প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কাজ করছে ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী ছাত্রজোট’
দেশে একের পর এক নারী ও শিশুর প্রতি বিভৎস নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে। বিচারহীনতা ও আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া এ দেশ আজ যেন হয়ে উঠছে ধর্ষক, যৌন নিপীড়ক আর নির্যাতনকারীদের চারণভূমি।
এসব নিপীড়ন বন্ধ করতে বিচার ব্যবস্থা ও নির্বাহী প্রশাসনের পাশাপাশি কাজ করছে অনেক সামাজিক সংগঠন। তবে আর ৮ থেকে ১০টি সামাজিক সংগঠন চেয়ে একটু আলাদা ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী ছাত্রজোট’ বা স্টুডেন্টস কমিউনিটি এগেইনস্ট রেইপ অ্যান্ড সেক্সুয়াল ভাইল্যান্স (এসসিএআরএসভি)।
যৌন নিপীড়ন ঠেকাতে সংগঠনটি একদম প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের এ সংগঠনটি মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে উঠান বৈঠক, বাল্যবিয়ে, ধর্ষণ, নারীর প্রতি সব ধরনের সহিংসতা বন্ধে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছে।
দেশব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। করছে বিভিন্ন পথনাটক। কখনও বা প্রয়োজনে আন্দোলনে নামছে রাজপথে। আবার নিপীড়িতের ডাকে সাড়া দিয়ে বাল্যবিয়ে বন্ধসহ মামলা করা পর্যন্ত সব ধরনের কার্যক্রম চালাচ্ছে সংগঠনটি। এখন পর্যন্ত দেশের ১৫ জেলায় নেওয়া হয়েছে নিপীড়নবিরোধী নানা কার্যক্রম।
২০২১ সালের মধ্যে ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী ছাত্রজোট’ পুরো বাংলাদেশ কভার করতে চায়। তাদের লক্ষ্য-২০২১ সালের মধ্যে দেশের প্রত্যেকটি গ্রামে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা।
লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা রুখে দিতে ২০১৫ সাল থেকে কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি। ২০১৫ সালের ১৯ মে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এ নিপীড়নবিরোধী সংগঠনটি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
২০১৫ সালে ঢাকার রাস্তায় গারো মেয়ে ধর্ষণের প্রতিবাদ জানিয়ে রাস্তায় নামা থেকে এসসিএআরএসভি পথ চলা শুরু। তারপর থেকে এ পর্যন্ত সংগঠনটি ৫০ এরও বেশি নিপীড়িতকে সহায়তা দিয়েছে, যা এখনও চলমান। যেহেতু এটি ‘শিক্ষার্থী জোট’। তাই সহজেই অনুমানযোগ্য যে, এর বেশিরভাগ কর্মীই শিক্ষার্থী। তবে এর বাইরেও আছে নানা পেশার মানুষ।
সংগঠনটির কর্মীরা ২০১৫ সালে ধর্ষকদের বিচারের দাবিতে শক্ত প্রতিবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেন। শব্দ ও পরিবেশদূষণসহ নারীর শ্লীলতাহানি, অশোভন আচরণ বন্ধ করতে উচ্চেঃস্বরের ভুভুজেলা বাঁশি বন্ধে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগে ২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের আগেই আন্দোলনের ডাক দেয় সংগঠনটি। ফলে পহেলা বৈশাখে নিষিদ্ধ করা হয় ভুভুজেলা।
২০১৭ সালের বনানীর হোটেল রেইন্ট্রিতে ধর্ষণের পর ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি নিয়ে ১১ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যে এক গণবস্থান কর্মসূচির ডাক দেয় যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোট।
সেখান থেকেই দেশব্যাপী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘোষণা করা হয় ধর্ষণবিরোধী পদযাত্রা ‘জাগো মানুষ, জাগো বহ্নিশিখা’। সংগঠনের আহ্বায়ক শিবলী হাসানের নেতৃত্ব দেশব্যাপী প্রায় ৫০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ পদযাত্রা হয়েছে, যা এখনও চলমান। শিবলী হাসান তাদের কাজের ব্যাপারে বলতে গিয়ে বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, নারীর প্রতি সহিংসতা নির্মূলে একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকে কাজ শুরু করা উচিত।
নারী-পুরুষের বৈষম্য বিলোপ সম্পূর্ণরূপে সম্ভব তখনই, যখন আমাদের মনোজগৎ পরিবর্তন হবে। আর এ পরিবর্তনের শুরু হতে হবে শিক্ষাজীবনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই। আর তাই আমরা প্রতিটি জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত হয়ে কাজ করে যাচ্ছি।
সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেমিনার, পদযাত্রা আয়োজনের পাশাপাশি তারা পথনাটকের আয়োজনও করছে। নারীর প্রতি সহিংসতাকে জিরো টলারেন্স দেখাতে তারা ‘রেড কার্ড’ ক্যাম্পেইনও চালু করেছে। এমনকি ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের গণরায় নিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সারা দেশে গণস্বাক্ষর কর্মসূচিও শুরু করেছে তারা। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশেই ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হয়নি আজ অবধি। তাই তাদের পক্ষ থেকে এ স্বাক্ষর ক্যাম্পেইন পিটিশন হিসেবে জাতিসংঘে পাঠানোর আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন শিবলী হাসান।
শুধু পদযাত্রা, পথনাটক করেই ক্ষান্ত হয়নি ‘যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোট’। গঠন করা হয়েছে একটি সেল। এ ব্যাপারে শিবলী হাসান জানান, যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোটের পক্ষ থেকে নারী নিপীড়নবিরোধী একটি সেল গঠন করা হয়েছে। যে নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে পুলিশের কাছে গিয়েও মামলা করতে পারছেন না অথবা স্থানীয় প্রভাবশালীর কারণে পুলিশের কাছে যেতে পারছেন না, কিংবা বখাটেদের উৎপাতে দুঃসহ জীবনযাপন করছেন, তাদের জন্য খোলা হয়েছে এ হটলাইন- ০১৭৭৮০২৪৬২৪।
এ নম্বরে নির্যাতিত নারীর একটি ফোনে নিপীড়নবিরোধী জোটের কর্মীরা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেবেন। ধর্ষণ বা নিপীড়িত নারীর পক্ষ হয়ে মামলা করা, হোম ভায়োলেন্সের শিকার হওয়া নারীকে যাবতীয় কাজে সহযোগিতা করবে সংগঠনের কর্মীরা।
সংগঠনের কাজের উদাহরণ দিয়ে শিবলী বলেন, কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলায় এক প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর যখন উপজেলা প্রশাসন সেটাকে টাকা দিয়ে মীমাংসা করতে চাইছিল তখন থানার সামনে অবস্থান নেন আমাদের সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ভিক্টিমের ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পরই তারা ঘরে ফিরে যান। একইরকমভাবে নান্দাইল থানায় পরিবারের হাতে নির্যাতনের শিকার এক নারীকেও সহায়তা দিয়েছে সংগঠনটি। বর্তমানে মুন্সীগঞ্জের এক ভিক্টিমকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দিতে কাজ করছেন তারা। খুব শিগগিরই সিলেট বিভাগের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে শিবলী জানান, বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিপীড়নের বিরুদ্ধে কাজ শেষে যৌন নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থী জোট এশিয়ার অন্যান্য দেশে তার কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে। এ বছরই আমরা ভারতে যাচ্ছি। ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও আমরা এ অনুযায়ী কাজ করব। আমরা সচেতন শিক্ষার্থী ও যুবকদের এক প্ল্যাটফর্মে এনে কাজ করব যেন নিপীড়নমুক্ত বিশ্ব গড়া যায়। কেননা নারীর প্রতি সহিংসতা কোনা জাত, ধর্ম বা সীমানা মানে না। নারী মানে মা, বোন, স্ত্রী, মেয়ে- তাই নারী নিপীড়নমুক্ত বিশ্ব গড়তেই কাজ করে যাচ্ছি আমরা। তবে সবার আগে নিপীড়নমুক্ত নিজ ঘর গড়তে চাই।