মায়ের স্বপ্ন পূরণে প্রথম বিসিএসেই প্রশাসন ক্যাডার ঢাবির নবমিতা

নবমিতা সরকার
নবমিতা সরকার  © টিডিসি ফটো

নবমিতা সরকার। বেড়ে উঠেছেন ময়মনসিংহের জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার হরিয়াখালী গ্রামে। ছোটবেলায় মা ঘুমপাড়ানির ছলে স্বপ্ন দেখাতেন বড় হওয়ার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা দুরন্তপনা এই শিক্ষার্থী প্রথম বিসিএসে পেয়েছেন সাফল্য। ৪৩ তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে হয়েছেন সুপারিশপ্রাপ্ত। তার বিসিএস জয়ের গল্প শুনেছেন দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের—আমান উল্যাহ আলভী।


দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: সাফল্য নিয়ে আপনার অনুভূতি জানতে চাই।
নবমিতা সরকার: ‘সফলতা’ খুব আপেক্ষিক একটি শব্দ। কেবল ‘বিসিএস উত্তীর্ণ’ শব্দবন্ধে সফলতার সংজ্ঞায়ন সম্ভব নয়। তবে নিজেকে প্রতিনিয়ত মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে যে প্রচেষ্টা সেখানে আমি নিরন্তর সফল হতে চাই।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার শৈশব নিয়ে বলুন।
নবমিতা সরকার: খুব মনে পড়ে দুরন্তপনা, মেঠো রাস্তা ধরে সাইকেল চালানো, গরুর জন্য বিলের ধারে খেতের আল থেকে খাঁচাভর্তি ঘাস তুলে আনা; মনে পড়ে দূর থেকে কলস ভর্তি পানি এনে ঘরের জলাধার পূর্ণ করে রাখা (তখন এখনকার মতো সুপেয় পানির সহজলভ্যতা ছিল না)। আমার শৈশব ছিল আমার মায়ের মতোই অক্লান্ত সুন্দর। 

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানতে চাই
নবমিতা সরকার: আমার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের হরিয়াখালী গ্রামে। আমার স্কুল জীবনের শুরু নারায়নপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। এরপর বড়হিত উচ্চ বিদ্যালয় ও গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ময়মনসিংহ থেকে মাধ্যমিক পাস করি। মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (২০১৫-১৬) সেশনে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ স্নাতক সম্পন্ন করি এবং একই বিভাগ থেকে (২০১৯-২০) সেশনে স্নাতকোত্তর শেষ করেছি।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: প্রস্তুতির সময়টা কেমন ছিল?
নবমিতা সরকার: বিসিএস বা যেকোনো চাকুরির প্রস্তুতি মূলত পরোক্ষভাবে নিরন্তর চলমান একটি প্রক্রিয়া। ছোটবেলায় মা ঘুমপাড়ানির ছলেও স্বপ্ন দেখাতেন বড় হওয়ার, "we shall overcome" গান শেখাতেন মা আমায়, সেই থেকেই শিক্ষার্জন শুরু। বিশ্বজোড়া এবং জনমভর সবাই চির শিক্ষার্থী। পড়াশোনা ও আড্ডা বরাবরই আমার প্রিয়তম কাজ, বন্ধু-সিনিয়র-জুনিয়র মিলে আড্ডার ছলে পড়াশোনা হতো দারুণ, সেটা খুব কাজে লেগেছে। যেহেতু এটি আমার পাওয়া প্রথম বিসিএস ছিল এবং পরীক্ষাগুলোর সময় আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী, তাই একাডেমিক চাপ ও গবেষণা কাজ (মাস্টার্স - থিসিস) এর চাপ ছিল অনেক, চাকরির প্রস্তুতির জন্য বিশেষভাবে সময় বের করা সম্ভব ছিল না।

সকাল থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত ল্যাবে কাজ শেষে ক্লান্ত হয়ে আবার ৩/৪ টা টিউশনি, কোচিংয়ে ক্লাস নেওয়া, রান্না করে খাওয়া, আবার বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ। সব মিলিয়ে চাকরির জন্য বাজারে পাওয়া বই পড়ার সুযোগ হয়নি কখনো।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: এর বাইরে প্রস্তুতির বিশেষ কোনো টেকনিক ছিল কিনা, কোন বিষয়টি আপনাকে প্রস্তুতি এগিয়ে রেখেছিল বলে মনে করেন
নবমিতা সরকার: বিশেষ টেকনিক বলতে সবসময় একটি বিষয় মাথায় রেখেছি - অনেক জানতে হবে, অনেক শিখতে হবে, অনেক বুঝতে হবে। গ্রুপ-ডিসকাশনে সবাই মিলে টক-শো এর মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি নিয়ে বাংলায় ও ইংরেজিতে বক্তব্য করতাম, যা পরীক্ষার প্রতি ভীতি দূর করে বরং আত্মপ্রকাশের আনন্দ দান করেছে। তাছাড়া টিউশনি করানো ও কোচিং-এ পড়ানো নিঃসন্দেহে বড়ো সহায়ক।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: পরিবার সম্পর্কে- যেগুলো বলা যায়
নবমিতা সরকার: আমার বাবা একজন মহৎ হৃদয়ের কোমলপ্রাণ মানুষ। আর আমার মা একজন জীবন্ত সংশপ্তক, শ্রীমদভগবদগীতায় উল্লিখিত নিষ্কামকর্মীর মতো ধর্মপ্রাণ নারী। আমরা ভাই-বোন তাঁদের মতো হওয়ার দীক্ষা আজীবন লালন করে যাবো।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: ক্যাডার চয়েজ আপনি কীভাবে দিয়েছিলেন? কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে ক্যাডার চয়েজ দেওয়া উচিত?
নবমিতা সরকার: একজন শিক্ষার্থী পুরো শিক্ষাজীবনের মধ্য দিয়ে অনুভব করতে পারে তার কী ধরনের কাজে কর্মদক্ষতা ও আগ্রহ অধিক, সেটা অনুধাবন করেই চয়েজ দেওয়া উচিত, টাকা-পয়সা চিন্তা করে নয়। শান্তিতে বাঁচতে অতিরিক্ত টাকা নিষ্প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে পররাষ্ট্র, প্রশাসন ও শিক্ষা এই তিনটি বরাবরই আমার সর্বাধিক আগ্রহের। তিনটির যেকোনোটিতেই আমি সন্তুষ্ট। 

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: যারা বিসিএস দিতে চান, তাদের প্রতি পরামর্শ কি থাকবে?
নবমিতা সরকার: পরামর্শ দেওয়ার যোগ্যতা নেই। এতো কঠিন পরীক্ষায় তিনটি ধাপ যারা অতিক্রম করেন তারা নিঃসন্দেহে মেধাবী, আত্মপ্রত্যয়ী ও ধৈর্যশীল। আমার একটাই অনুরোধ আনন্দের সাথে পড়াশোনা করতে হবে। জীবনের জন্য চাকরি, চাকরির জন্য জীবন নয়। সাংগঠনিক কাজ, সংস্কৃতি চর্চা, সাহিত্য চর্চা, বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে গল্প-আড্ডায় মেতে থাকা, সামাজিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এসবকিছু একজন মানুষের মস্তিষ্ককে আরও উৎকৃষ্ট ও সৃজনশীল ধারক হিসেবে তৈরি করে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: চাকরিপ্রার্থীদের বিসিএসকে একমাত্র লক্ষ্য বানানো কি ঠিক?
নবমিতা সরকার: বিসিএসকে একমাত্র লক্ষ্য বানানো কিছুতেই উচিত নয়। স্বকর্ম ও স্বধর্মের বল-এ মানুষ করতে পারে এমন অনেক সুন্দর, শোভন, কল্যাণকর পেশা আছে। সেদিকে নজর দিতে হবে। মেধা ও মননের উপর আত্মবিশ্বাস রেখে বহুমুখী কর্মক্ষেত্রে আগ্রহের জায়গায় ঠাঁই করে নিতে হবে।

বাংলাদেশে বর্তমানে 'বেকারত্ব' শব্দটি কৃত্রিমরূপে সৃষ্ট (কথাটি হাস্যকর ঠেকলেও যৌক্তিক ও বাস্তব), দৃঢ় সদিচ্ছা থাকলে কর্মক্ষম মানুষের দ্বারা বেকার থাকা সম্ভব নয়। চাওয়া অনুযায়ী সব পেতে হবে - এমন ভাবনা অমূলক আর চাওয়া-পাওয়ার হিসাবে উদারপন্থি হতে হবে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই
নবমিতা সরকার: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজানো নেই, তবে  মনের ভিতর এলোপাথাড়ি ঘুরে বেড়ায় অনেক বড়ো বড়ো স্বপ্ন। আপাতত স্বপ্ন হলো সৎ, দক্ষ, পরিশ্রমী, নিরহংকার, মানবিক ও সদাপ্রস্তুত সেবক হিসেবে জনগণের কল্যাণে দায়িত্ব পালনে মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাঁচা।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: এমন কোনো ঘটনা যা এই পরীক্ষার সাথে সম্পৃক্ত আপনি বলতে চান
নবমিতা সরকার: পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন শীতের গাম্ভীর্যে ঢাকা বিকেলে আমি কাঁপা হাতে নিজের রেজিস্ট্রেশন নম্বরটি খুঁজেছিলাম৷ নিজের চোখ-কে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। নম্বরটি খুঁজে পেয়ে মাটিতে কপাল ঠেকিয়ে প্রণাম করেছিলাম এবং কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। সে মুহূর্তটি আমার মনুষ্যত্ববোধের অক্ষয় দীক্ষা হয়ে থাকবে।

দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাস: আপনার গুরুত্বপূর্ণ সময়ের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
নবমিতা সরকার: দ্যা ডেইলি ক্যাম্পাসের জন্যেও শুভ কামনা রইলো।


সর্বশেষ সংবাদ