শিক্ষক সংকট-শ্রেণিবিমুখতা ও ডিভাইসে আসক্তিসহ ফল ধসের ৬ কারণ
চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ শিক্ষার্থী, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। এর আগে ২০০৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিকের এই পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ। এরপর আর কখনও এবারের মতো খারাপ ফল আর হয়নি।
এবার শুধু পাসের হার নয়, জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতেও ধস নেমেছে।উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে পা রাখতে যাওয়া এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪০ হাজার ৮৪ জন জিপিএ ৫ পেয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালে এ পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ; তাদের মধ্যে ৬৯ হাজার ৯৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছিল। আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) প্রকাশিত ২০২৬ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ফলাফল বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
উচ্চ মাধ্যমিকে এবারের পরীক্ষায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২০ সালে অটোপাস, ২০২১ থেকে ২০২৫—৫ বছর পর এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা হওয়ায় পাসের হারে প্রভাব পড়েছে। তবে এই ফল ধসের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় অমনোযোগী ও কলেজ ফাঁকি, কোচিং নির্ভরতা, ডিভাইসে আসক্তি বেড়ে যাওয়া, ইংরেজি ও আইসিটির ফলে ধাক্কা, দক্ষ শিক্ষক সংকট—এসব কারণও দায়ী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন: এইচএসসির ফল হলো, পাস ও ফেল করা শিক্ষার্থীদের এখন করণীয় কী?
এবচার পাসের হার কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। ফলাফল প্রকাশ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ফলাফলের এমন পতন বা বিপর্যয় কখনোই প্রশংসনীয় হতে পারে না। শিক্ষার্থীদের শিখন-অর্জন, পাঠদান পদ্ধতি, অভিভাবকদের ভূমিকা ও শিক্ষার পরিবেশে নানা ঘাটতি রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর দায় চাপালে হবে না। শিক্ষক, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত ও কার্যকর পাঠদানের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের বিগত দিনের শিক্ষকসংকটও রয়েছে, আমাদের নিয়োগ দেওয়ার বাধা রয়েছে। অর্থাৎ এত শিক্ষক একসঙ্গে নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না, পিএসসি দিতে পারছে না। গত ১৭ বছরের ব্যাকলগ রয়েছে।
২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম পাস
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বশেষ ২০০৪ সালে পাসের হার এ বছরের তুলনায় কম ছিল। সেবার ৪৭ দশমিক ৭৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিলেন। এরপর গত ২২ বছরে পাসের হার কখনো এর নিচে নামেনি। ২০০৫ সালে পাসের হার বেড়ে ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছায়। পরবর্তী বছরগুলোতে ফলাফল ক্রমাগত বেড়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৬ সালে প্রায় ৬৪ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৬৪ শতাংশের বেশি এবং ২০০৮ সালে প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেন। ২০০৯ সালে ৭০ শতাংশের কিছু বেশি, ২০১০ সালে ৭২ শতাংশ, ২০১১ সালে ৭২ শতাংশ, ২০১২ সালে ৭৬ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৭১ শতাংশ, ২০১৪ সালে প্রায় ৭৬ শতাংশ, ২০১৫ সালে প্রায় ৬৬ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ৭২ শতাংশ পাস করেন।
এরপর ২০১৭ সালে ৬৮ দশমিক ৯১ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ২০১৯ সালে প্রায় ৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেন। ২০২০ সালে করোনার কারণে ‘অটোপাসে’ শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হন। ২০২১ সালে ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ, ২০২২ সালে ৮৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেন।
শিক্ষক, অভিভাবক এবং সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদেরও ইংরেজি, আইসিটিসহ অন্যান্য বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে-অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী, চেয়ারম্যান, রাজশাহী শিক্ষাবোর্ড
তবে ২০২৫ সালে জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পাসের হার কমে যায় প্রায় ১৮ শতাংশ। ২০২৫ সালে মাত্র ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেন।
তবে ২০২৬ সালে পাসের হার আরও কমেছে। এ বছর প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৮ জন ফেল করেছেন। ১১টি বোর্ডে মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন, অর্থাৎ ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
ইংরেজি ও আইসিটির ফলে ধাক্কা
বিষয়ভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, ইংরেজি ও আইসিটিতে তুলনামূলক পাসের হার কম। অন্যদিকে, বাংলা ও পদার্থবিজ্ঞানে পাসের হার বেশি। বরিশাল শিক্ষাবোর্ডে অধিকাংশ বিষয়ে পাসের হার তুলনামূলক কম।
ইংরেজিতে পাসের হার সবচেয়ে বেশি ঢাকা বোর্ডে, ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। এ ছাড়া চট্টগ্রামে ৬৫ দশমিক ৭৭, সিলেটে ৬৫ দশমিক ৮৪, কুমিল্লায় ৬৪ দশমিক ৮৩, ময়মনসিংহে ৫৯ দশমিক ১১, দিনাজপুরে ৫৬ দশমিক ০৫, রাজশাহীতে ৫৬ দশমিক ০১, যশোরে ৫৪ দশমিক ৯৫ এবং বরিশালে ৫৪ দশমিক ০৮ শতাংশ।
আইসিটিতে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭৬ দশমিক ১৯ শতাংশ। সিলেটে ৭৪ দশমিক ২০, চট্টগ্রামে ৭৩ দশমিক ৩৬, কুমিল্লায় ৭৩ দশমিক ০১, দিনাজপুরে ৭২ দশমিক ৬৪, ময়মনসিংহে ৭১ দশমিক ৩৯, রাজশাহীতে ৬৮ দশমিক ৭৪, যশোরে ৬৭ দশমিক ৮৪ এবং বরিশালে ৬৬ দশমিক ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন।
দক্ষ শিক্ষক সংকট
কলেজগুলোতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট প্রকট। যেসব শিক্ষক বিশেষায়িত এ বিষয়গুলোর ক্লাস নিচ্ছেন, তাদের অধিকাংশই অন্য বিষয়ের ওপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। ফলে ক্লাসে তারা কার্যকরভাবে শিক্ষার্থীদের শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। পাশাপাশি কর্মরত শিক্ষকদের প্রায় ৪০ শতাংশের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ ছাড়া যারা শিক্ষকতা করছেন, তারা মেধাবী হলেও শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারছেন কম।
করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল-কলেজে আসার আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তাদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার ফলাফলে- মাজেদা বেগম, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, দেশের ২ হাজার ৬২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক নেই। বর্তমানে ইংরেজি বিষয় যেসব শিক্ষক পড়াচ্ছেন, তাদের সংখ্যা ৬৪ হাজার ২৫৩ জন। তাদের মধ্যে ৫১ হাজার ৩৬০ জনের ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক-স্নাতকোত্তর বা উচ্চতর কোনো ডিগ্রি নেই।
অন্যদিকে দেশের ৩ হাজার ৮৬১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আইসিটি বিষয়ের কোনো শিক্ষক নেই। তাদের কেউ ইসলাম শিক্ষা, কেউ ইতিহাসে; আবার কেউ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডিগ্রিধারী। পাশাপাশি প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই।
যা বলছেন শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিবরা
রাজশাহী শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শামীম আরা চৌধুরী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কোভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে ছেলে-মেয়েরা স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ করেছিল এবং পরবর্তীতে শর্ট সিলেবাস বা অটোপাসের মতো বিভিন্ন কারণে তাদের পড়ালেখার ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছিল, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না গিয়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে শিট ও পড়া মুখস্থ করার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা মূল পড়ালেখা থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে। এতে এবারের ফলাফল বিপর্যয় ঘটেছে।
উত্তরণের পথ বাতলে দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সমাজের সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের ঠিকমতো নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদেরও ইংরেজি, আইসিটিসহ অন্যান্য বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কোচিংনির্ভর পড়াশোনা পরিহার করে প্রতিষ্ঠাননির্ভর পড়াশোনার দিকে শিক্ষার্থীরা মনোযোগী হলে এ ফল থেকে উত্তরণ সম্ভব।
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ. জেড. এম. রেজাউল করিম খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার কিছুটা কমেছে। পরীক্ষার ফলাফল নিখুঁত ও নির্ভুল করার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে কিছুটা চ্যালেঞ্জও ছিল।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা ক্লাস বিমুখ। তারা আগের মতো ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিত হচ্ছে না। ক্লাস না করার কারণে অনেকেই ক্লাসের পড়া থেকে পিছিয়ে পড়ছে। যেমন: ৩৫-৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসে উপস্থিত থাকে, বাকিরা থাকে না। প্রতিষ্ঠানমুখী পড়াশোনা ছেড়ে কোচিং বা গাইড বইয়ের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা বাড়ায় শিক্ষার প্রকৃত মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। অভিভাবকরাও মনে করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কোচিং ভালো। অথচ এটা ভুল ধারণা।
তিনি আরও বলেন, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজি, আইসিটি এবং অন্যান্য বিষয়ের ওপর পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক এবং বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক ঘাটতি রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আইসিটি বা অন্যান্য বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি, যা ফলাফলের ওপর কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অধ্যাপক এ. জেড. এম. রেজাউল করিম খান বলেন, শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করতে হবে এবং ক্লাস চলাকালীন সময়ে তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক এবং অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা কোচিং বা গাইডনির্ভর না হয়ে প্রতিষ্ঠাননির্ভর পড়াশোনায় মনোযোগী হয়।
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমার পর্যবেক্ষণ হলো সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী উপস্থিতি ২০-৩০ শতাংশ। সে অনুযায়ী বলতে পারেন এবারের ফলাফল ভালোই হয়েছে। কারণ এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
তিনি আরও বলেন, শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি বাড়াতে হবে। তাহলে আশা করি, আগামীতে ফলাফল ভালো হবে। ক্লাসে উপস্থিতি বাড়াতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এ বছরের পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের কাছে একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল। কারণ দীর্ঘ ৫ বছর পর শিক্ষার্থীরা পূর্ণ সিলেবাসে পরীক্ষা দিয়েছে। এর আগের দীর্ঘদিন ১ বছর ছিল অটো পাস এবং পরবর্তী ৪ বছর ছিল পূর্ণ সিলেবাসে ছিল না। যে কারণে এই পূর্ণ সিলেবাস কভার করা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। আমাদের শিক্ষকরা ক্লাসে পুরো সিলেবাস শেষ করতে পারেনি।
ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা অতিমাত্রায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করছে। ফলে তারা পাঠ্যবইয়ের অভ্যাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহার দরকার আছে, তবে সেটা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে হতে হবে। দিন দিন মা-বাবা উভয়েই কর্মজীবী হয়ে পড়ছেন, ফলে সন্তানদের প্রতি পূর্ণমাত্রায় মনোযোগ বা তদারকি করতে পারছেন না তারা।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষালয়গুলোকে আনন্দের জায়গায় রূপান্তর করতে হবে এবং কেবল পাঠ্যপুস্তক নয়, বরং কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিস, স্পোর্টস ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে তাদের আকৃষ্ট করে শিক্ষাঙ্গনমুখী করতে হবে। শিক্ষার্থীরা বিগত কয়েক বছর ধরে ক্লাসমুখী হচ্ছে না এবং শ্রেণিকক্ষে আসছে না। এটি না আসার প্রধান কারণ অভিভাবক ও সবাইকে মিলে খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষমুখী করতে হবে এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের পাশাপাশি পড়াশোনার পাঠের জন্য তাদের নিয়োজিত রাখতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, পদাধিকারী ও উপাধ্যক্ষ সবাইকে নিয়ে অভিভাবক সভা ডেকে শিক্ষার্থীদের সফলতার জন্য এওয়ারনেস তৈরি করতে হবে এবং মনিটরিং বাড়াতে হবে।
যা বলছেন শিক্ষক-অভিভাবকরা
ফলাফল কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বলেন, করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্কুল-কলেজে আসার আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে তাদের পড়াশোনা ও পরীক্ষার ফলাফলে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের সরাসরি পাঠদান, পারস্পরিক আলোচনা এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের যে গুরুত্ব রয়েছে, বাসায় বসে পড়াশোনার মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়।
শিক্ষার্থীদের আবার শ্রেণিকক্ষকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা জরুরি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের নিজেদেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোথাও আস্থার ঘাটতি, আবার কোথাও শিক্ষার্থীদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পরিবেশের প্রভাব রয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
শিক্ষার্থী স্বার্থরক্ষাকারী সংগঠন অভিভাবক ঐক্য ফোরাম এর সভাপতি মো. জিয়াউল কবির দুলু ও সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম মিয়া এক যুক্ত বিবৃতিতে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের বিপর্যয়ে গভীর উদ্বেগ উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেন, এই ফলাফলে সারাদেশের অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন ও হতাশ। শিক্ষক সমাজের একাগ্রতা ও শিক্ষার মান উন্নয়নে আন্তরিকতা অভাব এবং পরীক্ষার্থীদের লেখা পড়ার প্রতি অবহেলাই এ ধরনের ফলাফল বিপর্যয়ে কারণ।
তিনি বলেন, কোনো বাবা-মা ও অভিভাবকেরই প্রত্যাশা নয় তার সন্তান পরীক্ষায় অকৃতকার্য হোক। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ২ বছর পড়ানোর পর কোন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে এবং পরবর্তীতে আবার পরীক্ষায় অংশ নিতে আর্থিক ভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মানসিক চাপে অনেকেই পড়াশোনা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ফলে এরা নিয়মিত শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে।
নেতৃদ্বয় ফেল করা শিক্ষার্থীকে এক মাসের মধ্যে ফেল করা বিষয়ে পুনরায় পরীক্ষা নেয়ার দাবি জানান। পাশাপাশি অকৃতকার্য পরীক্ষার্থীদেরকে আরও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পরামর্শ দেন।
তারা আরও বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে পরীক্ষা ব্যবস্থা প্রায় ধ্বংস করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার সে অবস্থা থেকে উত্তরণের চেষ্টা চালাচ্ছেন বিধায় প্রকৃত নম্বর প্রাপ্তির ভিত্তিতেই ফলাফল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেছে। নেতৃদ্বয় শিক্ষার্থীদের লেখা পড়ার দিকে আরও বেশি মনোনিবেশের জন্য কঠোর পরিশ্রম করার পরামর্শ দিয়ে পরীক্ষার ফলাফল বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব বলে মনে করেন এবং শিক্ষকদের কে শ্রেণিতে মনোযোগী ও আন্তরিকতা সাথে পাঠদানের অনুরোধ জানান।