এসএসসিতে আরও কমল পাসের হার, নেপথ্যে ৫ কারণ
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার আরও কমেছে। এবার দেশের মোট ১১টি শিক্ষাবোর্ডে গড় পাসের হার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ, যা গতবারের তুলনায় ৬ দশমিক ২০ শতাংশ কম। ২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। একইসঙ্গে কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন, গতবার এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। সোমবার (১০ আগস্ট) ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়।
ফলাফল বিশ্লেষণ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে পাসের হার কমার পেছনে প্রধানত পাঁচটি কারণ উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে—খাতা মূল্যায়নে আগের তুলনায় কঠোরতা, গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা, মানবিক বিভাগের তুলনামূলক খারাপ ফল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি এবং শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভর ও গাইডনির্ভর পড়াশোনা। এর সঙ্গে শিক্ষক সংকট, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার অভাব এবং মানসম্মত মূল্যায়ন পদ্ধতির ঘাটতিকেও দায়ী করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
মূলত, ‘খাতা দেখার উদার নীতি’ থেকে সরে আসার পর পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রস্তুতি ও দুর্বলতার চিত্র কিছুটা স্পষ্ট হচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে আগের মতো নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার কোনো নির্দেশনা বা চাপ ছিল না বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এবারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় যে পারফরম্যান্স করেছে, তার ভিত্তিতেই ফলাফল এসেছে বলে মনে করছেন তারা।
এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর সেই বাস্তবতাই আরও স্পষ্ট হয়েছে। সচিবালয়ে ফল নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, ‘মন খুলে গান গাওয়া যায়, মন খুলে নম্বর দেওয়া যায় না।’
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে বিএনপি। নতুন সরকারের অধীনে এসএসসি ও সমমানের মধ্য দিয়ে প্রথম পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, এসএসসি ও সমমানের লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের কথা। সে হিসাবে গত ২০ জুলাইয়ের মধ্যে ফল প্রকাশ হওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের প্রায় তিন সপ্তাহ পর সোমবার ফল প্রকাশ করা হয়েছে।
এ বছর দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। তাদের মধ্যে পাস করেছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭ সালের পর এবারই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার সবচেয়ে কম। ২০০৭ সালে পাসের হার ছিল ৫৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এরপর প্রায় দুই দশকে আর কখনো পাসের হার এত নিচে নামেনি।
২০২১ সালে দেশে রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করেছিল। এরপর কয়েক বছরের ব্যবধানে পাসের হার ধারাবাহিকভাবে কমে এবার ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
এবার পাস করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা মোট উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর ১০ দশমিক ২৪ শতাংশ। গতবারের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২২ হাজার ৩৫৬ জন।
কারিগরিতে বড় ধস
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন ভোকেশনাল পরীক্ষায় এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার ১৫ শতাংশীয় পয়েন্টের বেশি কমেছে। এবার পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ২০ শতাংশে। গত বছর এ হার ছিল ৭৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮১ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে কারিগরি শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ এই পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
দাখিলেও ফলের অবনতি
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন দাখিল পরীক্ষাতেও বড় ধরনের অবনতি হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশীয় পয়েন্ট। এবার পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৫ দশমিক ৪৯ শতাংশে, যা গত বছর ছিল ৬৮ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
শুধু পাসের হার নয়, ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও কমেছে। একই সঙ্গে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি—এমন মাদ্রাসার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
মানবিকে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে
৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের গ্রুপভিত্তিক ফলাফলেও বড় ধরনের বৈষম্য দেখা গেছে। বিজ্ঞান বিভাগে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছে। এ বিভাগে মোট উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থী ৪ লাখ ৫৭ হাজার ১৮৮ জন, পাসের হার ৮০ দশমিক ৬৪ শতাংশ।
অন্যদিকে মানবিক বিভাগে মোট উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থী ৩ লাখ ১ হাজার ১৭৪ জন। এ বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪৮ দশমিক ৭৪ শতাংশ। গতবার মানবিক বিভাগের পাসের হার ছিল ৫২ দশমিক ৯৫ শতাংশ।
ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে মোট উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থী ১ লাখ ৪১ হাজার ২৪৮ জন। এ বিভাগে পাসের হার ৬৪ দশমিক ২৯ শতাংশ। ফলে বিজ্ঞান বিভাগের তুলনায় মানবিক বিভাগের ফলাফলের ব্যবধানও এবার আরও স্পষ্ট হয়েছে।
গণিত-ইংরেজিতে বেশি দুর্বলতা
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে গণিত ও ইংরেজিতে তুলনামূলকভাবে খারাপ ফল করেছে শিক্ষার্থীরা। প্রায় ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে পাস নম্বর তুলতে পারেনি। অন্যদিকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে দেশের সব বোর্ডে তুলনামূলকভাবে বেশি শিক্ষার্থী পাস করেছে।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকা বোর্ডে ইংরেজিতে ৭৮ দশমিক ৪০ শতাংশ এবং গণিতে ৮২ দশমিক ৮৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে। রাজশাহী বোর্ডে ইংরেজিতে ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ ও গণিতে ৭৭ দশমিক ১৭ শতাংশ, কুমিল্লায় ইংরেজিতে ৮১ দশমিক ২৯ শতাংশ ও গণিতে ৮১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যশোরে ইংরেজিতে ৭১ দশমিক ৮৪ শতাংশ ও গণিতে ৮৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ, চট্টগ্রামে ইংরেজিতে ৭২ দশমিক ২৭ শতাংশ ও গণিতে ৮০ দশমিক ০৫ শতাংশ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে।
বরিশাল বোর্ডে ইংরেজিতে ৬৯ দশমিক ২৪ শতাংশ ও গণিতে ৭৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ, সিলেটে ইংরেজিতে ৬৯ দশমিক ১১ শতাংশ ও গণিতে ৭৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ, দিনাজপুরে ইংরেজিতে ৭২ দশমিক ৯১ শতাংশ ও গণিতে ৭১ দশমিক ০৫ শতাংশ এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ ও গণিতে ৬৯ দশমিক ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।
অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে ৭৯ দশমিক ২১ শতাংশ ও গণিতে ৬৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে ৯৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ ও গণিতে ৭০ দশমিক ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।
নেপথ্যে যত কারণ বলছেন শিক্ষক ও শিক্ষাবিদেরা
এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমার পাশাপাশি গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার কারণও খুঁজে দেখছেন শিক্ষক ও শিক্ষাবিদেরা। তাদের মতে, শুধু প্রশ্ন কঠিন হয়েছে বা শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করেনি—এমন সরল ব্যাখ্যায় এবারের ফলাফলকে দেখা ঠিক হবে না। প্রশ্নপত্রের মান, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি, শিক্ষক সংকট এবং মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
কারিকুলাম নয়, বইনির্ভর প্রশ্নে মূল্যায়ন হচ্ছে শিক্ষার্থীদের
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার স্ট্রাকচারটাই ঠিক নেই, নিয়মও ঠিকমতো হচ্ছে না, মূল্যায়ন পদ্ধতিও ঠিক নেই। জাতীয় শিক্ষাদর্শ, শিক্ষানীতি ও শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষা কার্যক্রমই বলে দেবে মূল্যায়ন কেমন হবে, মূল্যায়ন পদ্ধতি কেমন হবে। কিন্তু সেখানে এসবের কিছুই নেই।
তিনি বলেন, এখন সরকার যেভাবে যেটা মনে করছে, সেভাবেই এগুলো করা হচ্ছে এবং বোঝার ওপর শাকের আঁটির মতো নিত্যনতুন সাবজেক্ট ও পদ্ধতি ইন্ট্রোডিউস করা হচ্ছে। স্মার্ট টিচার, স্মার্ট বোর্ড—এ ধরনের বিষয় নিয়ে আলাপ হচ্ছে। কিন্তু মূল বিষয় হচ্ছে, আমরা যেটাকে রেজাল্ট বলি, সেই রেজাল্টটা কীভাবে হচ্ছে, সেটি।
দীর্ঘদিন ধরে ফলাফল পর্যবেক্ষণ করে আসছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ফলাফলের যে হেরফের, সেটি আসলে নির্ভর করে যে টেস্ট বা পরীক্ষাটি নেওয়া হচ্ছে, সেটি কতটা মানসম্পন্ন তার ওপর। যেকোনো গবেষণা কিংবা সার্ভের ক্ষেত্রে আমরা যেটাকে আদর্শ বা স্ট্যান্ডার্ড বলি, সেভাবে কি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে—এটাই প্রথম প্রশ্ন।
‘প্রশ্নপত্রটি কি আদর্শ ছিল? স্ট্যান্ডার্ড ছিল? এটা কঠিন না সহজ—সেটি বিষয় নয়। প্রশ্নটি একেবারে স্ট্যান্ডার্ড ছিল কি না, তার ভ্যালিডিটি ও রিলায়েবিলিটি ঠিক ছিল কি না—এগুলো দেখতে হবে।’
তার মতে, দ্বিতীয় বিষয় হলো মূল্যায়ন। মূল্যায়নটা সঠিকভাবে হয়েছে কি না, সেটিও দেখতে হবে। ‘আমরা তো দেখেছি, চায়ের দোকানে বসে খাতা দেখা হচ্ছে। এমনকি শিক্ষার্থীদের দিয়েও খাতা দেখানো হয়েছে। এসব আমরা দেখেছি। প্রচুর পরিমাণে অনিয়মও আমরা দেখেছি। মূল বিষয় হচ্ছে, প্রশ্নটা কেমন ছিল এবং মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোন মানদণ্ডের আলোকে সেটি মূল্যায়ন করা হয়েছে।’
অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, প্রশ্ন সহজ না কঠিন—এটা মূল বিষয় নয়। প্রশ্ন করার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। ‘আমি একেবারে দায়িত্ব নিয়ে বলছি, আমাদের এখানে আসলে প্রশ্ন করা হয় না।’
ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, প্রশ্ন করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু বই দেখে প্রশ্ন করা হচ্ছে। যেমন, বই থেকে প্রশ্ন করা হলো—‘হৈমন্তীর বাবার নাম কী?’ অথবা ‘হৈমন্তীর মায়ের চরিত্র বিশ্লেষণ করো।’ এ ধরনের বিষয়কে প্রশ্ন বলা যায় না। প্রশ্ন করতে হয় অন্যভাবে।
তার মতে, প্রশ্ন করতে হবে কারিকুলাম থেকে। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা একটি ক্লাস শেষ করার পরে কী কী শিখবে, সেটি কারিকুলামে নির্ধারিত থাকে। এসএসসির ক্ষেত্রে দশম শ্রেণি শেষ করার পরে শিক্ষার্থীরা কী কী শিখবে—এর একটি চার্ট বা গাইডলাইন থাকে। সেখানে বলা থাকে, তারা কী পারবে, কী লিখতে পারবে, কী বিশ্লেষণ করতে পারবে, কী বর্ণনা করতে পারবে। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কতটুকু পারবে, গণিতের ক্ষেত্রে কতটুকু পারবে, ইংরেজির ক্ষেত্রে কতটুকু লিখতে ও বিশ্লেষণ করতে পারবে, কীভাবে যুক্তি বা আর্গুমেন্ট দাঁড় করাতে পারবে—এসব নির্ধারিত থাকে।
কিন্তু সেখান থেকে প্রশ্ন না করে বই থেকে প্রশ্ন করা হয়। এর কারণে অনেক ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। কারও যদি কমন পড়ে যায়, সে ভালো ফল করে ফেলে। আবার কারও যদি কমন না পড়ে, তাহলে সে খারাপ করে। আমাদের সময়ে ‘জার্নি ইন লাইফ’ ইত্যাদি রচনা পড়ানো হতো। যার কমন পড়ত, সে ভালো করে লিখতে পারত। যার কমন পড়ত না, তার অবস্থা খুব খারাপ হতো।
তিনি বলেন, শুধু মূল্যায়নের জায়গায় এসে হঠাৎ করে সৃজনশীল প্রশ্ন করলেই হবে না। ‘আমার শিক্ষাদান পদ্ধতি সৃজনশীল নয়, শিক্ষণ পদ্ধতি সৃজনশীল নয়, শিক্ষক সৃজনশীলভাবে পড়াচ্ছেন না—আমি শুধু মূল্যায়নের সময় এসে ধুম করে সৃজনশীল মূল্যায়ন করলাম, এটা তো হয় না।’
তার মতে, সৃজনশীলের নামে যে প্রশ্নগুলো করা হয়, সেগুলোও আসলে স্ট্রাকচারড কোশ্চেন। শুধু নাম দেওয়া হয়েছে সৃজনশীল। গাইড বইয়ে এসব প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই দেওয়া থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রশ্নের ধরন ও উত্তর মুখস্থ করে পরীক্ষায় যায়।
তিনি বলেন, যেভাবে প্রশ্ন করার কথা, যে মানদণ্ডের আলোকে প্রশ্ন করার কথা এবং যে নীতিমালার আলোকে প্রশ্ন করার কথা, সেই স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী একাডেমিক জায়গা থেকে প্রশ্ন করা হয় না।
উদাহরণ হিসেবে আইএলটিএস পরীক্ষার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পরীক্ষার্থীরা প্রশ্ন মুখস্থ করে গিয়ে সেখানে পরীক্ষা দেয় না। সেখানে পরীক্ষার্থীর লেভেল দেখা হয়—তার ভাষার দক্ষতা কতটুকু, সে কতটুকু পারে, কীভাবে চিন্তা করে। এমন একটি বিষয়ও আসতে পারে, যা সে আগে থেকে চিন্তাই করেনি। কিন্তু সে ওই বিষয় নিয়ে লিখতে পারে কি না, ভাষার ক্ষেত্রে তার অ্যানালিটিক্যাল ও আর্গুমেন্টের লেভেল কেমন, ভাষা ব্যবহারের দক্ষতা কেমন, লেখার স্বাচ্ছন্দ্য কেমন, লেখার মধ্যে যুক্তি আছে কি না, একাডেমিক অ্যানালাইসিস কেমন—এসব মূল্যায়ন করা হয়।
বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা এবং গণিতের ক্ষেত্রেও একই। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই বেসিক বিষয়ের ওপর প্রশ্ন করতে হয়। অথচ আমরা প্রশ্ন করি কনটেন্টের ওপর। যার যেটা পড়া থাকে, যার যেটা জানা থাকে, সে সেটাই পারে; অন্যরা পারে না।
স্ট্যান্ডার্ড মূল্যায়ন পদ্ধতি এখনো গড়ে ওঠেনি
অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, আমাদের এমন কোনো নীতিমালা নেই যে প্রতিবছর কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে। কয়েকটি পয়েন্ট বা এক-দুই পাতায় একটি মূল্যায়ন নীতিমালা তৈরি করে সেই অনুযায়ী মূল্যায়ন করা—এমন ব্যবস্থা আমাদের নেই।
মূল্যায়ন করতে গিয়ে কারিকুলামের সঙ্গে কী পড়ানো হলো, শিক্ষাদর্শ কী, পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে কারিকুলামের কী ধরনের অ্যালাইনমেন্ট রয়েছে—এসবের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্যায়নের নীতিমালা তৈরি করা হয় না। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট রুব্রিক্স থাকার কথা। অর্থাৎ শিক্ষার্থী এতটুকু পারলে তাকে এই নম্বর দেওয়া হবে, আর এতটুকু পারলে এই নম্বর দেওয়া হবে—এভাবে নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা উচিত।
‘আমরা তো দেখি, একই খাতা একজন শিক্ষকের হাতে পড়লে এক ধরনের নম্বর পায়, আরেকজন শিক্ষকের হাতে পড়লে অন্য জায়গায় চলে যায়। তার মানে আমাদের স্ট্যান্ডার্ড মূল্যায়ন পদ্ধতি হচ্ছে না। স্ট্যান্ডার্ড মূল্যায়ন পদ্ধতি আমরা এখনো ডেভেলপ করতে পারিনি।’
এ কারণে এবারের ফলাফলকে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে দেখার ক্ষেত্রেও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তার প্রশ্ন, ‘আমরা কিসের ওপর ভিত্তি করে বলব যে এবারের পরীক্ষাটা খারাপ হয়েছে, ছেলেমেয়েরা খারাপ করেছে?’
তিনি বলেন, গত বছরের প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হলে এবং গত বছর যেভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল, সেভাবে মূল্যায়ন করা হলে ফলাফল হয়তো অন্যরকম হতো।
একইভাবে জিপিএ-৫ পাওয়া ১০০ জন এবং ফেল করা ১০০ জন শিক্ষার্থীকে র্যান্ডমলি নিয়ে একটি স্ট্যান্ডার্ড প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া হলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি। তার মতে, এমন পরীক্ষায় ফেল করা শিক্ষার্থীদের অনেকে পাস করতে পারে, আবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকে ফেল করতে পারে। ‘তার মানে আমাদের বিদ্যমান মূল্যায়ন পদ্ধতিটাই তো প্রশ্নবিদ্ধ।’
গণিত-ইংরেজিতে দুর্বলতা কাটাতে রিমেডিয়াল টিচিংয়ের তাগিদ
শিক্ষাবিদ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় শুধু নয়, অন্যান্য বছরের এসএসসি পরীক্ষাতেও গতানুগতিকভাবে গণিত ও ইংরেজিতে তুলনামূলকভাবে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়। এটি জানা বিষয়। কিন্তু কেন এমন হয়, কোথায় শিক্ষার্থীদের সমস্যা—সেটা চিহ্নিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, এসব সমস্যা চিহ্নিত করে বোর্ডের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য সাপোর্ট টিচিং অথবা রিমেডিয়াল টিচিংয়ের ব্যবস্থা করা দরকার। অর্থাৎ শিক্ষার্থীদের যে দুর্বলতাগুলো রয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
‘প্রচলিত ক্লাসরুম শিক্ষা ব্যবস্থায় সব শিক্ষার্থী সমানভাবে শিখতে পারে না। শিক্ষার্থীদের বৈশিষ্ট্যগত দিক থেকে এটি একটি বাস্তবতা। কাজেই আমরা যেহেতু জানি, গণিত ও ইংরেজিতে ছেলেমেয়েরা তুলনামূলকভাবে বেশি অকৃতকার্য হয়, সেক্ষেত্রে শুধু বিষয়টি জানলেই হবে না; বিশ্লেষণ করে এর উপযুক্ত পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’
এ জন্য বোর্ডগুলোকে শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। শিক্ষকদের সম্মানী দেওয়ার মাধ্যমেও বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে এই কার্যক্রম গ্রহণ করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
তার মতে, তা না হলে শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ে যাচ্ছে, টিউটরের কাছে যেতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও একজন শিক্ষক বা টিউটর হয়তো এক ঘণ্টা, দেড় ঘণ্টার বেশি পড়াচ্ছেন না; সপ্তাহে দুই দিন বা তিন দিন পড়াচ্ছেন। ফলে শিক্ষার্থীর লার্নিং গ্যাপ থেকেই যাচ্ছে, দুর্বলতাও থেকে যাচ্ছে।
‘আমার মনে হয়, বোর্ডগুলো যদি এ ধরনের ব্যবস্থা নেয়, বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে পরিবারগুলোকেও শিক্ষার্থীদের সাপোর্ট দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও করতে হবে।’
তিনি বলেন, সমস্যাটি সবাই জানে, কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই উদ্যোগ নেবে কে? ‘শুধু আমরা বললেই তো হবে না। আমার মতে, এই ব্যবস্থা বোর্ডগুলোকেই নিতে হবে।’
বিশেষ করে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও কর্মকর্তারাও বিষয়টি জানেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক সময় দায়টা শুধু স্কুলের ওপর চাপিয়ে রাখা হয়। বলা হয়, স্কুলে শিক্ষক আছেন, শিক্ষকরাই দায়িত্ব নেবেন। কিন্তু কয়টি স্কুলে ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে পড়ানোর জন্য উপযুক্ত সময়, সুযোগ ও পরিবেশ পান, সেটিও দেখতে হবে।
ইংরেজি শিক্ষাটা কেন শিক্ষার্থীদের কাছে ভীতির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেটিও বিশ্লেষণ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। কতগুলো স্কুলে ভালো ইংরেজি শিক্ষক আছেন, তারা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী পড়ানোর সুযোগ পাচ্ছেন কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
কম পড়ালেখা করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের প্রবণতা
গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হোমায়রা সাঈদ বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার প্রতি এখন আগ্রহ অনেক কম। সত্যি কথা বলতে, পড়ালেখায় তারা একদমই মন দেয় না। গণিত ও ইংরেজি মূলত প্র্যাকটিসের বিষয়। বিশেষ করে গণিত। নিয়মিত প্র্যাকটিস না করলে গণিতে ভালো করা সম্ভব নয়। আর গণিতে যদি বেসিকটাই ঠিক না থাকে, তাহলে ওপরের ক্লাসে উঠলে স্বাভাবিকভাবেই আরও খারাপ করার সম্ভাবনা থাকে।
তার মতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুখস্থ করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। ‘যতটা সম্ভব কম পড়ে, একেবারে কম পড়ে কীভাবে পরীক্ষার হলে যাওয়া যায়—এমন একটা মানসিকতা তাদের মধ্যে কাজ করে। কিন্তু এভাবে তো হবে না। পড়াশোনা করতে হবে।’
ইংরেজির ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের বেসিক দুর্বল বলে জানান হোমায়রা সাঈদ। বিশেষ করে গ্রামারে তাদের দুর্বলতা রয়েছে। ‘গ্রামারে দুর্বল হলে তারা কীভাবে ইংরেজি শিখবে? একইভাবে তারা রিডিংয়েও দুর্বল।’
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে খুব একটা সম্পর্ক রাখে না। গাইড বই দেখে দেখে অথবা বিভিন্ন জায়গায় থাকা ছোট ছোট সাজেশন বা নোট থেকে পুরো বিষয় মুখস্থ করছে। তারা হয়তো অনেক কিছু জানে বা মুখস্থ করে, কিন্তু কোন চ্যাপ্টার থেকে কোন বিষয়ের ওপর প্রশ্ন আসতে পারে, সেই বিষয়গুলো সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকে না।
‘কোনো শিক্ষার্থীর যদি বেসিক সম্পর্কে ধারণা থাকে অথবা বইয়ের কোন অধ্যায় থেকে কোন বিষয়ের ওপর প্রশ্ন আসছে, সে সম্পর্কে তার ধারণা থাকে, তাহলে পরীক্ষায় সে কিছু না কিছু লিখতে পারবে। কারণ প্রশ্ন তো আসে। অবজেক্টিভ থাকে, পূরণ করার প্রশ্ন থাকে, বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন থাকে, এমসিকিউ থাকে—ইংরেজিতেও এসব প্রশ্ন আসে। তাহলে এত শিক্ষার্থী ইংরেজিতে ফেল করছে কেন, সেটিও ভাবার বিষয়।’
শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান
হোমায়রা সাঈদ বলেন, শিক্ষার্থীদের ফলাফলের জন্য শিক্ষকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষকদের অবশ্যই নিয়মিত ক্লাস নিতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াতে হবে। কিন্তু তার অভিজ্ঞতায় শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষকের সংখ্যা অনেক কম।
তিনি বলেন, তার স্কুলে প্রায় সাড়ে ৩০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। কিন্তু অনেক শিক্ষক পদ খালি রয়েছে। ফলে একজন শিক্ষককে পরপর পাঁচ-ছয়টি ক্লাস নিতে হয়। একজন শিক্ষককে এতগুলো ক্লাস নিতে হলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। এরপর ক্লাসে গেলেও শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে যায়।
‘শিক্ষার্থীদের ক্লাসে চুপ করাতে হয়, বারবার ডাকতে হয়, চিৎকার করে বলতে হয়—চুপ করো, চুপ করো। এভাবে বলতে বলতে একজন শিক্ষকের এনার্জিই শেষ হয়ে যায়। আমি নিজেও এখানে ক্লাস নিয়ে বিষয়টি বুঝেছি। একটা ক্লাস নিয়ে আমি যেন স্যালুট নিয়েছি—দেখি, এবার কেমন! কারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করাটাই অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।’
তার মতে, শিক্ষকদের স্বল্পতা, শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ এবং শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ—এসব বিষয়ও শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে।
অভিজ্ঞ শিক্ষকরা অবসরে, বাড়ছে শূন্যতা
হোমায়রা সাঈদ বলেন, অনেক শিক্ষক প্রয়োজন ছিল। কিন্তু যারা ছিলেন, তাদের অনেকেই অবসর নিয়ে চলে গেছেন। ‘আমিও তো তিন মাস পর অবসর নিয়ে চলে যাব।’
বর্তমানে বিসিএস থেকে শিক্ষক দেওয়া হচ্ছে, আবার বিসিএস নন-ক্যাডার থেকেও শিক্ষক দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সবাই যোগদান করেন না। কেউ কেউ যোগদান করেন, কেউ কেউ করেন না। ফলে অভিজ্ঞ শিক্ষকও অনেক কমে গেছে।
‘আমাদের অনেক অভিজ্ঞ শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু যারা অভিজ্ঞ ছিলেন, তারা সবাই অবসর নিয়ে চলে গেছেন। ধরেন, ১৯৯১ বা ১৯৯২ ব্যাচের এখন আর কেউ নেই। ১৯৯৪ ব্যাচের অল্প কয়েকজন আছেন। আমরা কয়েকজন আছি। কিন্তু এই বছর যেতে যেতে আমাদের সংখ্যাও প্রায় শেষ হয়ে যাবে।’
কোচিংয়েও পরীক্ষাভিত্তিক পড়াশোনা
অনেক সময় বলা হয়, শ্রেণিকক্ষে ভালোভাবে পড়াশোনা না হলেও শিক্ষার্থীরা প্রাইভেট বা কোচিংয়ে পড়ে ভালো ফল করে। তবে প্রাইভেটে পড়েও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দুর্বলতা দূর হচ্ছে না বলে মনে করেন হোমায়রা সাঈদ।
তিনি বলেন, আগের মতো এখন বাসায় গিয়ে শিক্ষকরা পড়ান না। আর কেউ বাসায় পড়াতে গেলে যে পরিমাণ টাকা নিতে হয়, সেটিও অনেকের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা কোচিং সেন্টারে যাচ্ছে।
তার মতে, স্কুলের কোচিং সেন্টারেও মূলত একই ধরনের বিষয় চলে। সেখানে বিস্তারিতভাবে পড়ানো হয় না। পরীক্ষার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, সেটুকুর ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
‘মূলত পড়ানো হয় পরীক্ষাভিত্তিকভাবে। পরীক্ষায় যেগুলো আসতে পারে বা আসার সম্ভাবনা আছে, সেগুলোর ওপরই বেশি কনসেন্ট্রেশন দেওয়া হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা হয়তো পরীক্ষার জন্য কিছু বিষয় ভালোভাবে প্রস্তুত করে, কিন্তু তাদের বেসিক জ্ঞান বা বিষয়ভিত্তিক ধারণা তৈরি হয় না। আর এই কারণেই শুধু প্রাইভেট বা কোচিং করলেই শিক্ষার্থীর প্রকৃত দুর্বলতা দূর হচ্ছে না।’
এমন ফলাফল শিক্ষা ব্যবস্থার বড় সংকটের ইঙ্গিত
অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের মতে, এবারের ফলাফলকে শুধু একটি পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখলে হবে না। ‘আপাতত দৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে, আমাদের শিক্ষার অবস্থা ভালো নয়। আবার অনেক স্কুল ভালো করেছে, কলেজগুলো ভালো করেছে, নামী প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো করেছে। কারণ তাদের নিজস্ব মেকানিজম আছে। সরকারি সিস্টেমের বাইরেও তারা নিজেদের ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের শেখানোর পদ্ধতি ও ব্যবস্থা ডেভেলপ করেছে।’
তিনি বলেন, কোনো কোনো বিষয়ে শিক্ষার্থীরা ভালো করেছে, আবার কোনো কোনো বিষয়ে খারাপ করেছে। বিজ্ঞান ভালো করেছে, আবার ইংরেজিতে খারাপ করেছে। গণিতেও অনেক শিক্ষার্থী ভালো করতে পারেনি। মুখস্থনির্ভরতার পাশাপাশি কমন না পড়ার বিষয়টিও এখানে কাজ করে।
‘প্রতিবছর পরীক্ষা হলেই আমরা আসলে শিক্ষা নিয়ে কথা বলি। এখন মূল কথাটা হলো, আমাদের বোঝার এবং উপলব্ধি করার সময় অনেক আগেই এসেছে। কিন্তু আমরা সেটা নিইনি।’
তিনি মনে করেন, এখন ‘এগারোতম ঘণ্টা’ চলছে। শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি ও সংকটের মধ্যে এবারের ফলাফল একটি ‘সিমটম’ বা লক্ষণ মাত্র। এর গভীরে আরও ভয়াবহ চিত্র রয়েছে।
তার ভাষায়, ‘আমরা এখনো সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে চাইছি না, সমাধানও করতে চাইছি না। আমাদের দরকার হলো, এই পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সামনে শিক্ষাকে কীভাবে রিফর্ম করা যায়, কীভাবে ডেভেলপ করা যায়, শিক্ষকদের কীভাবে ডেভেলপ করা যায়, কীভাবে ভালো শিক্ষক নিয়োগ করা যায়—এসব নিয়ে কাজ করা।’
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিকতা ও মান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে আবার গভর্নিং বডির মাধ্যমে নিয়োগের উদ্যোগের খবরের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ ব্যবস্থায় কিছু ভালো সম্ভাবনা ছিল। সেটিও যদি নষ্ট করা হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
সব মিলিয়ে এবারের ফলাফলকে আলাদাভাবে না দেখে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখার পরামর্শ দেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মজিবুর রহমান।
‘এবারের ফলাফল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার খারাপ অবস্থার একটি চিত্র তুলে ধরেছে। কিন্তু এটি সামান্য একটি চিত্র; এর গভীরতা আরও ভয়াবহ। আমাদের এখন দরকার রোগ নির্ণয় করা—ডায়াগনোসিস করা। সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঠিক করা, মেরামত করা এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার করা।’