১১ আগস্ট ২০২৬, ১৮:০৩

১০৫ বছরের ঐতিহ্যে ঘটেনি ছন্দপতন, দাখিলে বৃহত্তর নোয়াখালীতে প্রথম টুমচর মাদ্রাসা

লক্ষ্মীপুরের টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা  © সংগৃহীত ও সম্পাদিত

১০৫ বছরের ঐতিহ্য, গৌরব আর সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবারও ছন্দপতন ঘটেনি লক্ষ্মীপুরের টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসায়। এবারের দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে প্রথম স্থান অর্জন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ৮৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে ৮৭ জন। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ২২ জন।

ফল প্রকাশের পর শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের উল্লাস করতে দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এবারের ফলাফলের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা আরও একবার প্রমাণিত হয়েছে।

১৯২১ সালে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার টুমচর গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয় টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা। প্রতিষ্ঠার প্রায় তিন দশক পর ১৯৫০ সালে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয় প্রতিষ্ঠানটি। প্রথম ব্যাচে ‘আমিন’ নামে এক শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সারাদেশে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেন। পরের ব্যাচেই গোলাম মোস্তফা নামে আরেক শিক্ষার্থী সারাদেশে প্রথম স্থান অর্জন করেন। দাখিল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের শুরুতেই প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনের ঘটনায় তৎকালীন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।

এরপর ১৯৫২ সালে আলিম পরীক্ষার প্রথম ব্যাচে ছয়জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে সবাই ফার্স্ট ডিভিশন অর্জন করেন। ১৯৫৬ সালে ফাজিল পরীক্ষার প্রথম ব্যাচে অংশ নেন মাকসুদ নামে এক শিক্ষার্থী। তিনিও প্রথম ব্যাচেই সারাদেশে চতুর্থ স্থান অর্জন করেন।

তবে প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ১৯৭১ সাল। স্বাধীনতার বছর মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল, চার স্তরের পরীক্ষাতেই প্রথম স্থান অর্জন করেন টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। একই বছরে চার স্তরের পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সবাই একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল ও নজিরবিহীন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

১৯৭১ সালে দাখিল পরীক্ষায় সারাদেশে প্রথম হন হারুন আল মাদানী। পরবর্তীতে তিনি দীর্ঘদিন টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই বছর আলিম পরীক্ষায় প্রথম হন মনোয়ার নামে এক শিক্ষার্থী। ফাজিল পরীক্ষায় প্রথম হন আব্দুল্লাহ, যিনি পরবর্তীতে লক্ষ্মীপুর আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

একই বছর রায়পুর আলিয়া মাদ্রাসা থেকে কামিল পরীক্ষায় সারাদেশে প্রথম হন রুহুল আমিন। তিনিও টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থী ছিলেন। ফলে ১৯৭১ সালে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল—চার স্তরের পরীক্ষায় প্রথম হওয়া শিক্ষার্থীদের সবাই টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।

প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টদের মতে, ১৯৭১ সালের এই সাফল্য বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার ইতিহাসে একটি বিরল ও নজিরবিহীন অধ্যায়। এরপরও বিভিন্ন সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। শতবর্ষ পেরিয়ে ১০৫ বছরে পদার্পণ করা টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা 

এখনও সেই ঐতিহ্য ও সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে।

২০২২ সালের ১৬ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. ইদ্রিস টুমচরী। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পরও প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। এবারের দাখিলের ফলাফলে বৃহত্তর নোয়াখালী অঞ্চলে প্রথম স্থান অর্জন সেই ধারাবাহিকতারই নতুন সংযোজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইসিটি শিক্ষক খোরশেদ আলম বলেন, টুমচর মাদ্রাসার সাফল্যের পেছনে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা রয়েছে। নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের আন্তরিকতা এবং শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জিত হচ্ছে। পাশাপাশি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করতে আমরা কাজ করছি। ভবিষ্যতেও এই সাফল্যের ধারা ধরে রাখতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আরও আন্তরিকভাবে কাজ করবে।

মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক মো. ওসমান হারুন (বিএসসি) বলেন, টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার পড়াশোনার মান ও দীর্ঘদিনের সুনামের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এখানে পড়াতে পাঠান। আমরা তাদের সন্তানদের অত্যন্ত যত্ন ও আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করি। অধ্যক্ষসহ প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষক দায়িত্বের প্রতি আন্তরিক। শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের পাশাপাশি তাদের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার বিষয়েও আমরা গুরুত্ব দিয়ে কাজ করি।

অধ্যক্ষ মো. ইদ্রিস টুমচরী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই টুমচর ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসা দেশজুড়ে সুনাম ও সাফল্য ধরে রেখেছে। এ বছরও শিক্ষার্থীরা ভালো ফলাফল করেছে। ভবিষ্যতেও এ সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে আমরা কাজ করে যাব।