১৩ জুলাই ২০২৬, ১৪:২৭
বৃষ্টি উপেক্ষা করে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সাহস জোগালেন হামদর্দ পাবলিক কলেজের শিক্ষকরা
বাইরে তখন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে। ঢাকার ব্যস্ত সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। পথঘাটে দুর্ভোগ, চারদিকে প্রতিকূলতার ছাপ। কিন্তু তেঁজগাও মহিলা কলেজ কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একদল মানুষ—তাদের হাতে ছাতা, গা মোছার টাওয়েল। ভালোবাসা নিয়ে অপেক্ষা করছেন প্রিয় শিক্ষার্থীর জন্য।
তারা হামদর্দ পাবলিক কলেজের শিক্ষক। আর তাদের সামনে দিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রবেশ করছে তাদের প্রিয় শিক্ষার্থীরা—যাদের জন্য তারা আজ শুধু শিক্ষক নন, হয়ে উঠেছেন অভিভাবক। বৃষ্টি উপেক্ষা করে পরম মমতায় তারা পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সন্তানের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য। একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়—এই বার্তাই যেন আবারও প্রমাণ করলেন হামদর্দ পাবলিক কলেজের শিক্ষকরা। পরীক্ষার চাপ, উদ্বিগ্নতা আর প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে তারা দেখিয়ে দিলেন, শিক্ষা শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়; শিক্ষা মানে মানবিকতা, মমতা ও দায়িত্ববোধ।
ঢাকার পান্থপথে অবস্থিত হামদর্দ পাবলিক কলেজের শিক্ষকদের এই মানবিক দৃশ্য এখন শিক্ষাঙ্গণে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় এ কলেজ থেকে অংশ নিচ্ছে ৪৭০ জন শিক্ষার্থী। প্রতিটি পরীক্ষার দিন শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাতে পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে উপস্থিত থাকেন কলেজের শিক্ষকরা। পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলা, তাদের সাহস জোগানো, দোয়া করা, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া—সবকিছুই যেন একান্ত পারিবারিক দায়িত্বের মতো পালন করছেন তারা। আবার পরীক্ষা শেষে বের হওয়ার সময়ও শিক্ষার্থীদের অপেক্ষায় থাকেন শিক্ষকরা। জানতে চান পরীক্ষা কেমন হয়েছে, কোনো প্রশ্নে সমস্যা হয়েছে কি না, প্রয়োজনে প্রশ্নের সমাধানও বুঝিয়ে দেন। সাধারণত পরীক্ষার দিন সন্তানের পাশে এমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন বাবা-মা। কিন্তু হামদর্দ পাবলিক কলেজে সেই জায়গাটি পূরণ করছেন এই কলেজের শিক্ষকরা। প্রতিটি পরীক্ষার দিন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকরা পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার ও অনুপ্রেরণা দেওয়ার এই ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
আজ ছিল পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র পরীক্ষা। ঢাকাসহ সারাদেশে যখন প্রবল বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত, তখনও থেমে থাকেননি হামদর্দ পাবলিক কলেজের শিক্ষকরা। বৃষ্টির মধ্যেই কলেজের অধ্যক্ষসহ পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেছেন শিক্ষার্থীদের জন্য। প্রকৃতির এই প্রতিকূলতাও দমাতে পারেনি হামদর্দ পাবলিক কলেজের শিক্ষকদের দায়িত্ববোধকে। অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মো. নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা বৃষ্টির মধ্যেই পরীক্ষা কেন্দ্রের সামনে অবস্থান নেন। বৃষ্টিতে ভিজে পরীক্ষা দিতে আসা শিক্ষার্থীদের কেউ যেন অস্বস্তিতে না পড়ে, সেদিকে ছিল তাদের বিশেষ নজর। কেউ এগিয়ে দিয়েছেন ছাতা, কেউ বৃষ্টিতে ভেজা শিক্ষার্থীর মাথা ও শরীর মুছে দিয়েছেন, কেউ দিয়েছেন শেষ মুহূর্তের সাহস—‘ভয় নেই, ভালো হবে।’ হামদর্দ পাবলিক কলেজের এই উদ্যোগ শিক্ষার্থী-শিক্ষকের সম্পর্ককে দিয়েছে এক নতুন মাত্রা। যেখানে শিক্ষকরা হয়ে উঠেছেন শিক্ষার্থীদের পথচলার সহযাত্রী, সাহস, মনোবল এবং পরিবারের মতো আপনজন।
এই ভালোবাসার পেছনে রয়েছে একটি সুদূরপ্রসারী শিক্ষাদর্শন। কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি অধ্যাপক কামরুন নাহার হারুন এবং কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ড. হাকীম মো. ইউসুফ হারুন ভূঁইয়া শিক্ষার্থীবান্ধব এমন উদ্যোগে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছেন।
শুধু মানবিক মূল্যবোধ নয়, শিক্ষার ক্ষেত্রেও ধারাবাহিক সাফল্যের পরিচয় দিয়ে আসছে হামদর্দ পাবলিক কলেজ। প্রতি বছর এইচএসসি পরীক্ষায় এ কলেজের শিক্ষার্থীরা শতভাগ উত্তীর্ণ হয়ে আসছে, যা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম সাফল্য। একজন শিক্ষকের প্রকৃত পরিচয় শুধু পাঠ্যবইয়ের পাঠ শেষ করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীর কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানো, তার মনে সাহস জাগানো এবং তাকে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখাই একজন শিক্ষকের বড় পরিচয়।
হামদর্দ পাবলিক কলেজের শিক্ষকরা বৃষ্টিভেজা এই দিনে যেন সেই কথাটিই আবার মনে করিয়ে দিলেন— ‘শিক্ষা শুধু জ্ঞানের আলো নয়, শিক্ষা হলো মানবতার উষ্ণ ছায়া’।
সর্বশেষ সংবাদ