ঈদে পরিবার থেকে দূরে থাকলেও মন খারাপ হয় না

প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপ-সচিব) আছাদুজ্জামান
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপ-সচিব) আছাদুজ্জামান  © টিডিসি সম্পাদিত

বছর ঘুরে আবারও এসেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। আর ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ। শৈশব-কৈশরের ঈদ স্মৃতি ও ঈদ উল ফিতরের শিক্ষা, তাৎপর্য এবং বাস্তবতা নিয়ে দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের সঙ্গে কথা বলছেন যশোর জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপ-সচিব) আছাদুজ্জামান। বাবার স্মৃতি বিজড়িত যশোরের প্রতি এক বিশেষ ভালোবাসা রয়েছে তার। যদিও কর্মজীবনের অংশ হিসেবে যশোরেই ঈদ উদযাপন করতে হয় তাকে। তবে এতে কোনো আফসোস নেই, বরং ঈদ উৎসবের আনন্দ সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেন তিনি। এসব স্মৃতি নিয়ে কথা বলেছেন দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের সাথে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন যশোর প্রতিনিধি রুহুল আমিন


দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: যশোরের প্রতি আপনার ভালোবাসার একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। আপনি কি তা আমাদের পাঠকদের সাথে শেয়ার করবেন?

আছাদুজ্জামান: হ্যাঁ, যশোরের প্রতি আমার ভালোবাসা আর আবেগ একটু ভিন্নধর্মী। আমার বাবা, কবি আমির হামজা, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং এই অঞ্চলের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক ছিল। বাবার কারাবাসের সময় কমলমতি বয়সে আমি মায়ের সাথে প্রায়ই যশোরের কারাগারে যেতাম। সেই স্মৃতিগুলো আজও মনে দোলা দেয়। সেই বয়সে বাবাকে কারাগারে দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা খুবই আবেগপূর্ণ ছিল। বাবার প্রতি অন্যায় করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি কখনো তার দেশপ্রেম থেকে বিচ্যুত হননি। এসব বিষয় আমাকে যশোরের প্রতি আরও গভীরভাবে আবদ্ধ করেছে। তাই যশোর আমার কাছে শুধু কর্মস্থল নয়, বরং বাবার স্মৃতি বিজড়িত একটি আবেগঘন স্থান।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: চাকরির সুবাদে আপনাকে যশোরে ঈদ উদযাপন করতে হয়। এতে কি কখনো মন খারাপ হয়?

আছাদুজ্জামান: না, মন খারাপ হয় না। বরং কর্মস্থলে ঈদ উদযাপন করার মধ্যেও এক ধরনের আনন্দ পাই। যশোর জেলা প্রশাসনের প্রতিটি ঈদ প্রোগ্রামে আমি সক্রিয়ভাবে অংশ নিই এবং সর্বস্তরের মানুষের সাথে মিশে যাই। এতে করে কর্মস্থলকেও একপ্রকার পরিবার মনে হয়। একসময় ঈদ মানে ছিল পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, শৈশবের সেই মধুর মুহূর্তগুলো এখনো মনে পড়ে। তবে এখন কর্মস্থলে ঈদ করেও আমি আত্মতৃপ্তি পাই, কারণ এখানে আমি মানুষের সেবা করার সুযোগ পাই।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহে ঈদের নামাজ পড়ার অভিজ্ঞতা কেমন?

আছাদুজ্জামান: এটি অত্যন্ত আনন্দের একটি অভিজ্ঞতা। যশোর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠ ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিভিন্ন স্তরের প্রশাসনের কর্মকর্তা, কর্মচারী, সুধীসমাজ ও সাধারণ জনগণ একত্রে নামাজ আদায় করেন। ঈদের দিন সকালবেলা নতুন পোশাকে, পরিচিত ও অচেনা হাজারও মানুষের সাথে নামাজ আদায় করাটা এক অসাধারণ অনুভূতি। নামাজ শেষে সবাই একে অপরের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন, ঈদের শুভেচ্ছা জানান। এই পরিবেশ আমাকে যশোরের প্রতি আরও আবেগপ্রবণ করে তোলে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার শৈশবের ঈদের স্মৃতি কেমন ছিল?

আছাদুজ্জামান: ছোটবেলার ঈদ ছিল একদম ভিন্ন রকম। গ্রামে ঈদ মানেই ছিল আত্মীয়-স্বজনের মিলনমেলা, নতুন পোশাক, সুস্বাদু খাবার, আর ছোট ছোট আনন্দময় মুহূর্ত। ঈদের আগের দিন ঘরে ঘরে রান্নার গন্ধ, নতুন জামা পরে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে যাওয়া, মায়ের হাতের রান্না – এসব কিছুই আজো মনে পড়ে। ঈদের দিন সকালে বাবা আমাদের নিয়ে ঈদগাহে যেতেন, পরে দাদা-দাদির কবর জিয়ারত করতাম। এসব স্মৃতি কখনো ভোলার নয়। বর্তমানের কর্মব্যস্ত জীবনে সেই দিনগুলোর অভাব বোধ করি, তবে চেষ্টা করি কর্মস্থলেও সেসব আনন্দের কিছুটা খুঁজে নিতে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনি তো কুমিল্লা ও বান্দরবনেও ঈদ করেছেন। সেসব জায়গার ঈদের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

আছাদুজ্জামান: কুমিল্লা ও বান্দরবনে থাকার সময় আমি বাবার কারাবরণের স্মৃতি মনে করে কারাবন্দিদের সঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেছি। কারাগারের ভেতরের পরিবেশ একেবারেই আলাদা, সেখানে ঈদের আনন্দটা একটু অন্যরকম। নামাজ শেষে বন্দিদের সঙ্গে কথা বলতাম, তাদের কষ্টের কথা শুনতাম, এবং চেষ্টা করতাম কিছুটা সময় তাদের সাথে ভাগ করে নিতে। এভাবে বন্দিদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করাটা আমার কাছে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা হয়ে আছে। এতে আমি উপলব্ধি করেছি, ঈদের প্রকৃত আনন্দ কেবল নিজে উপভোগ করায় নয়, বরং অন্যদের সাথে ভাগ করে নেওয়ায়।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: কর্মব্যস্ত জীবনে পরিবারকে সময় দেওয়ার সুযোগ পান?

আছাদুজ্জামান: সত্যি বলতে, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের কারণে সময় খুব সীমিত থাকে। তবে যখনই সুযোগ পাই, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাই। সরকারি দায়িত্ব পালনে সব সময় ব্যস্ত থাকতে হয়, কিন্তু তারপরও পরিবার আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সন্তানদের সাথে সময় কাটানো, পরিবারের হাসি-আনন্দ উপভোগ করা – এসব আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত ঈদের সময় পরিবারের কাছাকাছি থাকতে পারলে আনন্দ আরও বেড়ে যায়। ঈদে যত ব্যস্ততাই থাকুক, পরিবারের জন্য অন্তত কিছুটা সময় বের করার চেষ্টা করি।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: যশোরের মানুষ ও সংস্কৃতি নিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন?

আছাদুজ্জামান: যশোরের মানুষ খুব আন্তরিক ও অতিথিপরায়ণ। এখানকার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মানুষের আন্তরিকতা—সবকিছুই আমাকে মুগ্ধ করে। যশোরের মানুষ সবসময় একে অপরকে সাহায্য করতে প্রস্তুত, যা খুবই প্রশংসনীয়। এছাড়া যশোরের ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধ। এখানকার খাবার, ঐতিহাসিক স্থান, মানুষের ব্যবহার – সবকিছুই যশোরকে আমার কাছে অন্যরকম করে তুলেছে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ভবিষ্যতে যশোরের জন্য কোনো বিশেষ পরিকল্পনা আছে?

আছাদুজ্জামান: যশোরকে একটি উন্নত ও বাসযোগ্য জেলা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আমরা কাজ করছি। উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং জনগণের কল্যাণে প্রশাসনের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে চাই। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে, যা সময়মতো বাস্তবায়ন করতে চাই। আশা করি, সবার সহযোগিতায় যশোরকে আরও উন্নত করা সম্ভব হবে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আছাদুজ্জামান: আপনাকেও ধন্যবাদ। ঈদের আনন্দ সবার সাথে ভাগ করে নেয়ার সুযোগ পেয়ে ভালো লাগছে।


সর্বশেষ সংবাদ