২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:০২

চেক প্রজাতন্ত্র হতে পারে আপনার পছন্দের গন্তব্য

স্কলারশিপে মধ্য ইউরোপের চেক প্রজাতন্ত্রে পড়াশোনা করতে চাইলে জেনে নিন দেশটির খুঁটিনাটি নানা বিষয়ে  © সংগৃহীত

বিদেশে উচ্চশিক্ষায় চেক প্রজাতন্ত্র ইউরোপের একটি উন্নত দেশ, যার শিক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন। ইউরোপে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় অন্যতম একটি দেশ হতে পারে চেক প্রজাতন্ত্র। উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, গবেষণার সুযোগ, শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং উচ্চ অ্যাকাডেমিক মানের কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা শিক্ষার জন্য পাড়ি জমায় চেক প্রজাতন্ত্রে। ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় এখানে জীবনযাত্রার খরচ ও টিউশন ফি তুলনামূলকভাবে কম।

বর্তমানে চেকের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে প্রায় পঞ্চাশ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চেক এবং ইংলিশ দুই মিডিয়ামে ব্যাচেলর, মাস্টার এবং পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু আছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং চিকিৎসাশাস্ত্রের মতো শাখায় রয়েছে শিক্ষার সুযোগ। রয়েছে পড়াশোনা শেষে চাকরির সুবিধা। চলুন জেনে নেওয়া যাক বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আপনি কেন চেক প্রজাতন্ত্রকে বেছে নেবেন। 

চেক প্রজাতন্ত্র সম্পর্কে কিছু কথা

এটি মধ্য ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। রূপকথার গল্প, প্রাণবন্ত সংস্কৃতি এবং দুর্দান্ত স্থাপত্যের জন্য বিখ্যাত চেক প্রজাতন্ত্র। দেশের মধ্যভাগে অবস্থিত বৃহত্তম শহর ও রাজধানীর নাম প্রাগ। ঐতিহাসিক বোহেমিয়া অঞ্চল, মোরাভিয়া অঞ্চল ও সাইলেসিয়া অঞ্চলের অংশবিশেষ নিয়ে দেশটি গঠিত। ইউরোপের অনেক দেশই শরণার্থী সংকটে বিপর্যস্ত। তবে কয়েকটি দেশ এ সংকট থেকে নিজেদের বাইরে রেখেছে। তেমনই এক দেশ চেক প্রজাতন্ত্র। চেক প্রজাতন্ত্রের ইতিহাস ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধ। গথিক, রেনেসাঁস, বারোক ও আধুনিক ধাঁচের স্থাপত্যকলা, নৈসর্গিক দৃশ্যাবলিসমৃদ্ধ গ্রামাঞ্চল, প্রাচীন প্রাসাদ, স্বাস্থ্যসম্মত খনিজ ঝরনা বা স্পা, ফ্রান্ৎস কাফকার লেখা আর আন্তোনিন দ্ভোরাকের সংগীতের জন্য দেশটি বিখ্যাত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশটি সোভিয়েত প্রভাবাধীন ছিল।

উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা

চেক প্রজাতন্ত্রে বর্তমানে প্রায় ২৬টি সরকারি ও ৩৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো চার্লস ইউনিভার্সিটি ইন প্রাগ, যা ১৩৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। চেক প্রজাতন্ত্রের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চেক মিনিস্ট্রি অব এডুকেশন, ইয়ুথ অ্যান্ড স্পোর্টস দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

আরও পড়ুন: উচ্চশিক্ষায় স্কলারশিপ দিচ্ছে আয়ারল্যান্ড সরকার, আবেদন স্নাতক-স্নাতকোত্তর-পিএইচডিতে

চেক প্রজাতন্ত্রের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয়

*চার্লস ইউনিভার্সিটি (Charles University)। কিউএস র‍্যাঙ্কিংয়ে ২৪৬। 

*চেক টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি (Czech Technical University)।  কিউএস র‍্যাঙ্কিংয়ে ৪১৬। 

*মাসারেক ইউনিভার্সিটি (Masaryk University) ।  কিউএস র‍্যাঙ্কিংয়ে ৪০৮। 

*ব্রনো ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি।  কিউএস র‍্যাঙ্কিংয়ে * ৫৭৫। 

*ইউনিভার্সিটি অব কেমিস্ট্রি অ্যান্ড টেকনোলজি, প্রাগ । কিউএস র‍্যাঙ্কিংয়ে ৫৭০।

*প্যালাস্কি ইউনিভার্সিটি অলোমৌচ।  কিউএস র‍্যাঙ্কিংয়ে ৬৫০।

*চেক ইউনিভার্সিটি অব লাইফ সায়েন্সেস প্রাগ।  কিউএস র‍্যাঙ্কিংয়ে ৭০১ ।

*ইউনিভার্সিটি অব ইকোনমিক্স (University Of Economics) ।

আরও পড়ুন: ফুল ফ্রি স্কলারশিপে স্নাতকোত্তর-পিএইচডি করুন কাতারের ইউনিভার্সিটিতে, আবাসনসহ থাকছে নানা সুবিধা

ভাষা

চেক প্রজাতন্ত্রে চেক ভাষায় পড়াশোনা করলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি প্রায় বিনা মূল্যে। তবে ইংরেজি মাধ্যমে পড়ানো অধিকাংশ কোর্সের জন্য টিউশন ফি প্রযোজ্য। ইংরেজি মাধ্যমে পড়তে চাইলে সাধারণত IELTS, TOEFL বা সমমানের ভাষাদক্ষতার সনদ প্রয়োজন হয়। কিছু ক্ষেত্রে MOI (Medium of Instruction) গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
চেক ভাষায় পড়াশোনার জন্য অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক বছরের ফাউন্ডেশন বা ভাষা প্রস্তুতি কোর্স করানো হয়। ভাষা পরীক্ষায় সাধারণত B2 স্তর এবং কিছু প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে C1 স্তর প্রয়োজন হতে পারে।

আবেদন প্রক্রিয়া

সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে আবেদন গ্রহণ শুরু হয় ডিসেম্বর থেকে মার্চ–এপ্রিলের মধ্যে, বিশেষ করে ইংরেজি-মাধ্যমে প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে সময়সীমা আলাদা হতে পারে। অনলাইনে আবেদন সম্পন্ন করার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ডাকযোগে পাঠাতে হয়। যাচাই-বাছাই শেষে সাধারণত মে–জুনের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

আরও পড়ুন: স্কলারশিপে স্নাতক-স্নাতকোত্তর-পিএইচডিতে পড়ুন তুরস্কে, সম্পূর্ণ টিউশন ফিসহ থাকছে নানা সুবিধা

প্রয়োজনীয় নথিপত্র

*শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণের সত্যায়িত কপি। 

*সনদ এবং অ্যাকাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট ইংরেজির পরিবর্তে বাংলায় হলে সেগুলো চেক বা ইংরেজিতে অনুবাদ এবং নোটারি করে নিতে হবে।

*প্রশাসনিক ফি প্রদানের প্রমাণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভেদে এর পরিমাণ ভিন্ন হয়ে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২০ ইউরো থেকে শুরু হয়ে ৫০ ইউরোর অধিক হতে পারে।

*মোটিভেশন লেটার। 

*২ থেকে ৩টি রেফারেন্স লেটার। 

*জীবনবৃত্তান্ত (সিভি)।

*বৃত্তি পেলে বা অন্য কেউ পড়াশোনার খরচ বহন করলে তার প্রমাণ। 

*ইংরেজি দক্ষতা পরীক্ষা (সাধারণত পিটিই অ্যাকাডেমিক, টিওইএফএল ও আইইএলটিএস স্কোর দেখা হয়)। 

আরও পড়ুন: স্কলারশিপে পড়াশোনা করুন অস্ট্রেলিয়ার মোনাশ ইউনিভার্সিটিতে, আবেদন স্নাতকোত্তর-পিএইচডিতে

ভিসা আবেদনপদ্ধতি

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পাওয়ার পর শিক্ষার্থীকে তার ভিসার কাজ শুরু করে দিতে হবে। চেক প্রজাতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি ডি-টাইপ ক্যাটাগরিই হচ্ছে স্টুডেন্ট ভিসা, যেখানে ৯০ দিনের বেশি সময় থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। ভিসার মেয়াদ সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। পরবর্তীতে ভিসা আবার রিনিউ করতে হয়। 

ভিসা আবেদন অনলাইনে করা যাবে। এ ছাড়া ফর্ম ডাউনলোড করে কম্পিউটারের মাধ্যমে অথবা প্রিন্ট করে হাতে লিখেও পূরণ করা যেতে পারে। ফর্মের সব তথ্য নির্ভুলভাবে প্রদানের পর সবশেষে সই করতে হবে। অনলাইনে আবেদনের লিংক  https://frs.gov.cz/en/forms-and-documents/ 

প্রয়োজনীয় নথিপত্র

*বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত ভর্তির অফার লেটার। 

*দুটি ফাঁকা পৃষ্ঠাসহ একটি বৈধ পাসপোর্ট। (মেয়াদ ন্যূনতম ৩ মাস) । 

*পাসপোর্ট সাইজের ছবি। 

*দেশটিতে থাকার জন্য আর্থিক তহবিলের প্রমাণপত্র (কমপক্ষে ৭৮ হাজার ২৫০ কোরুনা)। 

*মেডিকেল রিপোর্ট। 

*আবাসন নিশ্চিতকরণের প্রমাণ। 

*পুলিশ ক্লিয়ারেন্স (অফিশিয়াল রাবার স্ট্যাম্পসহ চেক ভাষায় অনুবাদ করা হতে হবে)। 

*চেক প্রজাতন্ত্রে পৌঁছার দিন থেকে কমপক্ষে ৯০ দিনের জন্য ভ্রমণ চিকিৎসা বিমার প্রমাণপত্র। 

উল্লেখ্য, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও পাসপোর্ট ছাড়া আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত সব নথি চেক ভাষায় হতে হবে। পাসপোর্ট ও ছবি ছাড়া কোনো নথি ১৮০ দিনের বেশি পুরোনো হতে পারবে না। 

আরও পড়ুন: জেনে রাখুন বিশ্বসেরা ২৯ স্কলারশিপের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট

ভিসার জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেবেন কীভাবে

বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের চেক প্রজাতন্ত্রের  ভিসার যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য যেতে হয় ভারতের নয়াদিল্লিতে। তাই আবেদনপত্রসহ ভিসার সম্পর্কিত সব নথি সেখানেই জমা দিতে হবে। তবে আবেদন জমা দেওয়ার আগে ই-মেইলের মাধ্যমে চেক দূতাবাসের কাছ থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি ডি-টাইপ ভিসার আবেদনকারীদের জন্য দূতাবাসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার একটি নির্দিষ্ট বুকিং সিস্টেম রয়েছে। বুকিং সিস্টেম প্রতি মাসের প্রথম সোমবার (কর্মদিবস হতে হবে) ভারতীয় সময় বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে চালু করা হয়। আবেদনকারীকে এ সময়ের মধ্যে newdelhi.visa@mzv.gov.cz ই-মেইল ঠিকানায় অ্যাপয়েন্টমেন্টের আবেদন পাঠাতে হবে।

নির্ধারিত তারিখে সকল নথির মূল কপিসহ ভিসার সব কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে দূতাবাসে সশরীর উপস্থিত হতে হবে। দূতাবাসে সাক্ষাৎকারের ক্ষেত্রে চেক, ইংরেজি অথবা হিন্দি ভাষা ব্যবহার করা হয়। বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আগে থেকেই যথাযথ প্রস্তুতি নিয়ে সাক্ষাৎকারে উপস্থিত হতে হবে। ভিসা আবেদন ফি ২ হাজার ৫০০ কোরুনা। ভিসার কার্যক্রম সম্পূন্ন হতে সাধারণত ৬০ থেকে ৯০ কর্মদিবস লাগে। আবেদন মঞ্জুর হয়ে গেলে ই-মেইলের মাধ্যমে ভিসা সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হবে।

ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত দূতাবাসের ঠিকানা: ৫০-এম, নীতি মার্গ, চাণক্যপুরী, নতুন দিল্লি, দিল্লি-১১০০২১, ভারত।

আরও পড়ুন: জেনে নিন বিশ্বসেরা ১০ ফুল-ফ্রি স্কলারশিপ সম্পর্কে

কাজের সুযোগ

ইউরোপীয় নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা সাধারণত সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজের সুযোগ পায়। নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ করলে আইনগত জটিলতা ও ভিসা সমস্যার সম্ভাবনা থাকে—তাই নিয়ম মেনে কাজ করা জরুরি।

ইউরোপের প্রাণকেন্দ্রে বসবাস

চেকপ্রজাতন্ত্রে বসবাস করা মানে ইউরোপের কেন্দ্রে বসবাস করা, কারণ চেক প্রজাতন্ত্রকে চারটি দেশ ঘিরে রেখেছে। দেশটির উত্তরে পোল্যান্ড, পূর্বে স্লোভাকিয়া, দক্ষিণে অস্ট্রিয়া এবং পশ্চিমে জার্মানি। মাত্র দুই তিন ঘণ্টার প্লেন অথবা বাসে ভ্রমণ করে পৌঁছে যেতে পারবেন পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে।

স্বাস্থ্যসেবা ও বায়োটেকনোলজি

বয়স্ক জনসংখ্যা, স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো এবং চিকিৎসা গবেষণায় ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি উন্নতি করছে। জৈবপ্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট, বায়োটেকনোলজি গবেষক এবং স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের জন্য ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে দেশটি অনেক এগিয়ে।

আরও পড়ুন: জেনে নিন মধ্যপ্রাচ্যের ১১ স্কলারশিপ সম্পর্কে

চাকরি ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগ

স্নাতক শেষ করার পর শিক্ষার্থীরা চাকরি খোঁজার জন্য অতিরিক্ত সময়ের জন্য রেসিডেন্স পারমিটের আবেদন করতে পারে। টানা ৫ বছর বৈধভাবে বসবাস করলে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।