২২ মে ২০২৬, ১১:২৩

এসএসসিতে এত কম বহিষ্কার এর আগে হয়নি, কী বলছে ২০২০-২৬ সালের পরিসংখ্যান?

পরীক্ষার প্রতীকী ছবি   © সংগৃহীত

কঠোর নজরদারি ও কড়াকড়ির মধ্যে হয়েছে এবারের এসএসসির লিখিত পরীক্ষা। যদিও এখন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের এক বিষয় পরীক্ষা বাকি রয়েছে। এ পর্যন্ত পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন ও নকলের অভিযোগে মোট ২০৬ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছে। দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত এসএসসি, দাখিল ও সমমানের প্রথম দিনের পরীক্ষা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়। গত ২১ এপ্রিল থেকে দেশের ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে একযোগে শুরু হয় এ পরীক্ষা। এবারের পরীক্ষায় মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্র ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থী ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন শিক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে।

সারা দেশে ৩ হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে ৩০ হাজার ৬৬৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় বসছে। সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫০ জন।

এদিকে পরীক্ষায় নকল ও অসদুপায় অবলম্বনের কারণে বহিষ্কারের হার নিয়ে গত কয়েক বছরের তুলনামূলক চিত্রও উঠে এসেছে। ২০২২ সালে বহিষ্কার ছিল ৫৫৫ জন, ২০২৩ সালে ৭৯৬ জন, ২০২৪ সালে ৭৪৭ জন এবং ২০২৫ সালে ৭২১ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়। আর চলতি বছর এখন পর্যন্ত বহিষ্কৃত হয়েছে ২০৮ জন।

তবে ২০২১ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে সীমিত আকারে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় বহিষ্কারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ১২৩ জনে নেমে আসে। এর আগের বছর ২০২০ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় নকল ও অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে মোট ১ হাজার ১৫৫ জন পরীক্ষার্থী বহিষ্কৃত হয়েছিল।

আরও পড়ুন: এসএসসি-এইচএসসিসহ সব পরীক্ষার ফল প্রকাশের সময় বেধে দিলেন শিক্ষামন্ত্রী

বহিষ্কারের সার্বিক চিত্র
সারা দেশের মোট ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মোর্চা আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রথমদিন ২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় নকলের দায়ে ২ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়। একই দিনে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কোরআন মাজীদ ও তাজবীদ পরীক্ষায় ৪ জন বহিষ্কার হয়। এদিন কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বাংলা পরীক্ষায় ১ জন কক্ষ পরিদর্শক বহিষ্কার হন।

দ্বিতীয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২৩ এপ্রিল। ওইদিন নয়টি সাধারণ বোর্ডের বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় ৬ শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়। একই দিনে মাদ্রাসা বোর্ডের আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষায় ১ শিক্ষার্থী এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় ১০ শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়। ৩য় পরীক্ষার দিন ২৬ এপ্রিল ইংরেজি প্রথম পত্র বিষয়ে নয়টি সাধারণ বোর্ডে ২১ জন, মাদ্রাসা বোর্ডের গণিত পরীক্ষায় ১৫ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের গণিত-২ পরীক্ষায় ৪ জন শিক্ষার্থী নকলের দায়ে বহিষ্কার হয়।

শিক্ষকদের আগেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং প্রশ্ন প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদেরও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও প্রস্তুতি দেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রশ্নপত্র মানসম্মত হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরাও যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়। এবার যারা ভালো করেছে তারা সহজেই পারবে, আবার যারা দুর্বল তারাও কিছুটা করতে পারবে এমনভাবে প্রশ্ন করা হয়েছে। সহজে জিপিএ-৫ পাওয়া যাবে না, আবার খুব সহজে ফেলও করা যাবে নাঅধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড

ইংরেজি ও আরবি পরীক্ষায় হয়েছে বেশি বহিষ্কার। দেখা গেছে, ২৮ এপ্রিল ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডে ২৪ জন, মাদ্রাসা বোর্ডের আরবি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় ২৪ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ের পরীক্ষায় ১ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়। ৩০ এপ্রিল তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডে ১ জন, মাদ্রাসা বোর্ডের বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় ৭ জন এবং কারিগরি বোর্ডের ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা-২ পরীক্ষায় ১ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়।

৩ মে গণিত পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডে ১৪ জন, মাদ্রাসা বোর্ডের বাংলা দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় ৬ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের পদার্থবিজ্ঞান-২ পরীক্ষায় ৬ জন শিক্ষার্থী নকলের দায়ে বহিষ্কার হয়। ৫ মে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডে ১ জন এবং মাদ্রাসা বোর্ডের ইংরেজি প্রথম পত্র পরীক্ষায় ৭ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়।

৭ মে ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা এবং হিন্দুধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডে ২ জন, মাদ্রাসা বোর্ডের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষায় ১৪ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ট্রেড-১ পরীক্ষায় ২ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়। ১০ মে পদার্থবিজ্ঞান, বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা এবং ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডে ৫ জন, মাদ্রাসা বোর্ডের হাদিস শরীফ পরীক্ষায় ৩ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের রসায়ন-২ পরীক্ষায় ১ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়।

১১ মে ভূগোল ও পরিবেশ পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডে ১ জন এবং মাদ্রাসা বোর্ডের আকাইদ ও ফিকহ পরীক্ষায় ১ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়। ১২ মে গার্হস্থ্য বিজ্ঞান ও কৃষি শিক্ষা পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডে ১ জন এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পৌরনীতি ও নাগরিকতা, কৃষি শিক্ষা, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় পরীক্ষায় ১ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়। ১৩ মে হিসাববিজ্ঞান পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডে ২ জন এবং মাদ্রাসা বোর্ডের ইসলামের ইতিহাস পরীক্ষায় ৫ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়।

আরও পড়ুন: ধারেকাছেও নেই দুজন, শিক্ষায়-গবেষণায় ৭ জনই পিছিয়ে বিদায়ীদের চেয়ে

১৪ মে রসায়ন, পৌরনীতি ও নাগরিকতা এবং ব্যবসায় উদ্যোগ পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডে ৩ জন, মাদ্রাসা বোর্ডের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি পরীক্ষায় ৪ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কৃষি শিক্ষা, উচ্চতর গণিত ও জীববিজ্ঞান পরীক্ষায় ৩ জন শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়। এছাড়া সবশেষ ২০ মে জীববিজ্ঞান ও অর্থনীতি পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ বোর্ডে ১ জন এবং মাদ্রাসা বোর্ডের জীববিজ্ঞান পরীক্ষায় ২ জন শিক্ষার্থী নকলের দায়ে বহিষ্কার হয়।

ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছিল স্ট্যান্ডার্ড মানের। এটি সব স্তরের শিক্ষার্থীর জন্যই উপযোগী ছিল। প্রশ্ন সহজ বা কঠিন হওয়ার বিষয় নয়, বরং প্রশ্ন এমনভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে যাতে ভালো ও দুর্বল দুই ধরনের শিক্ষার্থীরাই উত্তর করতে পারে।

পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, শিক্ষকদের আগেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং প্রশ্ন প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদেরও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও প্রস্তুতি দেওয়া হয়েছিল। ফলে প্রশ্নপত্র মানসম্মত হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরাও যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়। এবার যারা ভালো করেছে তারা সহজেই পারবে, আবার যারা দুর্বল তারাও কিছুটা করতে পারবে এমনভাবে প্রশ্ন করা হয়েছে। সহজে জিপিএ-৫ পাওয়া যাবে না, আবার খুব সহজে ফেলও করা যাবে না।

তিনি বলেন, শিক্ষকরা নিয়মিতভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কোনো ধরনের শিথিলতা ছিল না। এ ছাড়া কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কারণে এবার নকলের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।