হুমায়ুন আহমেদ এবং হিমু, কতটা পূরণ হয়েছে লেখকের শূন্যতা?

হিমু ও হুমায়ূন আহমেদ
হিমু ও হুমায়ূন আহমেদ  © সংগৃহীত

কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ সৃষ্ট একটি জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্র হচ্ছে ‘হিমু’। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের তরুণদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল এই হিমু চরিত্রটি। এমনকি এখনো দর্শকের মনে গাঁথা এই হিমু। কোথাও এই ‘হিমু’ নামটি দেখলে বা খালি পায়ে হলুদ পাঞ্জাবি পড়া কোন এক তরুণকে দেখলে চোখ এড়ায় না কারোরই।

হিমু চরিত্রের আসল নাম হিমালয়। হিমু মূলত ২৫-২৮ বছরের একজন বেকার যুবক। যার আচরণে বেখেয়ালি, জীবনযাপনে ছন্নছাড়া ও বৈষয়িক ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন ভাব প্রকাশ পায়। চাকরির সুযোগ থাকলেও সে চাকরি কখনো করে না। সে সব সময় হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে রাস্তাঘাটে দিন-রাত ঘুরে বেড়ায় এবং মাঝে মাঝে ভবিষ্যদ্বাণী করে মানুষকে চমকে দেয়।

তার এই হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে রাস্তার ঘুরার সম্পূর্ণ কৃতিত্ব যায় তার বাবার ওপর। হুমায়ূন আহমেদ হিমুর বাবাকে বর্ণনা করেছেন একজন বিকারগ্রস্ত মানুষ হিসেবে। হিমুর বাবা মনে করতেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার যদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যায় তবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মহাপুরুষও তৈরি করা সম্ভব। আর তার এই মহাপুরুষ তৈরির বলি হয় হিমু। মহাপুরুষ তৈরির জন্য একটি বিদ্যালয় বানিয়েছিলে হিমুর বাবা। যার একমাত্র ছাত্র ছিল তার সন্তান হিমু।

হিমুর পোশাক হল পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবী। হলুদ বৈরাগের রঙ বলেই পোশাকের রং হলুদ নির্বাচিত করা হয়েছিল। ঢাকা শহরের পথে-পথে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো তার কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম। উপন্যাসে প্রায়ই তার মধ্যে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার প্রকাশ দেখা যায়।

হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়া চরিত্রের নাম হিমু। নব্বই দশকে হিমুর প্রথম উপন্যাস ময়ূরাক্ষী প্রকাশিত হয়। ওই উপন্যাসের হিমুর জনপ্রিয়তা কমেনি আজও। হিমু সবসময় হলুদ পাঞ্জাবি পড়ে। উপন্যাসের হিমুর প্রতি লাখো পাঠকের ভালোবাসা প্রবল। প্রাথমিক সাফল্যের পর বিচ্ছিন্নভাবে হিমু চরিত্র নিয়ে বিভিন্ন উপন্যাসে হিমুকে তুলে ধরেন হুমায়ুন আহমেদে।

ময়ূরাক্ষী, দরজার ওপাশে, হিমু , পারাপার, এবং হিমু..., হিমুর হাতে কয়েকটি নীলপদ্ম, হিমুর দ্বিতীয় প্রহর, হিমুর রূপালী রাত্রি, একজন হিমু কয়েকটি ঝিঁ ঝিঁ পোকা, তোমাদের এই নগরে, চলে যায় বসন্তের দিন, সে আসে ধীরে, আঙুল কাটা জগলু , হলুদ হিমু কালো র‍্যাব, আজ হিমুর বিয়ে, হিমু রিমান্ডে, হিমুর মধ্যদুপুর, হিমুর নীল জোছনা, হিমুর আছে জল, হিমু এবং একটি রাশিয়ান পরী, হিমু এবং হার্ভার্ড। এগুলো হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের লিখা হিমু সম্বলিত উপন্যাস ও গল্প।

কিন্তু আজও হিমুর নতুন উপন্যাসের অপেক্ষায় থাকেন পাঠকরা। তবে হিমু বিষয়ক নতুন কোনো বই আর কখনোই আসবে না। হুমায়ুন আহমেদের মৃত্যুর পর তার ভক্তরা মিলে 'হিমু পরিবহন' নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল হুমায়ুন আহমেদ যেসব স্বপ্ন দেখতেন, যা করার কথা ভাবতেন, সেগুলো করা।

আরও পড়ুন: রাবিতে ‘গাঁজা বানানোর’ সময় তিন বহিরাগত আটক।

এই সংগঠনের একজন সদস্য আহসান হাবীব মুরাদ বলেন, হুমায়ুন আহমেদের জায়গায় হুমায়ুন আহমেদ। (পরবর্তীতে) হয়তো তার চেয়ে অনেক ভালো লেখক আসতে পারে। কিন্তু তার যে ধারা, যে জায়গা, সেটা থেকেই যাবে। সেটা আর পূরণ হবে না।

তার মৃত্যুর দশ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু মনে হয় না, লেখকের শূন্যতা এখনো পূরণ হয়েছে। ওনার লিখার স্টাইল, ওনার মধ্যে পাঠককে আকৃষ্ট করার যে ক্ষমতা ছিল তা মনে হয় এখনো কোন লেখক সেইভাবে পারেন। 

আমাদের এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির দেশের তরুণদের মনের কথা ওনি যেভাবে তার লিখায় ফুটিয়ে তুলতেন তা কোন লেখই পারেন নি। আমাদের দেশের সামাজিক শ্রেণির অনেক শূন্যতা, সংকট, অবস্থা- লেখায় সমস্যাগুলো নিয়ে এসেছেন তিনি।  অনেকেরই মনে হয় না, তার লেখার সেই শূন্যতা পূরণ হয়েছে।

হুমায়ুন আহমেদের বইয়ের শূন্যতা পূরণ না হলেও আমরা চাই হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখক বাংলায় আরও আসুক। হিম, মিছির আলী, বাকের ভাই এর মতো চরিত্র দিয়ে জায়গা করে নিক পাঠক ও দর্শকদের মনে। 


সর্বশেষ সংবাদ