ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ হত্যার ৪ বছর: পলাতক আসামিরা এখন প্রকাশ্যে

ছাত্রলীগ নেতা দিয়াজ হত্যার ৪ বছর: পলাতক আসামিরা এখন প্রকাশ্যে
  © সংগৃহীত

২০১৬ সালের এইদিনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) দক্ষিণ ক্যাম্পাসে নিজের বাসা থেকে উদ্ধার হয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক দিয়াজের ঝুলন্ত লাশ। এ ঘটনার ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি বলে শুরু হয়নি বিচারও।

দিয়াজের পরিবারের অভিযোগ, মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরলেও তদন্তকারী সংস্থার কোনো আগ্রহ নেই আসামিদের গ্রেপ্তারে। অন্যদিকে, প্রায় তিন বছর ধরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলাটির তদন্ত করছে। এ সময়ের মধ্যে তিনবার তদন্ত কর্মকর্তা বদল হয়েছে।

জানা গেছে, ঘটনার তিন দিন পর ২৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকদের দেওয়া প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে ‘আত্মহত্যা’ উল্লেখ করা হয়। তার ভিত্তিতে হাটহাজারী থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা করে পুলিশ।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন নির্মাণ কাজের দরপত্র নিয়ে কোন্দলের সূত্র ধরে এ ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত হত্যা’ বলে শুরু থেকেই দিয়াজের পরিবার ও তার অনুসারী ছাত্রলীগের কর্মীরা দাবি করে আসছিল।

ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে ওই বছরের ২৪ নভেম্বর দিয়াজের মা জাহেদা আমিন চৌধুরী বাদী হয়ে আদালতে হত্যা মামলা করেন। তাতে চট্টগ্রাম বি শ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সেসময়ের সভাপতি আলমগীর টিপু, সেসময়ের সহকারী প্রক্টর আনোয়ার হোসেন, ছাত্রলীগ নেতা জামশেদুল আলম চৌধুরী, তাদের অনুসারী রাশেদুল আলম জিশান, আবু তোরাব পরশ, মনসুর আলম, আবদুল মালেক, মিজানুর রহমান, আরিফুল হক অপু ও মোহাম্মদ আরমানকে আসামি করা হয়।

আসামিরা সবাই চট্টগ্রামের সদ্য সাবেক মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। দিয়াজও ছিলেন নাছিরেরই অনুসারী। দিয়াজের মায়ের আপত্তিতে আদালত সিআইডিকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়।

এরপর দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা। এজন্য তখন তারা চট্টগ্রামে দিয়াজের লাশ উদ্ধারের স্থানেও যান। 

২০১৭ সালের ৩০ জুলাই দেওয়া দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তারা বলেন, দিয়াজের শরীরে হত্যার আলামত রয়েছে। ওই প্রতিবেদনের পর দিয়াজের মায়ের করা এজাহার হত্যা মামলা হিসেবে নিতে হাটহাজারী থানার ওসিকে নির্দেশ দেয় আদালত।

মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরলেও তাদের গ্রেপ্তার না করায় হতাশ দিয়াজের পরিবারের সদস্যরা। গত ১১ নভেম্বর তার বোন আইনজীবী জুবাঈদা ছরওয়ার চৌধুরী নিপা ফেসবুকে এই মামলার আসামি আলমগীর টিপুর ছবিসহ একটি স্ট্যাটাস দেন জুবাঈদা। তাতে দেখা যায় যুবলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত টিপু।

স্ট্যাটাসে জুবাঈদা লেখেন, দিয়াজ হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি এবং সিআরবি ডবল মার্ডার মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি আলমগীর টিপুর আজকের ছবি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার চোখে এখন যে পলাতক…..। ক্ষমতার কাছে মাঝে মাঝে নিজেকে খুব অসহায় লাগে।

জুবাঈদা বলেন, যুবলীগের এক অনুষ্ঠানে আসামি টিপুকে দেখা গেছে। নগরীতে তার অফিসও আছে বলে শুনেছি। কী আর বলব। চার বছর গেল, কোনো অগ্রগতি নেই। অমার মায়ের শারীরিক-মানসিক অবস্থা খুব নাজুক।

একই ছবি দিয়ে ১৩ নভেম্বর ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসে দিয়াজের মা জাহেদা আমিন চৌধুরী লেখেন, খুনিরা ক্ষমতা ও টাকার জোরে বহাল তবিয়তে ঘুরছে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে। আর আমি ক্ষমতা ও টাকার কাছে হেরে অসহায়ের মত তাদেরই ব্যঙ্গ সহ্য করেই….।

১৫ নভেম্বর দিয়াজের পুরনো কয়েকটি ছবিসহ ফেসবুকে দিয়ে জাহেদা আমিন চৌধুরী লেখেন, হায় আল্লাহ, তুমিই বলো আমার বাবারা ১৯৭১ সালে জীবন বাজিয়ে দেশ কেন স্বাধীন করেছিল? এমন আফসোস মন থেকে কে তাড়াবে।

মামলার অগ্রগতি ও আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আবদুস সালাম মিয়া বলেন, তদন্ত চলছে। আসামিদের দু’জন গ্রেপ্তারের পর জামিনে আছেন। বাকিরা পলাতক।

আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরছে, দিয়াজের পরিবারের এমন দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য থাকলে অবশ্যই তাদের ধরবো। এখনো সেরকম কোনো তথ্য পাইনি।

মামলার আসামি সাবেক সহকারী প্রক্টর আনোয়ার হোসেন চৌধুরী একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ১০ নভেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। ওই মামলায় জামিনের আবেদন করলেও ১৭ নভেম্বর আবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সময়ের আবেদন করলে জামিন শুনানি পিছিয়ে যায়। 

অন্যান্য আসামিদের মধ্যে মনসুর আলম ও আবদুল মালেকের বিরুদ্ধে চলতি বছর ২৩ জুন বিশ্ববিদ্যালেয়ে নির্মাণকাজে বাধা দেওয়া ও ঠিকাদার অফিস ভাংচুরের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের ব্যানারে নানা অনুষ্ঠানে এজহারভুক্ত অন্যান্য আসামিদেরও দেখা যায়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর ড. আতিকুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোন অপরাধীকে ছাড় দেবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যদি সুনির্দিষ্ট তথ্য নিয়ে ক্যাম্পাসে অভিযান পরিচালনা করে সেক্ষেত্রে তাদের সর্বোচ্চ সহযোগীতা করা হবে।


মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ