যে কারণে শীতকালে হার্ট অ্যাটাক বেশি হয়

  © ফাইল ছবি

পৌষ আসার আগে অগ্রহায়ণের শেষেই জেঁকে বসতে শুরু করে শীত। শীতে প্রকৃতির সাথে সাথে   শরীরেও নানা পরিবর্তন সাধিত হয়। প্রকৃতিতে তাপমাত্রার ওঠানামার সঙ্গে দেহেও তাপমাত্রার প্রভাব পড়ে। পরিবর্তিত আবহাওয়ার সঙ্গে তাল মেলাতে দেহযন্ত্রটিকে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালাতে হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের রোগবালাই সবচেয়ে কম থাকে নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রায় (১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। এর কম বা বেশি তাপমাত্রায় অনেক ধরনের অসুখবিসুখের প্রকোপ বাড়ে। শীতে অন্যান্য রোগের পাশাপাশি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়। বিশেষ করে হঠাৎ যখন তাপমাত্রা বেশি কমে যায়, তখন এই ঝুঁকি অনেক বাড়ে। দেখা গেছে, হঠাৎ শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়ে তা যদি দুই-তিন দিনের বেশি স্থায়ী হয়, তবে তাতে হার্ট অ্যাটাক ও হার্ট অ্যাটাকজনিত হঠাৎ মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

 

শীতে হার্ট অ্যাটাক কেন বেশি হয়?

গবেষণায় দেখা গেছে, হঠাৎ মাত্রাতিরিক্ত শীতের মুখোমুখি হলে মানুষের রক্তনালি সংকুচিত হয়ে পড়ে। এতে অভ্যন্তরীণ রক্তচাপ বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে রক্তের অভ্যন্তরীণ কিছু জৈব-রাসায়নিক পরিবর্তনও ঘটে। এ কারণে রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। তাই আগে থেকেই যাদের রক্ত জমাট বেঁধে যাওয়ার প্রবণতা আছে, তাদের রক্ত জমাট বেঁধে থ্রম্বসিস বেশি ঘটে। আর এই থ্রম্বসিস বা জমাট রক্ত বাঁধার ঘটনা যখন হার্টের করোনারি আর্টারিতে হয়, তখন হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।

 

শীতকালে হৃদরোগীদের প্রয়োজনীয় সতর্কতা বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন- জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডা. মীর জামাল উদ্দিন

ঠাণ্ডা আবহাওয়া, কুয়াশা, ধুলাবালি—সব কিছু মিলে শীতকালে হৃদযন্ত্রের রোগ-বালাই ও শ্বাসকষ্টের প্রকোপ কিছুটা বৃদ্ধি পায়। শীতকালে এমনিতেই রক্তের চাপ বাড়ে। দেহের তাপমাত্রা ৯৬ ডিগ্রির নিচে নেমে গেলে অনেক সময় হাইপোথার্মিয়া (অস্বাভাবিকভাবে তাপমাত্রা কমে যাওয়া) হয়। এতেও হৃদযন্ত্রের ধমনিগুলো সংকুচিত হয়ে হৃদযন্ত্রের ওপরও চাপ বাড়ায়। তা ছাড়া অতিরিক্ত শীত মনকেও নাড়া দেয়, মানসিক সমস্যাও তৈরি করে। এসব কারণে বুকে ব্যথা হতে পারে।


হার্ট অ্যাটাক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এর ঝুঁকি বেশি যাদের
*হার্ট অ্যাটাক বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এর ঝুঁকি বেশি যাদের
*আগে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে এমন ব্যক্তি।
*অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ ও অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের রোগী।
ধূমপায়ী।
*যাঁরা বসে বসে কাজ করেন বেশি অথবা কায়িক পরিশ্রম করেন না।


হার্ট অ্যাটাক ও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট আলাদা
অনেকে মনে করেন, হার্ট অ্যাটাক এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এক বিষয়। কিন্তু দুটিই জরুরি এবং বিপজ্জনক পরিস্থিতি হলেও তা আসলে এক নয়। শীতের সঙ্গে এর সরাসরি যোগসূত্র না থাকলেও জেনে রাখা ভালো যে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টকে কেউ যেন হার্ট অ্যাটাক ভেবে ভুল না করে।

হার্টের ধমনি যখন ব্লক (রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়) হয়ে যায়, তখন হার্ট অ্যাটাক হয়। এই সময় হৃেপশি পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও পুষ্টি পায় না। চিকিৎসাশাস্ত্রে হার্ট অ্যাটাককে সার্কুলেশন সমস্যা বলে। মাইল্ড অ্যাটাক বা মৃদু অ্যাটাক হলে ক্ষতি কম হয়। আর বড় ধরনের অ্যাটাকে হার্ট মাসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় রোগী মারাও যায়।

অন্যদিকে, কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলো হার্টের বিট বন্ধ হয়ে যাওয়া। যা হঠাৎ করে ঘটে থাকে, যাকে বলে ইলেকট্রিক্যাল প্রবলেম। এটা হার্টের ধমনির ব্লকের জন্য অথবা ইলেকট্রিক্যাল ব্লকের জন্য ঘটে থাকে। তখন হৃদযন্ত্র, মস্তিষ্ক, ফুসফুস ইত্যাদি অঙ্গে রক্ত পাঠাতে ব্যর্থ হয়। এ ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যেই রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে। তখন যত তাড়াতাড়ি সিপিআর (কার্ডিও পালমোনারি রিসাসিটেশন) দেওয়া শুরু করা যায়, ততই রোগীর জন্য মঙ্গল। অনেক সময় হার্ট অ্যাটাক থেকেও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়।


হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ
১০ শতাংশ হার্ট অ্যাটাক নীরবেই ঘটে যায়, যাকে সাইলেন্ট হার্ট অ্যাটাক বলে। এর পরও কিছু কিছু লক্ষণ থাকে। যেমন—

*অ্যাটাকের শুরুতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়, বুকে অস্বস্তি বা ব্যথা হয়। মনে হতে পারে, কেউ বুক চেপে ধরেছে। তবে বুকে ব্যথা হবেই—এমন নিশ্চয়তা নেই।
*শরীরের অন্য কোথাও যেমন বাহু, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালেও ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
*হালকা মাথা ঘোরা অনুভূত হওয়া।
*কাশি, বমি বমি ভাব, প্রচুর ঘাম বের হতে পারে।
*চোখে ঝাপসা দেখা, ঘর্মাক্ত হওয়া ইত্যাদি।


হার্ট অ্যাটাক হলে
সাধারণত চার ভাগের এক ভাগ মানুষ কোনো ধরনের পূর্বাপর ব্যথার উপসর্গ ছাড়াই হৃদরোগে বা হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়। এই চিত্রটি সারা পৃথিবীতে একই রকম। সব রোগীর বুকে ব্যথা হয় না। তবে কারো হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে মনে হলে তাত্ক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। যেমন—

*আক্রান্তকে ঝিমিয়ে পড়তে দেবেন না; বরং তার সঙ্গে কথা বলতে থাকুন।
*রোগীর মাথা ৩০-৪৫ ডিগ্রি উঁচু করে শুইয়ে রাখুন, যাতে তাঁর শ্বাস নিতে সুবিধা হয়।
*ফার্মেসি থেকে অ্যাসপিরিন (Aspirin) ৩০০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট কিনে সরাসরি চিবিয়ে খাইয়ে দিন। এই অ্যাসপিরিন হার্ট অ্যাটাকজনিত মৃত্যু কমাতে পারে ৩০ শতাংশ। অন্যান্য অসুখ থাকলেও এটা সেবনে কোনো ক্ষতি নেই।
*পাশাপাশি ক্লপিডগরেল (Clopidogrel) ৩০০ মিলিগ্রাম ট্যাবলেট খাইয়ে দিন।
*নাইট্রেট স্প্রে (Nitrate Spray) বা ট্যাবলেট জিহ্বার নিচে দিন।
*রোগীকে দ্রুত নিকটস্থ হৃদরোগ হাসপাতাল অথবা হৃদরোগের চিকিৎসা হয় এমন সেন্টারে নিন।


সতর্কতা ও করণীয়
*চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করে ওষুধপত্রের মাত্রা ঠিক করে নিন ও নিয়মিত ওষুধ সেবন করুন।
*শীতের সময় ঘরের বাইরে হাঁটাহাঁটি না করে ঘরের ভেতর হালকা ব্যায়াম করা ভালো। অ্যারোবিক এক্সারসাইজ ও উপকারী হতে পারে।
*বয়স্কদের প্রত্যহ গোসল না করাই শ্রেয়। করলেও কুসুম গরম পানি দিয়ে গোসল করা ভালো।
*শরীর ও মনের চাপ কমাতে টেনশনমুক্ত থাকুন।
*অতিরিক্ত ওজন হার্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তাই বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী আদর্শ ওজন জেনে তা বজায় রাখুন।
*সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণের দিকে বিশেষ নজর দিন। হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার নয়, বরং সহায়ক খাবারদাবার গ্রহণ করুন।
*শীতে ঘাম না হওয়ায় শরীর থেকে বাড়তি পানি ও লবণ বের হতে পারে না। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করুন। কম লবণ গ্রহণ করুন।
*নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন এবং রক্তচাপ বেশি মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
*ঠাণ্ডা আবহাওয়া বা শীত থেকে রক্ষা পেতে সব সময় পর্যাপ্ত গরম জামা-কাপড় পরিধান করুন। বিশেষ করে বয়স্ক ও হৃদরোগীদের মাথার টুপি, হাত-*পায়ের মোজা সঙ্গে রাখা উচিত। রাতে শোবার ঘরটি যথাসম্ভব উষ্ণ রাখুন।
*হৃদযন্ত্রের ওপর অন্য যেসব অসুখ প্রভাব ফেলে, সেসব রোগ বিশেষ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন।


সর্বশেষ সংবাদ