‘১৮ বছরে একদিনও মোখলেশ ভাইকে ৮টার পর অফিসে আসতে দেখিনি’
প্রশাসনের বড় কর্তাদের বিদায়-বরণ অনুষ্ঠান নতুন কিছু নয়। কিন্তু একজন অফিস সহকারীকে ঘটা করে বিদায় সংবর্ধনা জানানো যেন ভালোবাসার অন্যরকম এক নিদর্শন। এমনই এক নির্দশন দেখালো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষদিনে বিভাগের অফিস সহকারী মো. মোখলেশুর রহমানকে বিদায় সংবর্ধনা দিয়ে তার প্রতি নিজেদের ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন বিভাগটির শিক্ষক-কর্মকর্তারা।
বৃহস্পতিবার (৯ সেপ্টেম্বর) নিজ বিভাগে তাকে বিদায় সংবর্ধনা দেয়া হয়। বিভাগের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয় এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের। যা ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।
৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এই বিভাগে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন সবার আস্থার প্রতীক। সবাই তাকে ভালোবেসে ডাকতেন ‘মোখলেশ ভাই’ নামে।
স্মৃতিচারণ করে বিভাগটির সাবেক শিক্ষার্থী রিফাত নাজমুল লিখেছেন, মোখলেশ ভাই আসলেই খুব অসাধারণ মানুষ। মাটির মানুষ বিশেষণটার পারফেক্ট উদাহরণ তিনি। ডিপার্টমেন্টের প্রত্যেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা- সবার পছন্দের মানুষ ছিলেন তিনি। যেকোন কাজে গেলে আপ্রাণ চেষ্টা করতেন সাহায্য করার। সদা হাস্যজ্জল সেই মানুষটা আজকে বিভাগ থেকে অবসরে গেলেন। আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুন, মোখলেশ ভাই।
বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আমিরুস সালাত স্মৃতিচারণ করে বলেন, বিভাগের সবকিছুতেই আবেগের একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আমাদের মোখলেশ ভাই। বিভাগের জন্য মোখলেশ ভাই কী ছিলেন সেটা বলার মতো ভাষা আমার জানা নেই। কী এক অসম্ভব মায়াজালে বিভাগের সবাইকে আটকে রেখেছেন বিগত কয়েক যুগ ধরে। অপরিসীম ভালোবাসাতে সবাইকে আগলে রেখেছিলেন, সেটা শুধু অনুভব করা যায়, প্রতিদান দেয়া যায় না।
তিনি বলেন, আমার ১৮ বছরের শিক্ষকতার জীবনে মোখলেশ ভাইকে কোনোদিন দেখিনি আটটার পরে বিভাগে আসতে। প্রতিদিন সকাল আটটার আগে বিভাগে ঢুকতো এবং সবার শেষে বিভাগ থেকে বের হতো। নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে তিনি সবসময় সচেতন ছিলেন।
বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাহমিনা খাতুন বলেন, উনি ১৯৬৯ সালে বিভাগে যোগদান করেন। বিভাগের জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। ব্যক্তিজীবনে তিনি যেমন সফল, কর্মজীবনেও তিনি নিষ্ঠাবান ছিলেন।
বিদায় সংবর্ধনার মাধ্যমে শিক্ষকদের এই ভালোবাসায় আবেগাপ্লুত হয়ে যান মোখলেশুর রহমানও। স্মৃতিকাতর হয়ে দেন দীর্ঘ এক বক্তব্য।
শিক্ষকদের তরফ থেকে সব সময় সহযোগিতা পেয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ দীর্ঘ জীবনে বিভাগে অনেক গুণী শিক্ষককে পেয়েছি। তারা আমাকে অনেক কিছুই দিয়েছেন, সম্মান করেছেন, স্নেহ করেছেন, ভালোবেসেছেন। আমার ছেলে-মেয়েদের প্রতিষ্ঠিত করতে বিভাগের শিক্ষকেরা অনেক সহযোগিতা করেছেন।
ইউনিভার্সিটিতে রাত-দিন ২৪ ঘন্টাই থাকতাম:
তিনি বলেন, আমার চাকরি হয়েছিল অনেক কম বয়সে। আমি ইউনিভার্সিটিতে রাত-দিন ২৪ ঘন্টাই থাকতাম। স্যার কখন আসে, কোনো কাজের যদি দরকার হয়, এটা ছাড়া আমারতো কোনো কাজ নাই। আমি এখানে চার পয়সায় রুটি কিনতাম আর দুই পয়সায় ভাজি কিনতাম। মাঝে মাঝে এফ রহমান হলে ভাত খেতাম।
স্যারেরা আমারে কোনোদিন কর্মচারী মনে করে নাই, সবসময় ভাই হিসেবে মনে করছে। এখনও কোরবানির মাংস আমার বাসায় পাঠাই দেয়। কথাগুলো বলতে গিয়ে এক পর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
আগের মতো ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক এখন আর নাই:
আলাপের এক পর্যায়ে তিনি বললেন, আগের মতো ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে সম্পর্ক এখন আর দেখা যায় না। আগে শিক্ষকদের মধ্যে আন্তরিকতা ছিল, সেই আন্তরিকতা এখন কম। আগে একজন যদি হাসপাতালে থাকতো, পুরো ডিপার্টমেন্ট গিয়ে খবর নিতো। তখন একটা মায়া-মমতা, ভালোবাসা ছিল।
এখন তো মানুষের পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে, তেমনি রেষারেষিও বেড়েছে। আগে এমন ছিল না। মধুর সম্পর্ক ছিল। ছাত্ররা যদি কোনো অসুবিধায় পড়তে শিক্ষকেরা অনেক যত্ন নিতো। এখনো নেয়, তবে তুলনামূলক কম, বলেন তিনি।
বিভাগই ছিল আমার কাছে সব:
মোখলেশুর রহমান বলেন, আগে কলাভবনে ছিলাম। কমার্স ফ্যাকাল্টি তখন আর্টস ফ্যাকাল্টিতে ছিল। ১৯৭০ সালে ছাত্র-শিক্ষকরা আন্দোলন করে কমার্স ফ্যাকাল্টি খুলেছে। তখন একাউন্টিংয়ের হেড অফ দি ডিপার্টমেন্ট ছিল হাবিবুল্লাহ স্যার। বিজনেস ফ্যাকাল্টিতে মোট ১২ জন শিক্ষক ছিল। এখন তো অনেক শিক্ষক, ডিপার্টমেন্ট হয়েছে নয়টা।
তিনি বলেন, এই বিভাগে দীর্ঘ ৫০ বছর কাজ করেছি। এতদিনে বিভাগের প্রতিটি ইট-কণার সাথে আমার স্মৃতি জড়িয়ে গেছে। এই বিভাগই ছিল আমার কাছে সব।
এদিকে অফিস সহকারীর অন্যরকম এই বিদায় ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। শেয়ার হয়েছে বিভিন্ন গ্রুপে।