১০ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৫

এসএসসিতে রেকর্ড ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে পাসের হার

এসএসসি পরীক্ষার্থীরা   © সংগৃহীত

একসময় এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পাস করত। সেই ধারাবাহিকতায় এবার বড় ধাক্কা। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। অর্থাৎ প্রতি ১০০ পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৩৮ জনই এবার উত্তীর্ণ হতে পারেননি।

সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ফল প্রকাশ করেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় ১৮ লাখ শিক্ষার্থীর দীর্ঘ আড়াই মাসের অপেক্ষার অবসান হয়।

এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ। অর্থাৎ সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশীয় পয়েন্ট। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে উত্তীর্ণ ছাত্রের চেয়ে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৮২ জন বেশি ছাত্রী উত্তীর্ণ হয়েছে। ছাত্রের তুলনায় ১১ হাজার ৪০১ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে।

তবে এবারের ফলাফলের সবচেয়ে বড় দিক হলো দীর্ঘ সময়ের তুলনায় পাসের হারের বড় পতন। ২০২৫ সালে সব বোর্ড মিলিয়ে পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যা তখন গত ১৮ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন ছিল। এক বছর পর সেই রেকর্ডও ভেঙে গেল। এবার পাসের হার কমেছে আরও ৬ দশমিক ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট।

গত দেড় দশকের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে পাসের হারের ওঠানামার চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। ২০১৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এরপর ২০১৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৮৭ দশমিক ০৪ শতাংশে। ২০১৬ সালে কিছুটা বেড়ে ৮৮ দশমিক ২৯ শতাংশ হলেও ২০১৭ সালে আবার বড় পতন হয়ে পাসের হার দাঁড়ায় ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশে। ২০১৮ সালে তা আরও কমে হয় ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ।

২০১৯ সালে পাসের হার কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ৮২ দশমিক ২০ শতাংশে পৌঁছায়। ২০২০ সালেও তা প্রায় একই পর্যায়ে ছিল—৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

এরপর করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাবে ফলাফলে বড় ধরনের ব্যতিক্রম দেখা যায়। ২০২১ সালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়া হয়। ওই বছর পাসের হার রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছে যায়। এটিই সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ পাসের হার। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা হওয়ায় ওই বছরের ফলকে স্বাভাবিক সময়ের ফলাফলের সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা কঠিন।

২০২২ সালে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে পাসের হার নেমে আসে ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশে। ২০২৩ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশে। ২০২৪ সালে পূর্ণ নম্বর ও পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা নেওয়ার পর পাসের হার সামান্য বেড়ে ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ হয়।

কিন্তু ২০২৫ সালে ফলাফলে বড় ধস নামে। ওই বছর পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৪ সালের তুলনায় এক বছরেই পাসের হার কমে যায় ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশীয় পয়েন্ট। সেই পতনের ধারাবাহিকতায় এবার আরও কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ হয়েছে।

অর্থাৎ, ২০২৪ থেকে ২০২৬—মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশীয় পয়েন্ট। আর ২০১৪ সালের ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশের সঙ্গে তুলনা করলে ২০২৬ সালের পাসের হার ২৯ দশমিক ০৯ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।

ফলাফলের দীর্ঘমেয়াদি চিত্রে দেখা যায়, ২০১৪ সালের পর থেকেই পাসের হারে স্থায়ীভাবে ৯০ শতাংশের ওপরে থাকা সম্ভব হয়নি। ২০১৫-১৮ সালে ধারাবাহিক পতনের পর ২০১৯-২০ সালে কিছুটা স্থিতিশীলতা আসে। ২০২১ সালের অস্বাভাবিক উচ্চ ফলের পর আবার কমতে শুরু করে পাসের হার। বিশেষ করে ২০২৪ সালের পর পতনের গতি সবচেয়ে বেশি।

শুধু পাসের হার নয়, জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাতেও একই ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২২ সালে রেকর্ড ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। ২০২৩ সালে তা কমে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭৮ জনে এবং ২০২৪ সালে ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জনে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কমে হয় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। এবার ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে।

ফলে এবারের ফলাফলে দুটি বিষয় পাশাপাশি স্পষ্ট হয়েছে—পাসের হার যেমন ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে, তেমনি জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও টানা কয়েক বছর ধরে কমছে। এই প্রবণতা এসএসসি পরীক্ষার মূল্যায়ন, প্রশ্নের ধরন, পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে ফিরে আসা এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে।