আক্ষেপ নিয়েই চলে গেলেন মুহসীন হলের খাবার বিক্রেতা রহিম মামা
জীবনের শেষ দিকে এসে স্বাভাবিকভাবে বাঁচার আকুতি জানিয়ে দেশবাসী ও সরকারের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের রুমে রুমে গিয়ে খাবার বিক্রি করা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রহিম মামা।
গতবছরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাবি সাংবাদিক সমিতির কার্যালয়ে হজির হয়ে বলেছিলেন, চোখ তো চলে গেছে, এটার জন্য আমার আক্ষেপ নেই। আমার চাওয়া, আমি যেন সুস্থভাবে সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকতে পারি।
সেই সুস্থভাবে বাঁচা হলো না তার। আক্ষেপ নিয়েই চলে গেলেন রহিম মামা। সোমবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে স্ট্রোক করে নিজ বাসায় মারা গেছেন বলে তার পারিবারিক সূত্রে জানা যায়। তিনি আজিমপুরের বিডিআর-৩ নাম্বার গেটে থাকতেন। তার মৃত্যুতে ঢাবি ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা শোক জানিয়েছেন।
মুহসীন হলের এক শিক্ষার্থী বলেন, রহিম মামা খুব সৎ লোক ছিলেন। তার অসুস্থতা ও মৃত্যু আমাদেরকে ব্যথিত করে। আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, রহিম মামা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী থাকা সত্ত্বেও কাজ করে খেতেন, চরম অভাব থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষাবৃত্তি করতেন না। আল্লাহ তাকে জান্নাতবাসী করুক।
আরও পড়ুন: ভালোবাসার দিনে রাস্তায় ফুটফুটে নবজাতকটি কার?
আব্দুর রহিম দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিনি সবার কাছে রহিম মামা নামেই পরিচিত। জানা যায়, তার বয়স যখন দুই বছর, তখন মাথায় হঠাৎ জলবসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে ডান চোখের দৃষ্টি শক্তি হারান। বাম চোখে ঝাপসা দেখলেও আঘাত পাওয়ার কারণে এখন একেবারেই দেখতে পান না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিনি সবার কাছে রহিম মামা নামেই পরিচিত। তিনি হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের খাবার বিক্রেতা; বয়স ৫০ এর খানিক বেশি হবে। অন্য দশজনের মতো রহিম মামার দুচোখ স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু জন্মের দুবছরের মাথায় হঠাৎ জলবসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে ডান চোখের দৃষ্টি শক্তি হারান। বাম চোখে ঝাপসা দেখলেও আঘাত পাওয়ার কারণে এখন একেবারেই দেখতে পান না।
গতবছরের জুনে রহিম মামার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে বলেছিলেন, ২০০৮ সাল থেকে মুহসীন হলে খাবার বিক্রি করে আমার দিনকাল ভালোই কাটছিল। কিন্তু হটাৎ করে বছর দুয়েক আগে আমার ডান পায়ে ব্যথা অনুভব শুরু হয়। তারপর পরীক্ষা করে জানা যায় যে, আমার ডান পায়ের প্রধান রক্তনালী অকেজো হয়ে গেছে। পায়ে রিং লাগাতে হবে, রিং লাগালে হয়ত ব্যথাটা কমে যাবে। নতুবা যদি কোনো আঘাতজনিত কারণে পায়ে ক্ষতের সৃষ্টি হয় তাহলে পা পচে যাবে, কেটে ফেলতে হবে। এরমধ্যে আবার করোনার কারণে হল বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, এখন আমি সম্পূর্ণ বেকার। আয় রোজগার নেই।
জানা যায়, কসমেটিক আইটেম বিক্রির মাধ্যমে ঢাবি ক্যাম্পাসে তিনি ব্যবসা শুরু করেন ১৯৯৬ সালে। ফেরি করে কসমেটিক আইটেম বিক্রি করতেন তিনি। বাজার প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে রহিম মামা ২০০৮ সাল থেকে মুহসিন হলে খাবার বিক্রি শুরু করেন। বাসা থেকে খাবার বানিয়ে বক্সে করে প্রতিদিন সকালে হলে নিয়ে আসেন তিনি। বাসায় রান্নার কাজে সহযোগিতা করেন স্ত্রী সফুরা বেগম।
২০২০ সালের শেষের দিকে এক পর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, এজন্য খাবার বিক্রি বন্ধ রাখেন। জানা যায়, তার পায়ের প্রধান রক্তনালী অকেজো হয়ে গিয়েছিল এবং পরবর্তীতে রিং পড়ানো হয়।