বাংলাদেশ ও বিশ্ব মঞ্চে 'থ্রি জিরো তত্ত্ব'

মো. তানভীর সিদ্দিকী
মো. তানভীর সিদ্দিকী   © সংগৃহীত

থ্রি জিরো তত্ত্ব বা 'তিন শূন্য' তত্ত্ব একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে নতুন বিশ্ব গড়তে সাহায্য করবে। এই তত্ত্বের মাধ্যমে ড. ইউনূস একটি সমতাভিত্তিক ও স্থিতিশীল পৃথিবীর ধারণা তুলে ধরেছেন, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং পরিবেশগত সুরক্ষা একসঙ্গে চলবে। তত্ত্বটি শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নির্গমন— এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য অর্জনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। 

২০১৫ সালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে 'সামাজিক ব্যবসা দিবস' উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার বক্তব্যে তিনি এ তত্ত্ব তুলে ধরেন। এরপর ২০১৭ সালে প্রকাশিত 'A World of Three Zeros' নামক গ্রন্থে  তিনি পৃথিবীর তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের সমাধানের ব্যাপারে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এছাড়া, ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনের ভাষণে তিনি 'থ্রি জিরো' নিয়ে কথা বলেন। সবশেষ ২০২৪ সালের  ১৩ নভেম্বর জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করে নতুন বিশ্ব গড়তে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে (কপ ২৯) 'থ্রি জিরো' তত্ত্ব তুলে ধরেন তিনি। 

ড.ইউনূসের মতে 'থ্রি জিরো' লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন চার মহাশক্তি  তারুণ্য, প্রযুক্তি, সুশাসন ও সামাজিক ব্যবসা।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার ১৮.৭% এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬%। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের জুলাই - সেপ্টেম্বর সময়ের ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে বলা হয়েছে বাংলাদেশে বেকার  (নারী-পুরুষ উভয়ই)  রয়েছে ২৬ লাখ ৬০ হাজার জন। এছাড়া, কার্বন দূষণ বা পরিবেশ দূষণেও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। 

বাংলাদেশে এই 'থ্রি জিরো তত্ত্ব' অর্জনে ড. ইউনূসের পরামর্শ— দারিদ্র্য দূরীকরণে প্রচলিত অর্থব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করতে হবে। পাশাপাশি মাইক্রোফাইন্যান্স উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। তার মতে সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে দরিদ্রদের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ উন্মোচিত হবে, যেখানে লাভের চেয়ে সমাজের কল্যাণ বেশি প্রাধান্য পাবে। 

শূন্য বেকারত্ব অর্জনে ড. ইউনূস বলেন, উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। বেকার গোষ্ঠীকে উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ ও প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দিলে তারা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে একটি স্বাবলম্বী জীবিকা গড়ে তুলতে পারবে। এতে ধীরে ধীরে বেকারত্বের হার কমে আসবে।   

শূন্য নিট কার্বন নির্গমনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য বলে মনে করেন ড. ইউনূস। এক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর জোর দেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি পরিবেশবান্ধব অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ  করেন।

২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকের মূল বার্তা ছিল নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের 'থ্রি জিরো'। গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমস আয়োজনে এ তিন বিষয়কে মূল ভূমিকায় রেখে সব পরিকল্পনা করা হয়। অলিম্পিক ভিলেজের জন্য বেছে নেওয়া হয় প্যারিস শহরের অন্যতম অনুন্নত অঞ্চল সেইন্ট ডেনিসকে। সামাজিক ব্যবসা কর্মসূচিকে অলিম্পিকের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতেই নেওয়া হয় এমন উদ্যোগ। এই পরিকল্পনার কারণে সেখানে গড়ে ওঠে বেশকিছু ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যা তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। কার্বন দূষণ কমাতে সেখানে রাখা হয়নি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের বাড়তি ব্যবস্থা। ইন্টেরিয়র ডিজাইন এমনভাবে করা হয় যাতে বাইরের তাপমাত্রা থেকে ভেতরের তাপমাত্রা অন্তত ছয় ডিগ্রি কম থাকে এবং প্রতি বর্গমিটারে ৩০% কম দূষণ হয়। কার্বন মিশ্রিত কংক্রিটের পরিবর্তে  ব্যবহার করা হয় কাঠ। অন্তত ৪০ শতাংশ সবুজ রাখার চেষ্টায় লাগানো হয় নয় হাজার গাছ। 

২০২৪ সালে রোমে ড. ইউনূস এবং পোপ ফ্রান্সিস একসঙ্গে 'পোপ ফ্রান্সিস-ইউনূস থ্রি জিরো ক্লাব' প্রতিষ্ঠা করেন। মানবতার জন্য একটি রূপান্তরমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের সূচনা করার প্রয়াসে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে অন্তত ৪,৬০০টি  থ্রি  জিরো ক্লাব রয়েছে, যার সবগুলোই ড. ইউনূসের নতুন সভ্যতার স্বপ্নে অনুপ্রাণিত। 

এছাড়াও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের ক্ষেত্রে 'থ্রি-জিরো' তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করছে। ড. ইউনূসের থ্রি জিরো তত্ত্বের ধারণা বাংলাদেশ তরুণদের ক্ষমতায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে কৃষি খাতে একটি নতুন বিপ্লব ঘটানোর সম্ভাবনা রাখে। 

বিশ্বকে সমতাভিত্তিক এবং টেকসই ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে নিতে ড. ইউনূসের 'থ্রি জিরো' তত্ত্ব একটি অনন্য উদাহরণ। এই থ্রি জিরো তত্ত্ব বাস্তবায়ন করা গেলে দেখা মিলবে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও কার্বন মুক্ত বাংলাদেশ ও বিশ্ব। 

লেখক: মো. তানভীর সিদ্দিকী
শিক্ষার্থী, সমাজকর্ম বিভাগ
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


সর্বশেষ সংবাদ