ্ধতি চালু হয়। এরপর ২০০৩ সালে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাতেও এ পদ্ধতি যুক্ত হয়। এর মধ্য দিয়ে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ, মেধাতালিকা, স্টার মার্কস ও লেটার মার্কসের প্রচলিত কাঠামো থেকে সরে আসে দেশের পাবলিক পরীক্ষা।
নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বরকে নির্দিষ্ট গ্রেডে রূপান্তর করা হয়। পরে সেই গ্রেডের বিপরীতে নির্ধারিত পয়েন্টের গড় হিসাব করে শিক্ষার্থীর সামগ্রিক ফল নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হয়। সর্বোচ্চ গ্রেড পয়েন্ট রাখা হয় ৫। ফলে শিক্ষার্থীর ফলাফলের পরিচয় হয়ে ওঠে জিপিএ-৫, জিপিএ-৪ কিংবা তার নিচের কোনো পয়েন্ট।
এই পদ্ধতি চালুর ফলে আগের মতো শুধু বিভাগ দিয়ে ফল প্রকাশের পরিবর্তে প্রতিটি বিষয়ের গ্রেড পয়েন্ট এবং সামগ্রিক জিপিএ জানার সুযোগ তৈরি হয়। তবে নতুন ব্যবস্থার শুরুতেই গ্রেডের সীমা ও মূল্যায়ন নিয়ে কিছু জটিলতা দেখা দেয়। ফলে চালুর পরপরই এর কাঠামোয় পরিবর্তন আনতে হয়।
প্রথম বছরেই বদলাতে হয় গ্রেডিংয়ের কাঠামো
২০০৩ সালের ৪ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয় গ্রেডিং পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে প্রজ্ঞাপন জারি করে। নতুন ব্যবস্থায় আগের ছয়টি গ্রেডের পরিবর্তে সাতটি গ্রেড নির্ধারণ করা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ‘এ মাইনাস’ বা অ− গ্রেড, যার গ্রেড পয়েন্ট ৩ দশমিক ৫। সর্বোচ্চ জিপিএ-৫ অপরিবর্তিত রাখা হয়।
পরিবর্তিত কাঠামো অনুযায়ী, ৮০ থেকে ১০০ নম্বর পেলে অ+ বা গ্রেড পয়েন্ট ৫, ৭০ থেকে ৭৯ নম্বরে অ বা ৪, ৬০ থেকে ৬৯ নম্বরে অ− বা ৩ দশমিক ৫, ৫০ থেকে ৫৯ নম্বরে ই বা ৩, ৪০ থেকে ৪৯ নম্বরে ঈ বা ২ এবং ৩৩ থেকে ৩৯ নম্বরে উ বা ১ নির্ধারণ করা হয়। ৩৩-এর কম নম্বর পেলে ঋ বা শূন্য গ্রেড পয়েন্ট রাখা হয়।
এর আগে ৬০ থেকে ৭৯ নম্বর পর্যন্ত অ গ্রেড ধরা হতো। ফলে ৬০ থেকে ৬৯ নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা অ− গ্রেড যুক্ত হয়। একই সঙ্গে কয়েকটি গ্রেডের নম্বরসীমাও পুনর্বিন্যাস করা হয়। মন্ত্রণালয়ের যুক্তি ছিল, গ্রেডের মধ্যে নম্বরের ব্যবধান সমন্বয় করে মূল্যায়নকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন।
তৎকালীন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন পরিবর্তনটিকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তার বক্তব্য ছিল, আগের গ্রেডিং ব্যবস্থায় সংশোধনের প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে সাহিত্য বা বর্ণনামূলক বিষয়ে শিক্ষার্থীরা ৮০-এর বেশি নম্বর পেতে পারে—এমন উপযুক্ত প্রশ্ন প্রণয়ন এবং খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। এ জন্য প্রশ্ন প্রণয়ন ও খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
একই প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, ২০০৪ সাল থেকে এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় চতুর্থ বিষয়ের নম্বর ফলাফলের জিপিএ হিসাবের সঙ্গে যুক্ত হবে। এর আগে চতুর্থ বিষয়ের নম্বর সামগ্রিক ফলাফলে প্রতিফলিত হতো না। এই সিদ্ধান্তের ফলে পরবর্তী বছর থেকে শিক্ষার্থীদের জিপিএ নির্ধারণের হিসাবেও পরিবর্তন আসে।
পরিবর্তনে যে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল অভিভাবক মহলে
নতুন পদ্ধতি চালুর পর শুধু শিক্ষার্থী নয়, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যেও গ্রেডিং নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ২০০৩ সালের জুলাইয়ে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এ বিভ্রান্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন অনেক অভিভাবক ফলাফলের গ্রেড, পয়েন্ট ও উত্তীর্ণ হওয়ার নিয়ম বুঝতে সংবাদপত্রের কার্যালয়ে ফোন করে ব্যাখ্যা জানতে চান।
২০০৩ সালের গণমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে এ বিভ্রান্তির চিত্র উঠে আসে। ধানমন্ডির অভিভাবক আফিফা রহমান তাঁর মেয়ের ফলাফল সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত উদ্বেগে থাকার কথা জানান। তাঁর ভাষ্য ছিল, মেয়ের ফলাফল পুরোপুরি বুঝতে না পারা পর্যন্ত তাঁরা অনিশ্চয়তায় ভুগেছেন। এমনকি শিক্ষকদেরও নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ওই সময় গ্রেডের নম্বরসীমা, কোনো বিষয়ে অকৃতকার্য হলে সামগ্রিক ফলের কী প্রভাব পড়বে এবং পরবর্তী শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ থাকবে কি না—এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। নতুন নিয়মে কোনো বিষয়ে নিম্ন গ্রেড পেলে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ না থাকার বিষয়টিও শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ায়। পাশাপাশি একটি বিষয়ের বিভিন্ন অংশ—নৈর্ব্যক্তিক, সৃজনশীল বা রচনামূলক এবং ব্যবহারিক—প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আলাদাভাবে পাস করার শর্তও আলোচনায় আসে।
শিক্ষা বোর্ডের পক্ষ থেকে ফলাফলে প্রতিটি বিষয়ের গ্রেড পয়েন্ট এবং সামগ্রিক জিপিএ দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। সফল শিক্ষার্থীদের সনদে বিভাগ নয়, জিপিএ উল্লেখ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নম্বরপত্রের পরিবর্তে ট্রান্সক্রিপ্ট দেওয়ার কথাও জানানো হয়। কিন্তু নতুন ব্যবস্থার নিয়ম ও প্রয়োগ সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় শুরুতে বিভ্রান্তি কাটেনি।
এক দশক আগে জিপিএর সঙ্গে বিষয়ভিত্তিক নম্বরও প্রকাশ
গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর পর কয়েক বছর ধরে শিক্ষার্থীদের ফলাফল প্রকাশ করা হলেও বিষয়ভিত্তিক প্রকৃত নম্বর জানার সুযোগ ছিল না। ফলাফলে কোন বিষয়ে কত গ্রেড পয়েন্ট পেয়েছেন, তা জানা গেলেও সেই গ্রেডের বিপরীতে ঠিক কত নম্বর পেয়েছেন, তা জানতে পারতেন না শিক্ষার্থীরা। ফলে একই জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে কার প্রকৃত ফল ভালো, তা আলাদা করে বোঝার সুযোগও সীমিত ছিল।
বিশেষ করে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় দেশসেরা শিক্ষার্থী কারা, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে নম্বরের ব্যবধান থাকলেও তা প্রকাশ্যে আসত না। অভিভাবকদের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়। কেউ কেউ লিখিত আবেদন করেও সন্তানের সব বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বর জানতে পারেননি। অর্থাৎ, ফলাফলে গ্রেড প্রকাশ করা হলেও শিক্ষার্থীর প্রকৃত নম্বর জানার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।
এ পরিস্থিতিতে ২০১৫ সালে এক এইচএসসি পরীক্ষার্থীর করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ঢাকা শিক্ষা বোর্ডকে আবেদনকারীদের নম্বরপত্র বা ট্রান্সক্রিপ্ট দেওয়ার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৬ সালের ৬ আগস্ট ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান জানান, এসএসসি, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএর পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক প্রাপ্ত নম্বরও প্রকাশ করা হবে। ওই বছরের ১৮ আগস্ট প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমানের ফল থেকে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে বিষয়ভিত্তিক নম্বর জানার সুযোগ পান।
এর ফলে কোন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে কত নম্বর পেয়েছেন, তা জানার সুযোগ তৈরি হয়। একই গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নম্বরের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে বোর্ডের দেওয়া একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্টে বিষয়ভিত্তিক গ্রেড পয়েন্ট ও মোট নম্বর থাকলেও লিখিত, নৈর্ব্যক্তিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার বিস্তারিত নম্বর অনলাইনে দেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে একদিকে ফলাফলের স্বচ্ছতা ও শিক্ষার্থীদের নিজস্ব অর্জন জানার সুযোগ বাড়ে, অন্যদিকে নম্বরের তুলনাভিত্তিক প্রতিযোগিতারও নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে কে বেশি নম্বর পেয়েছেন, সেই হিসাব সামনে আসতে শুরু করে। ফলে গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর সময় নম্বরনির্ভর প্রতিযোগিতা কমানোর যে লক্ষ্য ছিল, বিষয়ভিত্তিক নম্বর প্রকাশের পর সেই প্রতিযোগিতা আবার নতুনভাবে আলোচনায় ফিরে আসে।
মূল্যায়ন পদ্ধতির দর্শন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন
দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে বিশ্বে পরীক্ষার ফল মূল্যায়নের পদ্ধতি নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসেছে। বাংলাদেশেও বিভাগভিত্তিক ফল থেকে গ্রেডিং, পরে জিপিএ এবং সর্বশেষ জিপিএর পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক নম্বর প্রকাশের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে ছিল শিক্ষার্থীদের অর্জনকে আরও যথাযথভাবে মূল্যায়নের চেষ্টা। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় জিপিএ ও নম্বর—দুই ধরনের ফল একসঙ্গে প্রকাশের ফলে মূল্যায়নের উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
আরও খবর: ছয় মাসের বকেয়াসহ ১২ মাসের টাকা চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়
একদিকে শিক্ষার্থীর প্রকৃত নম্বর জানার অধিকার ও ফলাফলের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ; অন্যদিকে নম্বরের ব্যবধানকে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা ও মানসিক চাপও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তাই প্রশ্ন উঠছে, জিপিএর পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক নম্বর প্রকাশের বর্তমান ব্যবস্থা কি শিক্ষার্থীর সামগ্রিক অর্জনকে যথাযথভাবে তুলে ধরছে, নাকি পুরোনো নম্বরনির্ভর প্রতিযোগিতাকেই নতুন রূপে ফিরিয়ে আনছে?
মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কারে এ দুই দিক বিবেচনায় নিয়ে নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন। কারণ ফল প্রকাশের পদ্ধতি কেবল শিক্ষার্থীর অর্জনের হিসাব নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থায় মেধা, সাফল্য ও মূল্যায়ন সম্পর্কে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকা প্রয়োজন। কারণ, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো পরীক্ষানির্ভর। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রেও এসএসসি ও এইচএসসির ফল বিবেচনা করা হয়। তবে প্রতিযোগিতা যেন অসুস্থ হয়ে না ওঠে।
তিনি বলেন, এছাড়াও অসুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি বদলাতে শুধু পরীক্ষার ফলনির্ভর মূল্যায়নব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে। কারণ এক দিনের পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধা যাচাই সম্ভব নয়। শ্রেণিকক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়ন, অধ্যায়ভিত্তিক পরীক্ষা, শিক্ষকের পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণামূলক কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর দক্ষতা যাচাই করা প্রয়োজন। জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষাব্যবস্থায় এ ধরনের বিকল্প মূল্যায়নের উদাহরণ রয়েছে।
আমাদের সমাজেও সাফল্যের ধারণা পরিবর্তন করা জরুরি উল্লেখ করে অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, সবাইকে চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা বিসিএস কর্মকর্তা হতে হবে এমন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একজন চিকিৎসক যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একজন কৃষক বা দোকানদারও তেমনি গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক পেশার মানুষের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কারণ শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু ভালো ফল বা মর্যাদাপূর্ণ চাকরি পাওয়া নয়, বরং ভালো মানুষ তৈরি করা। তাই প্রতিযোগিতা থাকবে, তবে তা হতে হবে সুস্থ ও ইতিবাচক। ফলাফলের পেছনে মরিয়া না হয়ে শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশে গুরুত্ব দিতে হবে।