২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০২

আড়াই কোটির সিনেমায় যুক্ত হতে চাননি কোনো প্রযোজক, সেটিই আয় করল ১১০ কোটি

কন্নড় সিনেমা ‘প্রেমাদা উরাল্লি’  © সংগৃহীত

‘মাত্র’ আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা বাজেটে নির্মিত কন্নড় সিনেমা ‘প্রেমাদা উরাল্লি’ বিশ্বব্যাপী আয় করেছে ১১০ কোটি টাকার বেশি। অথচ ছবিটি নির্মাণের পর মুক্তি দিতে প্রযোজকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছিল নির্মাতাদের। অর্থের অভাবে প্রায় থমকে যেতে বসেছিল পুরো কাজ। মুক্তির সময়ও পায়নি পর্যাপ্ত প্রেক্ষাগৃহে। সেই সিনেমাই এখন বক্স অফিসে বড় সাফল্য এনে দিয়েছে। একসময় যে ছবিতে বিনিয়োগ করতে চাননি প্রযোজকেরা, এখন তারাই এখন খুঁজছেন পরিচালক মনোজ কুমারকে।

সম্প্রতি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর বিনোদনবিষয়ক সাময়িকী স্ক্রিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ছবিটির সাফল্যের পেছনের গল্প তুলে ধরেছেন চিত্রগ্রাহক রাজকান্ত এস কে। তিনি জানিয়েছেন, এক প্রভাবশালী প্রযোজককে আগেই সতর্ক করেছিলেন তিনি। ছবিটি ফিরিয়ে দিলে একদিন অনুতপ্ত হতে হবে বলেও জানিয়েছিলেন। কিন্তু মুক্তির পর সিনেমাটি দর্শকের প্রশংসা পেতে শুরু করলে সেই প্রযোজকই পরিচালকের সঙ্গে দেখা করার ব্যবস্থা করে দিতে তাঁকে ফোন করেন।

২০২৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় ‘প্রেমাদা উরাল্লি’। সিনেমাটির সাফল্য শুধু বক্স অফিসের আয়েই সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর কাজের সুযোগ না পাওয়া এক জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী পরিচালকের প্রত্যাবর্তন, অর্থসংকটের মধ্যেও সিনেমা নির্মাণ এবং প্রচারে অভিনব উদ্যোগ সব মিলিয়ে এটি “কন্নড়” চলচ্চিত্রের আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

অর্থসংকটে বন্ধ হতে বসেছিল
‘প্রেমাদা উরাল্লি’র পরিচালক মনোজ কুমারের প্রথম সিনেমা ‘অক্ষি’ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছিল। তবে সেই স্বীকৃতির পরও দীর্ঘ পাঁচ বছর নতুন কাজ পাননি তিনি। নতুন সিনেমা নির্মাণ করতে গিয়ে তাঁকে পড়তে হয় চরম আর্থিক সংকটে। একপর্যায়ে শুটিং শেষ করার অর্থ জোগাড় করতে “মায়ের মঙ্গলসূত্র” বন্ধক রাখার কথাও ভাবতে হয়েছিল তাকে।

শুরুতে ছবিটির বাজেট ধরা হয়েছিল মাত্র এক কোটি টাকা। পরে শুটিং ও অন্যান্য খরচ বাড়তে থাকায় পরিচিতজনদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে হয়। কেউ ১০ লাখ, কেউ ২০ লাখ টাকা করে বিনিয়োগ করেন। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১৫ জন বিনিয়োগকারী ছবিটির সঙ্গে যুক্ত হন বলে জানিয়েছেন চিত্রগ্রাহক রাজকান্ত।

কম বাজেটেও নির্মাণের মান ধরে রাখতে চেষ্টা করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। রাজকান্ত নিজের পরিচিতি কাজে লাগিয়ে ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভাড়ায় ছাড় আদায় করেন। যে সরঞ্জাম ভাড়া করতে দিনে ৩০ হাজার টাকা লাগত, তা পাওয়া যায় ১৫ হাজার টাকায়। শতাধিক সদস্যের শুটিং দলের থাকার ব্যবস্থাও করা হয় ভাড়া করা একটি অনুষ্ঠানস্থলে। তবে অভিনেতাদের জন্য ছিল আলাদা আবাসনের ব্যবস্থা।

বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের মতো কার্ড বিলি
সিনেমা নির্মাণের পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় মুক্তি ও প্রচার। বড় কোনো তারকা না থাকায় প্রযোজকদের আগ্রহ ছিল কম। প্রচারের জন্যও পর্যাপ্ত অর্থ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে পরিচালক মনোজ কুমার বেছে নেন ব্যতিক্রমী কৌশল। বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রের আদলে কার্ড ছাপিয়ে দর্শকদের সিনেমা দেখার আমন্ত্রণ জানান নির্মাতারা।

বাস, ট্রেন, বাসস্ট্যান্ড, মন্দিরসহ জনসমাগমের বিভিন্ন স্থানে মানুষের হাতে এসব কার্ড তুলে দেওয়া হয়। তাঁদের অনুরোধ ছিল, অন্তত একবার যেন ছবিটি দেখেন দর্শকেরা। এ ছাড়া কর্ণাটকের বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশার পেছনে লাগানো হয় আলোকপ্রতিফলক স্টিকার।

রাজকান্তের তথ্য অনুযায়ী, এ জন্য ১০ হাজারের বেশি স্টিকার ছাপানো হয়েছিল। বড় প্রচার বাজেট না থাকলেও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর এই উদ্যোগ সিনেমাটির প্রতি আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

৬০টি প্রদর্শনী থেকে শত শত শো
মুক্তির প্রথম দিন ‘প্রেমাদা উরাল্লি’ প্রদর্শিত হয় মাত্র ৬০টি শোতে। আয় হয় প্রায় ১২ লাখ টাকা। শুরুটা খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। তবে দ্বিতীয় দিন থেকেই বাড়তে থাকে দর্শকের আগ্রহ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও দর্শকদের মুখে মুখে প্রশংসা ছড়িয়ে পড়লে প্রেক্ষাগৃহমালিক ও পরিবেশকেরাও ছবিটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে প্রদর্শনীর সংখ্যা।

বক্স অফিসের হিসাব প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠান স্যাকনিল্কের তথ্য অনুযায়ী, ছবিটির বিশ্বব্যাপী আয় ২৪ অক্টোবরের মধ্যে ১১৫ কোটি টাকার বেশি ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সিনেমাটির আয় ১১০ কোটি টাকার বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বক্স অফিসের হিসাব বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কিছুটা আলাদা হওয়ায় চূড়ান্ত আয়ের পরিমাণে পার্থক্য থাকতে পারে।

কী আছে এই সিনেমা গল্পে
‘প্রেমাদা উরাল্লি’ মূলত গ্রামীণ পটভূমিতে নির্মিত প্রেম ও পারিবারিক সম্পর্কের গল্প। সিনেমায় নাগান্নার বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন রঙ্গায়ন রঘু। ছেলেকে নিয়ে গ্রামে তাঁর সংসার। ছেলের জন্য শিক্ষিত পুত্রবধূ খুঁজতে গিয়ে পরিবারে তৈরি হয় নানা জটিলতা। ছেলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন শ্রী রাম। আরও আছেন রামিকা শিবু ও তাপস্বিনী পুনাচ্চা।

প্রেমের পাশাপাশি কৃষিজীবন, পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সম্পর্কের টানাপোড়েন উঠে এসেছে ছবিটিতে। কর্ণাটকের হাসান অঞ্চলের সবুজ প্রকৃতিও সিনেমার দৃশ্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। চিত্রগ্রাহক রাজকান্তের ভাষ্য, বর্ষার আবহকে ছবির আবেগের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তাঁরা।

প্রযোজকদের আগ্রহের কেন্দ্রে
‘প্রেমাদা উরাল্লি’র সাফল্য দেখিয়েছে, বড় তারকা কিংবা বিপুল প্রচার ব্যয় ছাড়াও দর্শকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। শুরুতে সীমিত প্রদর্শনী পাওয়া সিনেমাটি দর্শকের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় ধীরে ধীরে আরও বেশি প্রেক্ষাগৃহে জায়গা করে নেয়। যে ছবির অর্থ জোগাড় করা এবং মুক্তি নিশ্চিত করাই ছিল নির্মাতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, সেটিই এখন কন্নড় চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত ব্যবসায়িক সাফল্য। আর একসময় যে পরিচালককে কাজের সুযোগ পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে, তাঁর সঙ্গেই এখন দেখা করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন প্রযোজকেরা।