১২ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫০

প্রতিবন্ধিতা জয় করে জিপিএ-৫, ইয়াসিরের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নে বাধা দারিদ্র্য

পড়ার টেবিলে ইয়াসির ইসলাম নিরব  © টিডিসি

সারা শরীর অবশ, ডান হাতও কাজ করে সামান্য—তবু প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ার ইয়াসির ইসলাম নিরব। অদম্য এই তরুণের স্বপ্ন ডাক্তার হয়ে অসহায় মানুষের সেবা করা। তবে সেই স্বপ্ন পূরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবারের দারিদ্র্য।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়নের পলাশতলী গ্রামে নিরবদের বাড়ি। তার বাবার নাম সিরাজুল ইসলাম। পেশায় দরিদ্র কৃষক। মা গৃহিণী। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে নিরব বড়।

পারিবারিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে নিরব বলে, ‘আমার বাবা দরিদ্র কৃষক, মা গৃহিণী। অল্প জমির চাষাবাদে চলছে আমাদের কষ্টের সংসার। পরিবারে আমি বড় সন্তান। আমার ছোট দুই বোনের মধ্যে ফারজানা আক্তার সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। অপরজন ছোট সাদিয়া আক্তার। সে বর্তমানে শিশু শ্রেণিতে পড়ছে। এর মধ্যে আমার উচ্চ শিক্ষার খরচ চালানো আমার দরিদ্র বাবা-মায়ের জন্য অনেক কষ্টের।’

এ সময় শিক্ষাজীবনের করুণ কষ্টের স্মৃতিচারণা করে ইয়াসির বলে, ‘প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় আমার বাবা আমাকে কোলে করে স্কুলে দিয়ে আসত। এরপর পলাশতলী আমিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় কখনো আমার বাবা, কখনো আমার বন্ধুরা স্কুলে নিয়ে যেত। আজকে আমার সাফল্যের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। তবে আমার বাবা-মায়ের মুখের হাসি আমাকে কষ্টের জীবনের সব দুঃখ ভুলিয়ে দিয়েছে। এখন আমার স্বপ্ন, আমি ডাক্তার হতে চাই।’

উচ্চশিক্ষার জন্য নিরব প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা কামনা করে আরও বলে, ‘আমি লেখাপড়া করে ডাক্তার হতে চাই। ডাক্তার হয়ে আমার মতো শারীরিক প্রতিবন্ধী ও অসহায় মানুষদের পাশাপাশি দেশবাসীর সেবা করতে চাই। কিন্তু আমার বাবা-মায়ের সামর্থ্য নেই আমাকে উচ্চ শিক্ষায় পড়ানোর। এ অবস্থায় শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আকুল আবেদন, দারিদ্র্যে  কারণে আমার লেখাপড়া যেন বন্ধ না হয়। আমার স্বপ্ন যেন থেমে না যায়, ডাক্তার হয়ে আমি আমার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’

জানা গেছে, জিপিএ-৫ শিক্ষার্থী ইয়াসির ইসলাম নিরব উপজেলার পলাশতলী আমিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের নিয়মিত শিক্ষার্থী। তার এ সাফল্যে খুশি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।

ইয়াসিরের বাবা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ছেলেকে নিয়ে আমাদের সব সময়ই চিন্তা হতো। শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে ওকে অনেক কষ্টের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা করতে হয়েছে। কিন্তু ও কখনো হাল ছাড়েনি। আজ সে জিপিএ-৫ পেয়েছে, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের। কিন্তু ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার মতো সামর্থ্য আমার নেই। এই জন্য আমি একজন দরিদ্র বাবা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সাহায্য চাই। আমার ছেলের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে চাই।’

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও নিরব পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী ছিল। অন্যদের চেয়ে তাকে কিছুটা বেশি পরিশ্রম করতে হয়েছে। কিন্তু সে কখনো নিজের সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেনি। নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে চলা এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসই তাকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে।
আমার বিদ্যালয় থেকে ইয়াসির লেখাপড়া করে জিপিএ-৫ পেয়েছে এটা গর্বের। সে ভালো করুক। তার স্বপ্নপূরণ হোক।’

ফুলবাড়ীয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানান, প্রতিবন্ধী নিরবে সাফল্য প্রশংসনীয়। উপজেলা প্রশাসন তার লেখাপড়া চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করবে।